অর্থনীতি
বাংলাদেশ যে কারণে ‘নেক্সট ইলেভেন’-এর গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার
দেশের টেকসই প্রবৃদ্ধির এই ধারাকে দীর্ঘমেয়াদি সফলতায় রূপান্তরের মূল চাবিকাঠি হলো গভীর কাঠামোগত সংস্কার
মো. বদরুল মিল্লাত ইবনে হান্নান
প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ | ২০:১৩
বিশ্ব অর্থনীতি বর্তমানে এক গভীর ও স্থায়ী পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত শতাব্দীর শেষের দিকে আমরা যে একমেরু বিশ্ব এবং একক মুদ্রানির্ভর পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থা দেখেছিলাম, তা এখন দ্রুত একটি বহুমেরু ভূ-দৃশ্যের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এই নতুন ব্যবস্থায় বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম এবং তুরস্কের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো নিয়ে গঠিত ‘নেক্সট ১১’ (এন-১১) কোনো প্রান্তিক শক্তি নয়। ২০০৫ সালে গোল্ডম্যান স্যাক্সের অর্থনীতিবিদ জিম ও’নিল প্রথম এই এন-১১ ধারণাটি প্রবর্তন করেন, যেখানে তিনি দেখান যে এই দেশগুলোর জনসংখ্যাতাত্ত্বিক এবং কাঠামোগত সম্ভাবনা ব্রিকসের (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার জোট) পাশাপাশি বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার সামর্থ্য রাখে। এই দেশগুলোই এখন বিশ্ব প্রবৃদ্ধির নতুন ইঞ্জিন এবং বাংলাদেশ তার অনন্য ভৌগোলিক ও জনসংখ্যাতাত্ত্বিক সুবিধা কাজে লাগিয়ে এই পরিবর্তনের অন্যতম অগ্রদূত হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।
বাংলাদেশের এই কৌশলগত আরোহণের পেছনে কাজ করছে তার ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ বাজার এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে শক্তিশালী অবস্থান। এইচএসবিসি ব্যাংকের গ্লোবাল রিসার্চ ‘দ্য ওয়ার্ল্ড ইন ২০৩০’ (অক্টোবর ২০২২-এ প্রকাশিত) রিপোর্টে উল্লেখ আছে যে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের নবম বৃহত্তম ভোক্তাবাজারে পরিণত হবে। এই বিশাল ভোক্তা শ্রেণি এবং কর্মক্ষম তরুণ জনগোষ্ঠীর আধিক্য (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) বাংলাদেশকে বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি প্রধান আকর্ষণস্থলে পরিণত করেছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ক্রয়ক্ষমতার সমতা বা পিপিপিভিত্তিক জিডিপিতে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বিশ্বের শীর্ষ ৩৫টি অর্থনীতির একটি। গোল্ডম্যান স্যাক্স তাদের ‘গ্লোবাল ইকোনমিকস পেপার ১৩৪’-এ জোর দিয়ে বলেছে, এন-১১ ভুক্ত দেশগুলো যদি তাদের অবকাঠামো ও শাসন ব্যবস্থার সংস্কার চালিয়ে যেতে পারে, তবে তারা ২০৫০ সালের মধ্যে জি৭ ভুক্ত দেশগুলোর সমকক্ষ হতে পারবে।
প্রবৃদ্ধির প্রবেশদ্বার: অবকাঠামো ও আঞ্চলিক সংযোগ
বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত শীর্ষে বাংলাদেশের অবস্থান একে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক বাণিজ্যের একটি অপরিহার্য এবং প্রাকৃতিক প্রবেশদ্বার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ট্রান্স-এশীয় রেলওয়ে এবং এশীয় হাইওয়ে (বিশেষ করে এএইচ১, এএইচ২ ও এএইচ৪১) নেটওয়ার্কের সঙ্গে সমন্বিত সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশ শুধু একটি একক বাজার নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক ট্রানজিট ও লজিস্টিক হাবে রূপান্তরিত হচ্ছে। এই বিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, যা জাপানি সংস্থা জাইকার ‘বিগ-বি’ (বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট) উদ্যোগের অধীনে বাংলাদেশের