সরকারের ১০০ দিন
জনপ্রত্যাশা অনুধাবন করেই এগোতে হবে
হোসেন জিল্লুর রহমান
হোসেন জিল্লুর রহমান
প্রকাশ: ০১ জুন ২০২৬ | ১০:১৫ | আপডেট: ০১ জুন ২০২৬ | ১২:০০
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে দেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তন এসেছে। সেই পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় বর্তমানে একটি গণতান্ত্রিক সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছে। গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম আকাঙ্ক্ষা ছিল জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ও জনকল্যাণ নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে সার্বিক প্রাতিষ্ঠানিক, অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা। এটি অনস্বীকার্য, ১০০ দিন একটি সরকারের জন্য স্বল্প সময়। এ সময়ের মধ্যে সরকারের অর্জন মূল্যায়নের বিষয় নয়। কিন্তু সরকার যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, সেগুলো কতটা আস্থার জায়গা তৈরি করেছে, তা গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারের তিন মাসের প্রাথমিক পর্যালোচনা আমরা ঈদের আগে করেছি; পিপিআরসির আজকের এজেন্ডায়। সেখানে আলোচনা হয়েছে, সরকার তিন ধরনের বোঝা নিয়ে তাদের যাত্রা শুরু করেছে। একটি হলো, উত্তরাধিকারের বোঝা। অর্থাৎ দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসন। কভিড থেকে ধারাবাহিক সংকটের ঝুঁকির মধ্যে বাংলাদেশ অবস্থান করছে।
বিপর্যস্ত অর্থনীতির কারণেও বড় ধরনের সমস্যার মধ্যে আমরা আছি। দ্বিতীয়ত, এই সরকার যখন গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণ করল, তারপরই আমরা দেখলাম জ্বালানি সংকট। ইরানের ওপর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া আগ্রাসনে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। যার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। নতুন সরকারকে এই সংকটও সামাল দিতে হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন সরকারের নিজস্ব অঙ্গীকার ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিও রয়েছে, যা বাস্তবায়ন বিষয়ে জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি। সরকার এই কঠিন বাস্তবতার মধ্যে রয়েছে। তারপরও নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব আছে।
আমরা যদি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র চাই তবে সরকারের তৎপরতা পর্যালোচনা আমাদের করতেই হবে। পর্যালোচনা নিশ্চয়ই তথ্যভিত্তিক হওয়া চাই। বাস্তবতার নিরিখেই সরকারের মূল্যায়ন করা চাই। সে জন্য সরকারকে সময় দিতে হবে। কিন্তু সময় দেওয়া মানে এই নয়, আমরা যে সিগন্যাল পাচ্ছি, তা নিয়েও চোখ বন্ধ করে বসে থাকব। আস্থার কথাটা শুরুতেই বলেছি। এটা সব ক্ষেত্রেই। বিশেষ করে বিনিয়োগে আস্থার জায়গা তৈরি করা। এই আস্থাটা কেবল মুখের কথায়ই আসবে না। এখানেও সরকার পদক্ষেপ কী নিচ্ছে তা জরুরি।
তবে নতুন সরকার নির্বাচনের আগেই তাদের ইশতেহার তৈরি করেছে। সে জন্য বলা যায়, আগ থেকেই তাদের এক ধরনের প্রস্তুতি ছিল। সেখানে তাদের চিন্তাধারার প্রকাশ ঘটেছে। ইশতেহারে বেশ কিছু স্লোগান আমরা দেখেছি, সেগুলো কতটা বাস্তবায়ন হচ্ছে? প্রাথমিকভাবে বললে, আমরা একটা মিশ্র চিত্র দেখছি। যেসব বিষয় নিয়ে জনগণ অত্যন্ত চিন্তিত তার অন্যতম আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। এখানে বিচারহীনতার বিষয়টিও উদ্বেগের। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্তির মাধ্যমে আমরা মিশ্র সিগন্যাল পাচ্ছি। সরকারের স্লোগান কিংবা সদিচ্ছা ঠিকই আছে। কিন্তু বাস্তবায়নের জায়গায় দক্ষতা ও সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও সদিচ্ছা দেখা গিয়েছিল বটে, কিন্তু বাস্তবায়ন সেভাবে দেখা যায়নি বললেই চলে।
