ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

সহিংসতায় ছেয়ে যাচ্ছে সমাজ

সহিংসতায় ছেয়ে যাচ্ছে সমাজ
×

মোছা. নুরুন্নাহার বেগম রিক্তা

প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬ | ০৭:১০

| প্রিন্ট সংস্করণ

কুষ্টিয়া পৌরসভার জুগিয়া দর্গাপাড়ার বাসিন্দা আমেনা বেগম (ছন্দনাম); বিধবা। এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে স্বামীর বাড়িতে বাস করেন। চার বছর আগে দিনমজুর স্বামী মারা যান। ১৬ বছরের মেয়ে নবম ও ১২ বছরের ছেলেটি ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। স্বামী মারা যাওয়ার পরও আত্মীয়স্বজনের সহযোগিতা, বাড়িতে হাঁস-মুরগি পালন ও সবজি চাষ করে সংসার ভালোই চলছিল। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে নিজ বাড়ির সামনে সবজি ক্ষেতে কাজের সময় পাশের বাড়ির কয়েকজন তাঁকে মারার হুমকি দেয়। তারা তাঁকে বিএনপিতে ভোট দেওয়ার জন্য বিভিন্নভাবে জেরা করে। তিনি প্রতিবাদ করায় তারা সবাই তাঁর দিকে রুখে আসে এবং এলোপাতাড়ি মারধর করে। পরে এলাকার কয়েকজন যুবক তাদের দলে যোগ দেয় এবং তাঁকে মাটিতে ফেলে দিয়ে লাথি মারতে থাকে। আমেনার মেয়ে তাদের বাধা দেয়। পরে তারা মেয়েকেও লাঠি দিয়ে আঘাত, কিল-ঘুষি দিয়ে রক্তাক্ত করে। 

এমন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে একজন নারী আরও কিছু লোকজন নিয়ে তাদের ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে প্রতিবেশীর বাড়িতে নিয়ে যান। কিছুক্ষণ পর ওই এলাকার জামায়াতকর্মী অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়ে আবারও আমেনা বেগম ও তাঁর মেয়ের ওপর হামলা করে।
পরে প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় ঘটনা কিছুটা স্বাভাবিক হলে আমেনা বেগমের আত্মীয়রা তাঁকে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়া মডেল থানায় আমেনা বেগম সাধারণ ডায়েরি করেন। ঘটনাটি পুলিশের তদন্তাধীন। এরপরও তিনি ছেলেমেয়ে নিয়ে নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বাস করছেন। দিনের বেলা বাইরে বের হতে পারছেন না। সংসারের কাজকর্ম ঠিকমতো করতে পারছেন না। রাতে বাড়িতে থাকতে ভয় পাচ্ছেন। ঠিকমতো ঘুমাতে পারছেন না, যেহেতু তাঁর মেয়েটি কিশোরী। আবার আত্মীয়বাড়ি যেতে পারছেন না। কারণ বাড়িতে না থাকলে জিনিসপত্র রাতের অন্ধকারে নিয়ে যেতে পারে। 

এমন পরিস্থিতিতে অনেক মানুষ বাড়ি ছেড়ে বাইরে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এমনকি আত্মহত্যার মতো কঠিন পথ বেছে নেন। ছেলেমেয়ের পড়ালেখায় অনীহা সৃষ্টি হয়। এমনকি পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায়।
সমাজে এমন অনেক ঘটনা ঘটে, যা অনেক সময় অজানা থেকে যায়। নির্যাতিত/ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা লোকলজ্জার ভয়ে এবং আত্মসম্মানের কথা চিন্তা করে এমন ঘটনা আড়াল করেন। এ পরিস্থিতিতে অনেক পরিবার ধ্বংস হয়ে যায়। পরে ওই ছেলেমেয়ে সমাজে সবার কাছে হেয় হয়ে বেঁচে থাকে। তাদের জীবনের দায়িত্ব নেওয়ার মতো কেউ থাকে না।
এ পরিস্থিতিতে এসব পরিবারের সদস্য পরিবারের অন্যান্য সদস্য দ্বারা যেমন দাদা-দাদি, চাচা-চাচি, ফুপা-ফুপু, মামা-মামি, খালা-খালু, ননদ- জা-ভাশুর, শ্বশুর-শাশুড়ি, প্রতিবেশী, প্রতিষ্ঠানের মালিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারী, এলাকার জনপ্রতিনিধির নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকেন।

বিভিন্ন ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, দুর্ব্যবহার, অবহেলা, যৌন নির্যাতন, পাচার, ধর্ষণ, ধর্ষণজনিত কারণে মৃত্যু, বলাৎকার, ভিক্ষাবৃত্তিসহ পতিতালয়ে বিক্রির মতো ঘটনা প্রায়ই ঘটে। বর্তমানে দেশে এমন নির্যাতনের ঘটনা বেড়েই চলেছে। এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন হিসেবে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। যা সবচেয়ে দুঃখজনক, অপরাধ করার পর অপরাধীদের শাস্তি হচ্ছে না। গর্হিত অপরাধ সংঘটনের পরও তারা সমাজে চলাচল করছে মাথা উঁচিয়ে। এক ধরনের আশকারা পাওয়ায় অপরাধ হ্রাসের পরিবর্তে তা ক্রমবর্ধমান। 

মোছা. নুরুন্নাহার বেগম রিক্তা: লিগ্যাল এইড অফিসার, মুক্তি নারী ও শিশু উন্নয়ন সংস্থা, কুষ্টিয়া

আরও পড়ুন

×