সামুদ্রিক সক্ষমতাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। আট হাজার থেকে ১০ হাজার টিইইউ সক্ষমতার বিশাল কনটেইনার জাহাজ ধারণের ক্ষমতা অর্জনের মাধ্যমে মাতারবাড়ী বন্দরটি সিঙ্গাপুর, কলম্বো বা পোর্ট ক্লাং-এর মতো বিদেশি ট্রান্সশিপমেন্ট পয়েন্টগুলোর ওপর দীর্ঘদিনের একক নির্ভরশীলতা প্রায় সম্পূর্ণ কমিয়ে দেবে। জাইকা এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, সরাসরি জাহাজ ভেড়ানোর এই সুবিধার ফলে পণ্য পরিবহনের লজিস্টিক খরচ ১৫-২০ শতাংশ হ্রাস পাবে এবং সময় সাশ্রয় হবে প্রায় এক সপ্তাহ, যা বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে এক বৈপ্লবিক প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা যোগ করবে।
বাংলাদেশের এই অবকাঠামোগত সক্ষমতা শুধু অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির জন্য নয়, বরং উপ-আঞ্চলিক ভূ-অর্থনীতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে সক্ষম। বিবিআইএন (বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, নেপালের সমন্বয়ে তৈরি প্ল্যাটফর্ম) মোটর ভেহিকেল এগ্রিমেন্ট এবং ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধার মাধ্যমে বাংলাদেশ তার বন্দরগুলোকে নেপাল, ভুটান এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ‘সেভেন সিস্টার্স’ রাজ্যগুলোর জন্য উন্মুক্ত করে দেবে। বিশ্বব্যাংকের ‘কানেক্টিং টু থ্রাইভ’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, যদি এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন লজিস্টিক সংযোগ নিশ্চিত করা যায়, তবে দক্ষিণ এশিয়ায় আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্য প্রায় ২০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল এই বিশাল বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। বিশেষ করে স্থলবেষ্টিত নেপাল ও ভুটানের জন্য চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর এখন সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রধান ও সাশ্রয়ী ধমনি হিসেবে স্বীকৃত হচ্ছে।
তদুপরি বাংলাদেশের এই কানেক্টিভিটি লক্ষ্যমাত্রা কেবল সড়ক বা জলপথেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা ডিজিটাল এবং জ্বালানি করিডোর পর্যন্ত বিস্তৃত। কক্সবাজার ও কুয়াকাটায় অবস্থিত সাবমেরিন কেবল ল্যান্ডিং স্টেশন এবং ভারতের সঙ্গে আন্তঃদেশীয় বিদ্যুৎ গ্রিড সংযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি ‘মাল্টি-মোডাল করিডোর’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। এই অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে বাংলাদেশ এখন বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনে বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি স্থিতিশীল গন্তব্য হিসেবে বিবেচিত হবে, যারা চীন-পরবর্তী (চীন প্লাস ওয়ান) সাপ্লাই চেইন বিকল্প খুঁজছে। মূলত গভীর সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে রেল ও সড়ক নেটওয়ার্কের এই মেলবন্ধন ঢাকাকে কেন্দ্র করে একটি একীভূত আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বলয় তৈরি করছে, যা একুশ শতকে এশীয় প্রবৃদ্ধির মানচিত্রে বাংলাদেশকে একটি কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তা নেপাল, ভুটান এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের মতো স্থলবেষ্টিত দেশগুলোকে বার্তা দিচ্ছে যে সামুদ্রিক বাণিজ্যের জন্য বাংলাদেশই এখন সেরা সংযোগস্থল।
কৌশলগত বিশ্লেষণ: ভূ-রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রভাবক
