ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আন্তর্জাতিক

ইসরায়েলের লেবানন অভিযান দখলদারিত্বেরই সূচনা

ইসরায়েলের লেবানন অভিযান দখলদারিত্বেরই সূচনা
×

অ্যাশার কফম্যান

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ | ১৮:২৫

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামার আগে ইসরায়েলি সরকারের দুটি লক্ষ্য ছিল, যা পরস্পর সংযুক্ত। এক. ইসলামী প্রজাতন্ত্রের পতন ঘটানো এবং ইসরায়েলকে হিজবুল্লাহ সমস্যা থেকে মুক্ত করা। যুক্তিটি ছিল এই যে, লেবাননের এই শিয়া গোষ্ঠীটি– যা ৪৪ বছর ধরে ইসরায়েলের জন্য এক ধারাবাহিক হুমকি হয়ে রয়েছে– তার ইরানি পৃষ্ঠপোষককে হারালে অবশেষে নতি স্বীকার করবে। সর্বোপরি, সরাসরি সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে হিজবুল্লাহকে ধ্বংস করার ইসরায়েলি প্রচেষ্টা কার্যকর হয়নি, এমনকি আন্তর্জাতিকভাবে সমর্থিত নিরস্ত্রীকরণ প্রচেষ্টাও সফলতার মুখ দেখেনি। 

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যখন যুদ্ধের অবসান ঘটাতে পারে এমন এক চুক্তি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, তখনও ইসরায়েল-লেবানন দ্বন্দ্ব আগের মতোই সক্রিয় রয়েছে। ইসরায়েল লেবাননের আরও গভীরে হামলা ও অনুপ্রবেশ বাড়িয়েছে, অন্যদিকে হিজবুল্লাহ দক্ষিণ লেবাননে মোতায়েনকৃত ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এবং উত্তর ইসরায়েলের বেসামরিক জনগণকে লক্ষ্যবস্তু করছে।

ইসরায়েলি সরকারের দৃষ্টিকোণ আরও গুরুতর। তাদের মতে, ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর তার অস্তিত্ব ও নতুন অর্জিত প্রভাবের মধ্য দিয়ে হিজবুল্লাহ রক্ষায় কাজে লাগানোর উপায় খুঁজে পেয়েছে। তেহরান বর্তমানে ওয়াশিংটনের সঙ্গে একটি সম্ভাব্য চুক্তির শর্ত হিসেবে লেবাননে ইসরায়েলি যুদ্ধবিরতিকে বাধ্যতামূলক করেছে। এই পদক্ষেপ স্পষ্টতই তার প্রধান প্রক্সি হিজবুল্লাহর রাজনৈতিক ও সামরিক অবস্থান সুরক্ষিত করার জন্যই পরিকল্পিতভাবে গৃহীত হয়েছে।

২০২৬ সালের ২ মার্চ লেবাননে পুরোপুরিভাবে যুদ্ধ চালানোর মধ্য দিয়ে ব্যাপক মানবিক ক্ষতি হয়। মার্চের শুরু থেকে ১ জুন পর্যন্ত ১০ লাখেরও বেশি লেবানিজ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং তিন হাজার ৩০০ জনেরও বেশি নিহত হন। একই সময়ে ইসরায়েলি পক্ষে ২৪ জন সৈন্য এবং চারজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে।

ইসরায়েল তার লেবানন ফ্রন্টকে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাত থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চাইছে। এ ছাড়া ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর আলোচনা থেকে স্বাধীনভাবে শিয়া সংগঠনটির বিরুদ্ধে তার সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে চায়। কিন্তু তারা এটা করতে পারবে কিনা তা অনিশ্চিত। ট্রাম্প প্রশাসন তার ইরান সংলাপের নির্দিষ্ট বিষয়গুলো থেকে ইসরায়েলকে মূলত বাদ দিয়েছে। আর লেবাননে ইসরায়েলি অভিযানকে দেশটির দক্ষিণ ও বেকা উপত্যকায় হামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করেছে, সেই সঙ্গে তারা রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোতে হামলা নিষিদ্ধ করেছে। ১ জুন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর লেবাননের রাজধানী বৈরুতে হামলার নির্দেশ মার্কিন চাপের সীমাবদ্ধতাকেই তুলে ধরে। পরিশেষে, এই সংঘাতের সমাধান নির্ভর করছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লেবাননের ভবিষ্যৎ সংক্রান্ত ইরানের দাবিগুলো কীভাবে সামাল দেন তার ওপর।

লেবাননে বর্তমানে যা ঘটতে দেখা যাচ্ছে, তা ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল-মার্কিন যুদ্ধের ব্যর্থতার আরও একটি প্রমাণ। কিন্তু যে যুদ্ধ এক নতুন মধ্যপ্রাচ্যের বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিয়ে শুরু হয়েছিল, তার পরিণতি হতে পারে পুরোনো মধ্যপ্রাচ্যেরই এক নিকৃষ্টতর সংস্করণ। এখান থেকে এটি আরও শক্তিশালী ইসলামী প্রজাতন্ত্র, দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের নতুন দখলদারিত্ব কায়েম করতে পারে। সেই সঙ্গে এমন এক হিজবুল্লাহর সূচনা ঘটাবে, যা আগের চেয়ে দুর্বল হলেও লেবাননের রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে একটি সশস্ত্র মিলিশিয়া হিসেবে তখনও সুপ্রতিষ্ঠিত এবং বর্তমানে ইরানের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করছে।

অ্যাশার কফম্যান: যুক্তরাষ্ট্রের নটর ডেম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও শান্তি অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক; দ্য কনভারসেশন থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম 

আরও পড়ুন

×