উচ্চারণের বিপরীতে
কঠিন সময় উত্তরণের রাজনৈতিক সমাধান
মাহবুব আজীজ
মাহবুব আজীজ
প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ | ০৭:৩৮ | আপডেট: ০২ জুন ২০২৬ | ২০:০০
| প্রিন্ট সংস্করণ
সামনে অত্যন্ত কঠিন সময় অপেক্ষা করছে বলে নেতাকর্মী ও সমর্থকদের উদ্দেশে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ৪৫তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে রোববার আয়োজিত সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের পর দেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি। গত ১৭ বছরে বিচার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য খাতসহ গণতন্ত্রকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, জাতি তার সাক্ষী (সমকাল, ১ জুন, ২৬)।
প্রধানমন্ত্রী যথার্থভাবেই আগামীর কঠিন সময়কে শনাক্ত করে নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজের আহ্বান জানিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে কয়েকটি খাতের কথাও তিনি স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন। সরাসরি না বললেও সেখানে দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতির ন্যুব্জ বাস্তবতাও অন্তর্নিহিত।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সঙ্গে যেন পাল্লা দিয়ে দেশের অর্থনীতিও বর্তমানে বিপর্যস্ত। এ দুরবস্থা অবশ্যই বিএনপির ১০০ দিনের সরকারের কার্যকালে সৃষ্ট নয়। তবে দেড় দশকের স্বৈরশাসন ও গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী ১৮ মাসের অপশাসনের পর নির্বাচিত সরকারের যাত্রারম্ভের প্রথম প্রান্তিকে প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য স্পষ্ট করে– দেশের ভবিষ্যৎ এখনও কণ্টকাকীর্ণ।
দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার বিপুল ঘাটতি নিয়ে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিপুল অঙ্কের যে উচ্চাভিলাষী বাজেট আগামী সপ্তাহে আসছে, তা বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সংশয় রয়েছে। আগামী দিনে শিল্প খাত ও কর্মসংস্থান টিকে থাকার পথেও বিরাট প্রতিবন্ধকতার সামনে পড়বে বলে আশঙ্কা। গত কয়েক বছরে রাজস্ব আয় বারবার লক্ষ্যমাত্রার নিচে থেকেছে, সেখানে আসন্ন অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের বিরাট অঙ্কের বাস্তবতা প্রশ্নসাপেক্ষ।
বিনিয়োগে স্থবিরতাও আরেক সংকট। বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়নের পাশাপাশি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে এমন সব খাতে, যেখানে সরাসরি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় ও মানুষের আয় বাড়ে। অর্থনীতির মূল শক্তি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা। তাই বিনিয়োগ খাতে সরকারকে উদ্ভাবনী শক্তি কাজে লাগাতে হবে। সীমিত আয়ের জনসাধারণের জীবন স্বচ্ছন্দ রাখবার ক্ষেত্রে সরকার বেশি মনোযোগী হলে জনবান্ধব অর্থনীতি গড়ে তোলার পথ প্রশস্ত হবে। যোগ্য ব্যক্তিকে উপযুক্ত ক্ষেত্রে নিয়োগ দিতে হবে। বিশৃঙ্খল ব্যাংকিং খাতকে সুশৃঙ্খল করবার ক্ষেত্রে সরকারকে সুস্পষ্ট উদ্যোগ নিতে হবে। নিজ দলের লোকজনের হাতে ব্যাংকিং খাত তুলে দেবার দীর্ঘকালীন সংস্কৃতি থেকে অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে।
২.
অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবশ্যই সরকারের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) প্রতিবেদন অনুযায়ী, এপ্রিলে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ছিল ৩১২টি, মে মাসে তা বেড়ে হয়েছে ৩২৬টি। এপ্রিলে ধর্ষণের ঘটনা ছিল ৫৪টি, মে মাসে তা পৌঁছে ৭৮টিতে। মব সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা এক মাসে বেড়ে ২১ থেকে ৩২-এ পৌঁছে; ঘটনা ঘটে ৬৯টি। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার দুর্বলতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি বিদ্যমান থাকায় নারী ও শিশুর নিরাপত্তা এখনও উচ্চঝুঁকিতে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি মব সন্ত্রাসের জন্যও প্রধানত দায়ী। সরকারকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে আরও জোরদার ও দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। মিরপুরের পল্লবীতে শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় যেমন দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে; প্রতিটি ক্ষেত্রে তা নিশ্চিত না করতে পারলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। নারী ও শিশু নিরাপত্তা আইনে প্রয়োজন অনুযায়ী আরও সংশোধনী এনে স্পেশাল ট্রাইব্যুনালে দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে। মব সন্ত্রাসের ক্ষেত্রে একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। অপরাধী নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত হবার পর তার নাম-ঠিকানা বারংবার প্রচারের মাধ্যমে সমাজে বার্তা দিতে হবে– যারা আইন ভাঙবে, তাদের পরিণতিও অভিন্ন। জামিন পাওয়া নাগরিকের মৌলিক অধিকার। দুই বছর ধরে এই অধিকার লাগাতার ক্ষুণ্ন হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের অন্ধ আক্রোশ নির্বাচিত সরকারের বহন করবার যৌক্তিক কারণ থাকতে পারে না।

কয়েকটি ক্ষেত্রে সরকারকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে শ্লথ ও দ্বিধান্বিত মনে হচ্ছে। ১০০ দিনেও সরকার দুর্নীতি দমন কমিশনে নেতৃত্ব নির্বাচন করতে পারেনি। বিভিন্ন সিটি করপোরেশনে নির্বাচনের পরিবর্তে মনোনয়নের সিদ্ধান্ত কতদিনের জন্য, তা-ও তারা জানায়নি। স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ‘দলীয় উপাচার্য’ নিয়োগ দিয়ে চিন্তা ও মননের সূতিকাগারগুলোকে মুঠোবন্দি করে রাখবার প্রবণতা স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতা। শিক্ষা কারিকুলাম নিয়ে নিরীক্ষা এখনও ক্রিয়াশীল। মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলেই মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক দলিলপত্র গ্রন্থাকারে সংরক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়। যেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ সব জাতীয় নেতার অবদান ও ভূমিকা সুস্পষ্টভাবে উল্লিখিত। রয়েছে মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতাকারীদের অনুপুঙ্খ বিবরণ। সেই আলোকে পাঠ্যক্রমে ইতিহাস পাঠ অবিকৃত রাখাই সংগত। সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাস বদলে ফেলবার অর্থহীন ও অনৈতিক প্রয়াস বন্ধ করতে পারলে আগামী দুর্গম পথ বহুমতের জন্য প্রাঞ্জল হয়ে উঠবে।
৩.