বাংলাদেশের বর্তমান কৌশলগত উত্থান শুধু ইট-পাথরের ভৌত অবকাঠামোর সমাহার নয়, বরং এটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ভূ-স্থানিক সক্ষমতার (জিওস্পেশিয়াল লেভারেজ) একটি কার্যকর বহিঃপ্রকাশ। আমি মনে করি, মাতারবাড়ী-মহেশখালী অক্ষ বর্তমানে একটি সুদূরপ্রসারী ‘ত্রিমুখী কৌশল’ বা ‘ট্রিপল স্ট্র্যাটেজি’ সম্পদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এটি একই সঙ্গে একটি গভীর সামুদ্রিক প্রবেশদ্বার, একটি অত্যাধুনিক জ্বালানি হাব (এলএনজি ও কয়লা টার্মিনাল) এবং একটি বিশাল শিল্প প্রসারের ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করছে। ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। যদি তা পূরণ হয়, বাংলাদেশ তার প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দরের নাব্যের সীমাবদ্ধতা (ড্রাফট লিমিটেশন) চিরতরে কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে। এর ফলে মাদার ভেসেল বা বিশাল জাহাজ সরাসরি বাংলাদেশের উপকূলে ভিড়তে পারবে, যা বৈশ্বিক লজিস্টিক ইনডেক্সে বাংলাদেশের অবস্থানকে অনেক ওপরে নিয়ে যাবে।
এই উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের ‘মাল্টি-ভেক্টর’ বা বহুমুখী কূটনীতি বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। চীন-প্রস্তাবিত বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনেশিয়েটিভ (বিআরআই) এবং জাপানের বিগ-বি প্রকল্পের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ও ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয় বাংলাদেশের দূরদর্শী পররাষ্ট্রনীতির প্রমাণ দেয়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং জাইকার বিভিন্ন কৌশলগত পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ এখন শুধু বিদেশি ঋণে অবকাঠামো নির্মাণ করছে না, বরং একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ‘ইকোনমিক ইকোসিস্টেম’ গড়ে তুলছে। এই ব্যবস্থায় মিরসরাইয়ের শিল্পনগরের মতো বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং হাই-টেক পার্কগুলো কাজ করছে ‘সফটওয়্যার’ হিসেবে, আর নবনির্মিত উন্নত সড়ক ও রেল নেটওয়ার্ক কাজ করছে শক্তিশালী ‘হার্ডওয়্যার’ হিসেবে। এই সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যারের সংমিশ্রণ নিশ্চিত করছে যে বাংলাদেশ শুধু প্রতিবেশী দেশগুলোর ট্রানজিট বা করিডোর হিসেবে ব্যবহৃত হবে না, বরং এখানে উৎপাদিত পণ্য বিশ্ববাজারে রপ্তানির মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে উচ্চমূল্যের সংযোজন (ভ্যালু অ্যাডিশন) নিশ্চিত করবে।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশের এই অবস্থান একে একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘লিঞ্চপিন’ বা সংযোগকারী শক্তিতে পরিণত করেছে। বিশ্বব্যাংকের ‘সাউথ এশিয়া ইকোনমিক ফোকাস’ রিপোর্টে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে ডিজিটাল অবকাঠামোর সঙ্গে ভৌত সংযোগের এই মেলবন্ধন ঢাকাকে কেন্দ্র করে একটি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক হাব হিসেবে প্রকাশ পাবে। বাংলাদেশ এখন আর দক্ষিণ এশিয়ার একটি সাধারণ ‘সেতু’ বা প্যাসিভ প্যাসেজ নয়, বরং এটি একটি সক্রিয় ‘অর্থনৈতিক গন্তব্য’ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে। মাতারবাড়ী থেকে মিরসরাই পর্যন্ত বিস্তৃত করিডোরটি ভবিষ্যতে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের ব্লু-ইকোনমি এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠবে, যা বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের দরকষাকষির ক্ষমতাকে এক নতুন মাত্রায় উন্নীত করবে। মূলত বাংলাদেশ এখন শুধু একটি ‘সেতু’ নয়, বরং একটি ‘গন্তব্য’ হয়ে উঠবে বলে অর্থনীতিবিদরা আশা প্রকাশ করছেন।
