নৃ-মু খ
আওয়ামী লীগ নিয়ে এত কথা কেন
জোবাইদা নাসরীন
জোবাইদা নাসরীন
প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬ | ০৭:১৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রায় দুই বছর ধরে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সক্রিয় নেই। গত বছরের মে মাসে ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯’ সংশোধন করে আওয়ামী লীগ, তার সব অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। সেই অধ্যাদেশ বর্তমান বিএনপি সরকারও সংসদে অনুমোদন করেছে। সেই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে গিয়ে এমনকি কেউ ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিলেই তাকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।
এত কিছুর পরও আওয়ামী লীগ নিয়ে আলোচনা থেমে নেই। সরকারকেও নানা রাজনৈতিক ঘটনায় দলটি ঘিরে দেশি-বিদেশি মহলের প্রশ্নের জবাব দিতে হচ্ছে। জাতীয় নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ কেন নেই– এমন প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারকে। বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নির্বাচনে দলটির সমর্থকদের অংশ নিতে না দেওয়ার কারণও বর্তমান সরকারের সদস্যদের ব্যাখ্যা করতে হচ্ছে। সম্প্রতি ভারতীয় একাধিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা তাঁর দেশে ফেরার কথা যেভাবে বলেছেন, তা আওয়ামী লীগকেন্দ্রিক আলোচনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। এ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা কথা বলেছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের একাধিক উপদেষ্টাও সামাজিক মাধ্যমের পাশাপাশি মূলধারার সংবাদমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, সরকার শেখ হাসিনাকে ‘কোনো অতিরিক্ত বিচারবহির্ভূত প্রক্রিয়ায় নয়, বরং আইনি প্রক্রিয়ার (প্রত্যর্পণ চুক্তি) মাধ্যমে দেশে ফেরত আনতে চায়’ (সমকাল, ২২ মে)। তথ্য উপদেষ্টা বলেছেন, শেখ হাসিনা ফিরে এলে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো বিচারবহির্ভূত পদক্ষেপ নেওয়া হবে না এবং তাঁর প্রতি ‘ইনসাফ’ নিশ্চিত করা হবে। (কালের কণ্ঠ, ১৯ মে)। সম্প্রতি যমুনা টেলিভিশনে প্রচারিত তাঁর এক সাক্ষাৎকার অনুসারে, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন মনে করেন, আগামী নির্বাচনেই অংশ নিতে পারে আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুর দিকেই আওয়ামী লীগ ‘ব্যাক করেছে’ (২০ মে, ২০২৬)।
শিগগিরই আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ ঠেকাতে নির্বাচন কমিশন (ইসি) পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে জানা যাচ্ছে। মঙ্গলবার সমকালের এক সংবাদে বলা হয়েছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন-সংক্রান্ত কিছু বিধি সংশোধনের প্রস্তাব তৈরি করেছে ইসি, যেখানে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিষিদ্ধ বা নিষেধাজ্ঞার আওতায় কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নেই– এই মর্মে ইসির তৈরি করা অঙ্গীকারনামায় সই দিতে হবে। কেন এমন পদক্ষেপ?
“বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ প্রশ্নে এখন যা হচ্ছে, তা দুই বড় দলের (বিএনপি ও জামায়াত) ‘নিরাপত্তাহীনতার’ বোধ থেকে বলে মনে করছেন মাহফুজ আলম। সমকাল অনলাইনের খবর অনুসারে, সোমবার সন্ধ্যায় নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে এক পোস্টে তিনি লিখেছেন: ‘লীগ প্রশ্নে এখন যা চলছে, তা হচ্ছে দুই বড় দলের ইনসিকিউরিটি। কৌন বনেগা লীগকা বাপ?’ ৮৬ আর ৯৬-এর স্মৃতি বিএনপি ভুলতে পারছে না, আর জামায়াত আছে আদর্শিক শত্রুতা/সহিংসতার ভয়ে, যা বিএনপি-লীগের নব্বইয়ের দশকের যৌথ আক্রমণের স্মৃতি থেকে উৎসারিত।”
একই পোস্টে মাহফুজ আরও লিখেছেন, আগামী দিনে ক্ষমতায় থেকে বিএনপি ‘বহুদলীয় গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা করে নেবে আর জামায়াত ‘চুপ মেরে গুপ্ত’ হয়ে যাবে।
একটি রাজনৈতিক দলের টিকে থাকা-না থাকা নির্ভর করে জনগণের ওপর। জুলাইয়ের আন্দোলনে আওয়ামী লীগের রাজনীতি ভয়াবহ ধরনের ধাক্কা খেয়েছে, বলতেই হবে, যা অন্য আট-দশটি চোটের চেয়ে গুরুতর। তবে এটিও কিছুটা ঠিক যে, আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যে ধস নেমেছিল সেটি কিছুটা কাটিয়ে দিয়েছে খোদ ইউনূস সরকার। একের পর এক মব সৃষ্টি, বারবার ৩২ নম্বরে আক্রমণ, মুক্তিযুদ্ধের বিপরীতে ২৪-কে দাঁড় করানো, মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণ, হেনস্তা, কবর থেকে উঠিয়ে লাশ পোড়ানো, মাজার, দরগা-পীর-ফকিরদের ওপর আক্রমণ, একের পর এক অনুষ্ঠান বাতিল করা এবং ধর্মীয় গোষ্ঠীর আধিপত্য, কথায় কথায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা, হরেদরে হত্যা মামলা– সবকিছুর বিরুদ্ধে জনপ্রতিক্রিয়ার ফসল গেছে আওয়ামী লীগের ঝুলিতে।
দলটির প্রধান শেখ হাসিনাসহ অনেক নেতা এখনও দেশের বাইরে। তবে কর্মী-সমর্থক প্রায় সবাই আছেন দেশেই। তৃণমূলে তাদের ভিত্তি রয়েছে। ভোটের ময়দানে এই কর্মী-সমর্থকদের চাহিদা কেমন, তা বিগত সংসদ নির্বাচনেই দেখা গেছে। কিন্তু তারা অনেকাংশেই নীরব। অনলাইনে বিশেষত প্রবাসী আওয়ামী লীগাররা নানা তৎপরতা চালাচ্ছেন বটে, কিন্তু সেটিও রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের সক্রিয়তার ইঙ্গিত দেয় না।
তাহলে কেন রাজনীতিতে ঘুরেফিরে আসছে আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গ? অনানুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির নেতাদের কথাবার্তা শুনলে মনে হবে, তারা সম্পর্কের দিক থেকে আওয়ামী-জামায়াত প্রশ্নে দোদুল্যমানতায় ভুগছেন। কিন্তু সরকারি সিদ্ধান্ত বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, তারা বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতের ওপরেই আস্থা রাখতে চাচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে মাহফুজ আলমের ওপরে উদ্ধৃত ব্যাখ্যাই সত্য বলে ধরে নেওয়া যায়– মূলত বিএনপি ও জামায়াতের আওয়ামী লীগভীতি থেকেই আলোচনায় থাকছে আওয়ামী লীগ। ‘আর কখনও আওয়ামী লীগকে রাজনীতি করতে দেওয়া হবে না’– এনসিপি নেতাদের মাঝেমধ্যে এমন হুংকারের নেপথ্যেও ওই ভয় কাজ করছে।
তবে দেশের সবচেয়ে প্রাচীন রাজনৈতিক দল হিসেবে রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে প্রাসঙ্গিক হতে হবে জনগণের মাধ্যমেই। অন্তর্বর্তী সরকারের অনেক পদক্ষেপ যেমন আওয়ামী লীগকে প্রাসঙ্গিক করেছে, তেমনি বর্তমান সরকারের নানা নেতিবাচক কর্মকাণ্ড ও সিদ্ধান্তের ফলও যাবে আওয়ামী লীগের ঘরে। তবে এ থেকে ৭৭ বছর বয়সী দলটি কতটা ফায়দা তুলতে পারবে, তা নির্ভর করে নেতৃত্বের বিচক্ষণতা ও জনসম্পৃক্ত কৌশলের ওপর।
বিগত সংসদ নির্বাচনের ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বিএনপি যদি সত্যিই স্থিতিশীল বাংলাদেশ গড়তে চায়, তাহলে তাকে পুরোনো প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তেমনটা করতে হলে দেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই, যেখানে আওয়ামী লীগকে বাদ দেওয়ার সুযোগ থাকবে না।
জোবাইদা নাসরীন: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
- বিষয় :
- জোবাইদা নাসরীন