মুক্তিযুদ্ধের পর মানুষের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা বারংবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। যে ন্যূনতম মৌলিক অধিকার জনসাধারণের প্রাপ্য, তা থেকেও জনসাধারণ বঞ্চিত হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির জয়লাভের মধ্য দিয়ে মানুষ আবারও গণতন্ত্র ও মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখছে। মনে রাখতে হবে, কোনো একটি দলের কর্মী-সমর্থকের জন্যই কেবল নয়; সব দল ও মতের মানুষের জন্যই সরকার। ‘আমার’ দলের কর্মীদের জন্য এক আইন ও ‘অন্য’ দলের কর্মী-সমর্থকের জন্য পৃথক আইন– এই চিন্তা সমাজে দুর্বৃত্তায়ন ও গোষ্ঠীতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে। বর্তমান সরকারকে অবশ্যই ধর্ম-মত-আদর্শ নির্বিশেষে সকলের সরকার হয়ে উঠতে হবে। প্রত্যেক নাগরিকের জন্য রাষ্ট্র হবে অভয় আশ্রয়স্থল। যে কারও বিরুদ্ধে যে কোনো অভিযোগ উঠতেই পারে। কিন্তু তার বিচারের ক্ষমতা রাষ্ট্র ভিন্ন আর কারও হাতে থাকতে পারে না। আইনের শাসনের এই অমোঘ বারতা সবার আগে সরকারকে মান্য করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী রোববার আরও বলেছেন, ‘দেশে ফেরার পর মনে হয়েছে পারিবারিক শিক্ষার কিছুটা ঘাটতি তৈরি হয়েছে।’ সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধ বাড়াতে তিনি সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিয়েছেন। সমাজে ছড়িয়ে পড়া ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতা, হিংস্রতা ও অন্য মতামতকে গুরুত্ব না দেওয়ার মানসিকতা পরিবারেও প্রভাব রাখছে বলে পরিস্থিতি নাজুক হয়ে উঠেছে। একজনের মতের সঙ্গে অন্য আরেকজনের মত না-ই মিলতে পারে। তাই বলে তাকে সমাজে অচ্ছুৎ বা অবাঞ্ছিত করবার কারও অধিকার থাকতে পারে না। সরকারকে এই গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টির উদ্যোগ নিতে হবে।
সর্বশেষ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটি চলচ্চিত্র প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করে ‘কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদ’ কর্মসূচি ঘোষণার পর আয়োজনটি স্থগিত ঘোষিত হয়েছে। সমকাল জানাচ্ছে, ‘জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদ্রাসায় শীর্ষ আলেম ও কওমি ঐক্য পরিষদ নেতৃবৃন্দ বৈঠকে কোনো অবস্থাতেই সিনেমা প্রদর্শন করতে দেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দেন’ (১ জুন, ২৬)। কোনো ব্যক্তি বা পরিষদ চাইলেই সরকারের সেন্সর সার্টিফিকেটপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র প্রদর্শনী কোনো এলাকায় বাতিল ঘোষণা করে বলতে পারে না– ‘তাদের শহরে’ সিনেমা চালু করবার অপচেষ্টা চলছে!
ব্যক্তি বা গোষ্ঠী– যে কোনো পর্যায়ে অগণতান্ত্রিক ও দেশের প্রচলিত আইনবিরোধী তৎপরতা অবশ্যই অসাধু ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। দেশের সার্বিক সাংস্কৃতিক মানের অবক্ষয় ও অবদমনের সঙ্গে এসব প্রবণতা সম্পর্কিত। সরকারকে যে কোনো পরিসরে অগণতান্ত্রিক আচরণের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র ও সুশাসনের প্রয়াস অব্যাহত রাখতে হবে। ব্যক্তি স্বাধীনতা, সুশাসন ও নাগরিক অধিকারের পক্ষে দ্ব্যর্থহীন অবস্থানই দেশ ও সাধারণ মানুষের আগামী দিনগুলোকে সহজ করে তুলবে।
মাহবুব আজীজ: উপসম্পাদক, সমকাল; সাহিত্যিক
[email protected]
- বিষয় :
- মাহবুব আজীজ