আর্থিক সার্বভৌমত্ব: ডলারের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো
মার্কিন ডলারের বৈশ্বিক আধিপত্য বা ‘ডলারাইজেশন’ প্রক্রিয়ার বিবর্তন বর্তমান ভূ-অর্থনীতির এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আলোচিত অধ্যায়। যদিও মার্কিন ডলার এখনও বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে তার অবস্থান বজায় রেখেছে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একে একটি ভূ-রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা– বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষিতে রুশ রিজার্ভ জব্দ করা এবং আফগানিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থ আটকে দেওয়ার মতো ঘটনাগুলো– বিশ্বের অনেক দেশের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাম্প্রতিক উপাত্ত অনুযায়ী, ২০০০ সালের শুরুতে বিশ্বব্যাপী কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর রিজার্ভে ডলারের হার ছিল ৭০ শতাংশের বেশি, বর্তমানে তা ৬০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে (এখন প্রায় ৫৬-৫৭%)। এই পরিবর্তন কোনো আকস্মিক পতন নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত ও ধীরগতির বৈচিত্র্যকরণ বা ‘ডি-ডলারাইজেশন’ প্রক্রিয়া– যা গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোকে তাদের আর্থিক সার্বভৌমত্ব রক্ষায় উৎসাহিত করছে।
এই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশও অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন এবং বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছে। ভারতের সঙ্গে রুপিতে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য শুরু করা এবং চীনের সঙ্গে নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেনের সম্ভাব্যতা যাচাই করা বাংলাদেশের সেই দীর্ঘমেয়াদি কৌশলেরই অংশ। গোল্ডম্যান স্যাক্স এবং ব্রিকস দেশগুলোর অর্থনৈতিক ফোরামগুলোতে বারবার আলোচনা করা হচ্ছে যে ডলারের বিকল্প হিসেবে আঞ্চলিক মুদ্রার ব্যবহার লেনদেন খরচ কমানোর পাশাপাশি মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকিও হ্রাস করে। বিশেষ করে ২০২১ সালে ব্রিকস প্রতিষ্ঠিত নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এনডিবি) সদস্যপদ গ্রহণ বাংলাদেশের জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের মতো পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানের কঠোর ও অনেক সময় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত শর্ত ছাড়াই এই ব্যাংক উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বড় ধরনের অবকাঠামোগত অর্থায়ন প্রদান করছে, যা বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য অর্থায়নের একটি শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য কৌশলটি মূলত একটি ‘হেজড ইকোনমিক স্ট্র্যাটেজি’ বা ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক নীতি। একদিকে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে শক্তিশালী রপ্তানি সম্পর্ক বজায় রাখা এবং অন্যদিকে ব্রিকস-চালিত আর্থিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হওয়া– এই দ্বিমুখী অবস্থান জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও উন্নয়নের গতি সুরক্ষিত করছে। ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমের উদ্ভাবন এবং আন্তঃসীমান্ত লেনদেনে ব্লকচেইন প্রযুক্তির ব্যবহার ভবিষ্যতে ডলারের ওপর নির্ভরশীলতা আরও কমিয়ে আনবে। মূলত বাংলাদেশ এখন এমন এক অর্থনৈতিক পথে হাঁটছে, যেখানে বৈশ্বিক আর্থিক ধাক্কা থেকে নিজের মুদ্রাকে রক্ষা করা এবং ভূ-রাজনৈতিক চাপের মুখেও উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব হবে। এই আর্থিক রূপান্তরই ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে একটি বহুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থায় নেতৃত্বের আসনে আসীন হতে সহায়তা করবে।