অর্থনীতির দুরবস্থা কাটিয়ে আমাদের আরও অনেক দূর যাওয়া উচিত ছিল। আমাদের অর্থনীতির গেড়ে বসা একটা সমস্যা ‘আমাদের লোক’ কালচার। এটা অতিক্রম করা অত্যন্ত জরুরি। এর সমাধান হলো, ‘রাইট পিপল ফর দ্য রাইট জব’। অর্থাৎ যোগ্য লোককে সঠিক জায়গায় বসানো। ‘আমাদের লোক’ কালচার থেকে উত্তরণ কেবল জনচাহিদা নয়। যারাই বাংলাদেশকে একটি সফল, সক্ষম ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায়, সবারই এটা প্রত্যাশা। সে জন্য প্রশাসনে দলীয়করণ, পেশায় দলীয়করণ, ব্যবসায় দলীয়করণ ইত্যাদি যে কলুষিত ধারা চলে আসছে, তা অতিক্রম করতে হবে। আমাদের অবশ্যই বিশ্লেষণের মাধ্যমে ঘাটতি ও ব্যর্থতাগুলো সঠিকভাবে সামনে নিয়ে আসতে হবে।
‘ব্লেম গেম’ আমাদের একটা সমস্যা। এটা এক ধরনের ফাঁকিবাজির বিষয়, যেখানে নিজেদের দায়িত্ব এড়ানোর প্রবণতা থাকে। দোষারোপের এই সংস্কৃতি থেকে আমাদের বের হওয়া উচিত। শিকড়গাড়া ‘ট্যাগ সংস্কৃতি’ নিন্দনীয়। এতে অনেক সময় যারা প্রকৃত দোষী তারা পার পেয়ে যায়। রাজনৈতিক বিরোধীদের নিন্দনীয় উদ্দেশ্যে লেবেল করার অভ্যাস জনজীবনকে বিষাক্ত করে চলেছে এবং শাসন ও নীতি কর্মক্ষমতার সৎ মূল্যায়নে বাধা সৃষ্টি করছে।
যদি আমাদের নির্বাচিত সরকার সফল হয়, তবে তা শেষ পর্যন্ত নাগরিক হিসেবে আমাদের সবার জন্য ভালো। অতীতের ভুল থেকে আমাদের শিখতে হবে এবং বর্তমানকে উন্নত করার দায়িত্ব নিতে হবে। সমাজের মধ্যে ঐকমত্য তৈরি করা শুধু রাষ্ট্রের দায়িত্ব হতে পারে না। নাগরিক এবং ব্যবসায়িক নেতাদের বিশ্বাসযোগ্য জনআলোচনার মাধ্যমে জাতীয় ঐক্য শক্তিশালী করার পাশাপাশি সরকারের ওপর প্রমাণভিত্তিক জবাবদিহির চাপ আনতে হবে। বাংলাদেশের নাগরিক আলোচনাকে অবশ্যই আবেগচালিত রাজনীতি থেকে সাবধানে, প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণ ও গঠনমূলক জনসম্পৃক্ততার দিকে এগিয়ে যেতে হবে। এতে আমরা সহজে সমাধানের পথ খুঁজে পাব।
তবে কিছু সিগন্যাল বা লক্ষণ ভালো বার্তা বহন করে না। যেমন, সরকারের তিন মাসে দুর্নীতি দমন কমিশন নেতৃত্বশূন্য থাকা ইতিবাচক বিষয় নয়। দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই যে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে পরিচালনার জায়গায় যেতে পারেনি, তা ভালো লক্ষণ নয়। ভালো সিগন্যালগুলো আমাদের আস্থার জায়গাটা সুদৃঢ় করে। সরকার পরিচালনায় দক্ষতা ও ঐকমত্যের পাশাপাশি সাহসী পদক্ষেপও জরুরি। সাহসী পদক্ষেপ নিতে পারলে অনেক বিষয়ে সফল হওয়া সম্ভব হবে। আমাদের দায়িত্ব আমাদের কাঁধেই নিতে হবে।
সামনে বাজেট আসছে। এটা সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ইতোমধ্যে বাজেট বিষয়ে সমকালেই আমি বলেছি, মানুষ স্বস্তি চায়। তারা চায়, সঠিক পথে সরকার আগাক। তবে সতর্কবার্তা হলো, অন্ধ সমর্থন। অন্ধ সমর্থক যে কোনো সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদের কারণ। কারণ অন্ধ সমর্থক যারা দায়িত্বে আছেন তাদেরও ধীরে ধীরে অন্ধ বানিয়ে ফেলে। এই বিপদ থেকে বেঁচে থাকতে হবে। আমাদের সক্ষমতার সঙ্গে জনপ্রত্যাশা বোঝা দরকার। জনগণ রাতারাতি পরিবর্তন চায় না। তারা স্বস্তির পাশাপাশি চায় রাষ্ট্র আমাদের কথা শুনুক। আমাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হোক। মানুষ নিজেরাও সহযোগিতা করতে চায়; সবকিছু কেবল রাষ্ট্রের একক দায়িত্ব নয়। জনপ্রত্যাশার মৌলিক দিকগুলো যারা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে আছেন, তারা যেন অনুধাবন করেন। কারণ বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সফল, সক্ষম ও মানবিক দেশ তৈরির কাজটা সবার।
ড. হোসেন জিল্লুর রহমান: অর্থনীতিবিদ ও এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান, পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি)
- বিষয় :
- মতামত