পেমেন্ট ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ: সুইফট থেকে বিকেন্দ্রীভূত পথে
বিশ্ব অর্থনীতির স্নায়ুতন্ত্র হিসেবে পরিচিত সুইফট নেটওয়ার্ক এখন সমান্তরাল ও বিকেন্দ্রীভূত পেমেন্ট ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। চীনের সিআইপিএস এবং রাশিয়ার এসপিএফএস এখন শুধু জরুরি বিকল্প নয়, বরং নন-ডলার বাণিজ্যের একীভূত নেটওয়ার্কে পরিণত হচ্ছে। এ ছাড়া ডিস্ট্রিবিউটেড লেজার টেকনোলজি এবং সেন্ট্রাল ব্যাংক ডিজিটাল কারেন্সি (যেমন এমব্রিজ প্রজেক্ট) রিয়েল-টাইমে বাণিজ্য নিষ্পত্তির সম্ভাবনা দেখাচ্ছে, যা সুইফট বা ডলারের প্রয়োজনীয়তাকে খর্ব করবে। অদূর ভবিষ্যতে ব্যাংকগুলো ইন্টেলিজেন্ট রাউটিং সফটওয়্যারের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লেনদেনের সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও নিরাপদ পথ বেছে নেবে। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য এই পরিবর্তন বৈশ্বিক আর্থিক ধাক্কা থেকে সুরক্ষা পাওয়ার একটি পথ খুলে দিচ্ছে।
করিডোর সংযোগ: মহাদেশীয় সংহতিতে বাংলাদেশের ভূমিকা
একুশ শতকের ভূ-অর্থনীতিতে ভৌগোলিক অবস্থানই একটি দেশের প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়েছে, যা বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে এক ঈর্ষণীয় সংযোগকারী অবস্থানে নিয়ে এসেছে। বিশ্ব যখন মহামারি-পরবর্তী অস্থিরতা এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে তাদের সাপ্লাই চেইন নিয়ে নতুন করে ভাবছে, তখন বাংলাদেশ প্রধান সামুদ্রিক ও স্থল করিডোরগুলোর মোহনায় দাঁড়িয়ে এক অপরিহার্য ‘কানেক্টিভিটি লিঞ্চপিন’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। আসিয়ান (দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোট) দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক প্রভাব এবং বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের পুরো অঞ্চলের প্রধান লজিস্টিক হাবে পরিণত হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার যদি বাংলাদেশ তা কাজে লাগাতে পারে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ‘সাউথ এশিয়া সাবরিজিওনাল ইকোনমিক কোঅপারেশন’ (সাসেক) কাঠামোর অধীনে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ভারত, নেপাল এবং ভুটানের সঙ্গে আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্যের এক নতুন মানচিত্র তৈরি করেছে, যা মহাদেশীয় সংহতির প্রাথমিক ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের এই সংযোগকারী ভূমিকা শুধু প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি আরও বিস্তৃত হচ্ছে ইরান, তুরস্ক, পাকিস্তান এবং জিসিসি (উপসাগরীয় দেশগুলোর জোট) ভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে আঞ্চলিক সংযোগ তৈরির মাধ্যমে। এই দেশগুলোকে যদি একটি সমন্বিত বাণিজ্যিক কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তবে প্রাচীন সিল্ক রোডের একটি আধুনিক এবং দক্ষিণমুখী সংস্করণ পুনরুজ্জীবিত হবে। বিশেষ করে ট্রান্স-এশীয় রেলওয়ে এবং এশীয় হাইওয়ে (এএইচ১ ও এএইচ২) প্রকল্পগুলো কার্যকর হলে বাংলাদেশ মধ্য এশিয়া থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত এক বিশাল বাজারের কেন্দ্রে অবস্থান করবে। বিশ্বব্যাংকের ‘কানেক্টিং টু থ্রাইভ’ প্রতিবেদন বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন লজিস্টিক সংযোগ প্রতিষ্ঠিত হলে এ অঞ্চলের দেশগুলোর আয় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। বাংলাদেশ এই প্রক্রিয়ায় একটি স্থিতিশীল এবং নিরপেক্ষ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে, যা ভূ-রাজনৈতিক মেরূকরণের ঊর্ধ্বে উঠে বিশুদ্ধ বাণিজ্যিক স্বার্থে এশীয় দেশগুলোকে একীভূত করতে সক্ষম।
তদুপরি বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে জাপানের ‘বিগ-বি’ উদ্যোগ এবং ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ পলিসির সঙ্গে বাংলাদেশের কৌশলগত সমন্বয় দেশটিকে বৈশ্বিক বাণিজ্যের এক প্রধান নাব্য করিডোরে রূপান্তরিত করছে। যখন মালাক্কা প্রণালির বিকল্প এবং নিরাপদ রুট খোঁজা হচ্ছে, তখন বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রবন্দর এবং প্রস্তাবিত ইকোনমিক করিডোরগুলো বৈশ্বিক শিপিং লাইনগুলোর জন্য নতুন আশার আলো হয়ে দেখা দিচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশ শুধু অন্যের পণ্য পরিবহনের পথ হিসেবে ব্যবহৃত হবে না, এখানে স্থাপিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর মাধ্যমে একটি ‘উৎপাদনমুখী গন্তব্য’ হিসেবে মহাদেশীয় সাপ্লাই চেইনের মান-সংযোজনী (ভ্যালু অ্যাডেড) অংশীদারও হয়ে উঠবে। মূলত নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করার সম্ভাবনার কারণে বাংলাদেশ আজ এশীয় সংহতির এমন এক কেন্দ্রে অবস্থান করছে, যা পশ্চিম এশিয়া থেকে সুদূর প্রাচ্য পর্যন্ত একটি নিরবচ্ছিন্ন অর্থনৈতিক সেতুবন্ধ তৈরির সম্ভাবনা উন্মোচন করেছে।
ভৌগোলিক অবস্থান বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সংযোগকারী এক ঈর্ষণীয় অবস্থানে নিয়ে এসেছে। যখন বিশ্ব তার সাপ্লাই চেইন নিয়ে নতুন করে ভাবছে, বাংলাদেশ তখন প্রধান সামুদ্রিক ও স্থল করিডোরগুলোর মোহনায় দাঁড়িয়ে আহ্বান জানাতে পারে। আসিয়ান দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং বঙ্গোপসাগরের অবস্থান কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ পুরো অঞ্চলের লজিস্টিক হাবে পরিণত হতে পারে। ইরান, তুরস্ক, পাকিস্তান এবং জিসিসি দেশগুলোকে এই আঞ্চলিক কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত করা হলে এই সম্ভাবনা আরও বহুগুণ হয়ে যাবে। বাংলাদেশ একটি স্থিতিশীল এবং নিরপেক্ষ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে এই বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে উন্মোচন করতে পারে।
কৃষিপ্রযুক্তি: খাদ্য স্বনির্ভরতার মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তা
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই সন্ধিক্ষণে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরবর্তী প্রধান নির্ণায়ক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে খাদ্য নিরাপত্তা। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি, বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সাপ্লাই চেইন বিঘ্নিত হওয়ার এই যুগে একটি দেশের নিজস্ব জনগোষ্ঠীকে নিরবচ্ছিন্নভাবে খাদ্য সরবরাহের সক্ষমতা এখন শুধু কৃষি উন্নয়নের বিষয় নয়, বরং তা জাতীয় নিরাপত্তার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবেই কৃষিতে এক অভাবনীয় সাফল্যের ইতিহাস তৈরি করেছে, যেখানে স্বাধীনতার পর থেকে আবাদি জমি কমলেও খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে প্রায় চার গুণ। বর্তমানে এই সাফল্যকে টেকসই করতে এবং একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রযুক্তি বা এগ্রি-টেক গ্রহণের মাধ্যমে এক আমূল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এআই (কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা) চালিত কৃষি ব্যবস্থাপনা, ড্রোন প্রযুক্তির মাধ্যমে ফসলের রোগ নির্ণয় এবং স্যাটেলাইট ইমেজারির ব্যবহার ইতোমধ্যে বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠেছে।
আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির এই বিবর্তনে ‘প্রিসিশন এগ্রিকালচার’ বা সূক্ষ্ম কৃষি এবং স্মার্ট সেচ ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইরি) এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে সেন্সরভিত্তিক সেচ ব্যবস্থা এবং ইন্টারনাল অব থিংস (আইওটি) ব্যবহারের মাধ্যমে পানির অপচয় কমিয়ে ফসলের উৎপাদনশীলতা ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা সম্ভব। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) ইতোমধ্যে লবণাক্ততা ও খরা সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন করে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার পথ দেখিয়েছে। এই উদ্ভাবনের সঙ্গে যখন হাই-টেক সাপ্লাই চেইন এবং ব্লকচেইনভিত্তিক বিপণন ব্যবস্থা যুক্ত হবে, তখন পচনশীল পণ্যের অপচয় কমানোর মাধ্যমে কৃষকের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত হবে। এটি বাংলাদেশকে খাদ্য আমদানিকারক দেশ থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক খাদ্য রপ্তানিকারক দেশে রূপান্তরিত হওয়ার সম্ভাবনাকে বাস্তব রূপ দেবে।
তদুপরি এন-১১ দেশগুলোর বিশাল জনসংখ্যা এবং ক্রমবর্ধমান খাদ্যের চাহিদাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ নিজেকে একটি ‘ফুড বাস্কেট’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ পেয়েছে। গ্লোবাল ফুড সিকিউরিটি ইনডেক্স অনুযায়ী, যেসব দেশ কৃষি-প্রযুক্তিতে যত দ্রুত বিনিয়োগ করবে, তারাই আগামী দশকের বৈশ্বিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করবে। উচ্চফলনশীল বীজের সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং রোবোটিক্সের সমন্বয় ঘটিয়ে বাংলাদেশ এখন এমন এক স্তরে পৌঁছতে পারে, যেখানে খাদ্য স্বনির্ভরতা শুধু অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ করবে না; বরং তা হবে দেশের আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।
শিল্প বিবর্তন: বৃত্তাকার অর্থনীতির দিকে যাত্রা
একটি বহুমুখী বিশ্বে অর্থনৈতিক শক্তি এখন কেবল গতানুগতিক উৎপাদনের ওপর নয়, বরং উচ্চতর প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং গ্রিন এনার্জি পণ্যের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করছে। এন-১১ দেশগুলো বর্তমানে বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে, যা মূলত পশ্চিমা বাজারকে বর্জন করার কোনো প্রচেষ্টা নয়, বরং একটি টেকসই ‘বৃত্তাকার বাণিজ্য অর্থনীতি’ (সার্কুলার ইকোনমি) গড়ে তোলার উদ্যোগ, যেখানে উদীয়মান দেশগুলো নিজেদের মধ্যে বাণিজ্যের হার বৃদ্ধি করছে। বাংলাদেশ তার বিশাল কর্মক্ষম তরুণ শ্রমশক্তি এবং দ্রুত বর্ধনশীল মধ্যবিত্ত ভোক্তা শ্রেণি নিয়ে এই পরিবর্তনের পূর্ণ সুবিধা নিতে এবং আঞ্চলিক উৎপাদন হাব হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডাব্লিউটিও) মতে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে আন্তঃবাণিজ্য (সাউথ-সাউথ ট্রেইড) বৃদ্ধির এই প্রবণতা বৈশ্বিক মন্দার ঝুঁকি হ্রাসে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং ম্যাককিনসের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মতো শ্রমঘন দেশগুলো যদি প্রযুক্তিগত রূপান্তরে সফল হয়, তবে তারা বৃত্তাকার অর্থনীতির মাধ্যমে তাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে অতিরিক্ত ২-৩ শতাংশ অবদান যুক্ত করতে পারবে। মূলত নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমন্বয়ে বাংলাদেশ এখন এমন এক শিল্পবিপ্লবের দিকে ধাবিত হচ্ছে, যা দেশের রপ্তানি ঝুড়ি বৈচিত্র্যময় করার পাশাপাশি পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করে একটি স্থিতিশীল ও স্বনির্ভর অর্থনৈতিক কাঠামো নিশ্চিত করবে।
কৌশলগত সংস্কার: সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের রোডম্যাপ
বাংলাদেশের টেকসই প্রবৃদ্ধির এই ধারাকে দীর্ঘমেয়াদি সফলতায় রূপান্তরের মূল চাবিকাঠি হলো গভীর কাঠামোগত সংস্কার এবং শক্তিশালী আঞ্চলিক সংহতি। ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধির রোডম্যাপ বাস্তবায়নে বাংলাদেশকে মাতারবাড়ীর মতো কৌশলগত মেগা প্রকল্পগুলোতে বিনিয়োগের গতি দ্বিগুণ করার পাশাপাশি একটি বিনিয়োগবান্ধব কর কাঠামো এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্বব্যাংকের ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ বা ব্যবসায়িক সহজীকরণ সূচকের মানদণ্ড অনুযায়ী সংস্কার করা গেলে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণে বাংলাদেশ এন-১১ দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে অবস্থান করতে সক্ষম হবে। বিশেষ করে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে সংগতি রেখে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত উৎপাদন ব্যবস্থা এবং টেকসই শিল্পায়নকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে বাংলাদেশ বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনে সাধারণ পণ্য উৎপাদনকারী থেকে উচ্চমূল্যের প্রযুক্তিগত অংশীদার হিসেবে নিজেকে উন্নীত করতে পারে। এটি শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়, বরং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী উচ্চমানের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও সহায়ক হবে।
আঞ্চলিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে বিমসটেক এবং সার্কের মতো ফোরামগুলোতে বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণ এখন কেবল কূটনৈতিক শিষ্টাচার নয়, বরং এটি ভূ-অর্থনৈতিক প্রয়োজন। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিকল্প নৌপথ এবং নিরবচ্ছিন্ন বাণিজ্য রুট তৈরির নেতৃত্বে থাকার মাধ্যমে বাংলাদেশ মালাক্কা প্রণালির মতো বৈশ্বিক চেকপয়েন্টগুলোর ওপর চাপ কমিয়ে নিজস্ব বাণিজ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। জাইকা এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে বাংলাদেশ যদি তার ডিজিটাল কানেক্টিভিটিকে ভৌত অবকাঠামোর সমান্তরালে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ব্যবহার করতে পারে, তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেশটি একটি ‘উচ্চ আয়ের উন্নত অর্থনীতি’-তে রূপান্তরের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারবে। মূলত স্বচ্ছ শাসন ব্যবস্থা, উদ্ভাবনী প্রযুক্তি এবং নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির সমন্বিত প্রয়োগই হবে বাংলাদেশের সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের মূল ভিত্তি, যা দেশটিকে একুশ শতকের বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থায় একটি স্থিতিশীল অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে।
মো. বদরুল মিল্লাত ইবনে হান্নান: সিপিএ অস্ট্রেলিয়ার একজন অ্যাসোসিয়েট এবং কানাডার আইএফসি ইনকরপোরেটেডের একজন সার্টিফায়েড ফিন্যান্সিয়াল কনসালট্যান্ট
[email protected]
- বিষয় :
- অর্থনীতি
