কোরবানির পশু
চামড়া নিয়ে আলোচনাই বাড়ে, অভিজ্ঞতা বদলায় না
হাসান মামুন
হাসান মামুন
প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬ | ০৭:২১ | আপডেট: ০৩ জুন ২০২৬ | ০৭:২২
| প্রিন্ট সংস্করণ
কোরবানির চামড়া ঘিরে তিক্ত অভিজ্ঞতা দ্রুত বদলানোর নয়। তবে পরিস্থিতির অবনতি নিশ্চয় কেউ দেখতে চায়নি। নতুন সরকারের জন্যও এটা বিব্রতকর হওয়ার কথা। কোরবানির চামড়ার দাম তারা এবার কিছুটা বাড়িয়ে নির্ধারণ করেছিল। মূল্যস্ফীতি সমন্বয়ের ধারণা থেকেই এটা করা হয়ে থাকে। আমরা অবশ্য দেখছি, বেশ কয়েক বছর ধরে কোরবানির ঈদে পশুর চামড়ার ন্যূনতম দামও মিলছে না। তাতে ক্ষতিগ্রস্ত এর হকদার দরিদ্ররা। ক্ষতিগ্রস্ত এক শ্রেণির মাদ্রাসা ও এতিমখানা, যারা কোরবানির পশুর দানকৃত চামড়ার আয়ে দীর্ঘদিন ধরে উপকৃত। উপযুক্ত দাম না পেয়ে তাদের একাংশ এবার চামড়া সংগ্রহে যাবে না বলেও সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। দুর্ভাগ্যবশত, এবারকার অভিজ্ঞতা আরও খারাপ।
সারাবছর জবাই হওয়া গরু-ছাগলের প্রায় অর্ধেক সংখ্যক কোরবানির ঈদে উৎসর্গ করা হয়। ঈদের দ্বিতীয়, তৃতীয় দিনে কিছু কোরবানি হলেও প্রথম দিনেই বিপুল চামড়া আসে বাজারে। প্রতিকূল আবহাওয়া থাকলে এর কিছু অবশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চামড়া ছাড়ানোর অদক্ষতায়ও এটা হয়ে থাকে। সময়মতো লবণ না দিলেও কিছু চামড়া নষ্ট হয়। সরকার অনেক ক্ষেত্রে বিনামূল্যে লবণ জুগিয়েও চামড়া রক্ষা করতে পারে না। তবে সবচেয়ে বেদনাদায়ক মৌসুমি ব্যবসায়ীদের একাংশের ক্ষুব্ধ হয়ে চামড়া ফেলে দেওয়া। অনেক ক্ষেত্রেই তারা পুঁজি ওঠানোর মতো দাম পায় না। এ অবস্থায় চামড়া সংগ্রহে পুনরায় তাদের আর নামার কথা নয়।
চামড়া কেনায় আগ্রহ কম দেখা গেছে আড়তদারদের। তাদের অভিযোগ রয়েছে সংগৃহীত চামড়ার মান ও সংরক্ষণ নিয়ে। আর হাতে পর্যাপ্ত মূলধন না থাকার কথা তারা এবারও জানিয়েছেন। চামড়া খাতে ব্যাংক, ট্যানার ও আড়তদারদের মধ্যে ‘বকেয়া অর্থ’ নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ রয়েছে। কোরবানির চামড়ার সরকার নির্ধারিত দাম না পাওয়ার পেছনে এটা কম দায়ী নয়। নতুন সরকার এদিকে দৃষ্টি দিতে পারে। এবারকার অভিজ্ঞতা মোটের ওপর গেলবারের চাইতেও খারাপ কেন– তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। পশু কোরবানি এবার কিছুটা কম হয়েছে বলেই অনুমান। চামড়া বিক্রির চাহিদা বেড়েছিল, সেটা বলা যাবে না। তারপরও অভিজ্ঞতা এত নেতিবাচক কেন, জানা দরকার।
অন্য সময়ে পশুর চামড়ার দাম যেমন থাকে, কোরবানির সময় ততটা না থাকাই স্বাভাবিক। বিক্রির চাপে দাম যাতে বেশি পড়ে না যায়, সে জন্যই সরকার দাম নির্ধারণ করে দেয়। এতে সুফল যে মিলত না, তা নয়। নির্ধারিত দামের চেয়েও বেশিতে কোরবানির চামড়া বিক্রির অভিজ্ঞতা রয়েছে মানুষের। তখন বিচরণরত গরু মেরে চামড়া খুলে নিয়ে চম্পট দেওয়ার খবরও মিলত। আর এখন বিশেষ করে ছোট গরুর চামড়ার নামমাত্র দামও মিলছে না। ছাগলের চামড়া তো ৫-১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ ছাগল ও ভেড়া কোরবানি মোট পশু কোরবানির কমবেশি অর্ধেক। ছোট আর মাঝারি গরুর কোরবানিও ক্রমবর্ধমান। তার মানে, গ্রহণযোগ্য দামে ‘বিক্রয়যোগ্য’ চামড়ার সংখ্যা কমে আসছে।
সক্রিয় ট্যানারির সংখ্যাও কমে এসেছে। নদী ও পরিবেশ দূষণের দায় থেকে এ শিল্পকে রেহাই দিতে ট্যানারিগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল সাভারে। কিন্তু সেখানে পরিবেশবান্ধব চামড়া শিল্পনগরী গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয় বিগত আওয়ামী লীগ সরকার। চাহিদানুযায়ী কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) নির্মাণে তাদের ব্যর্থতাও ক্ষমাহীন। এক সিইটিপি ইস্যুতেই চামড়া খাত এমন দুর্নামের মুখোমুখি যে ইউরোপ-আমেরিকায় আকর্ষণীয় দামে চামড়া রপ্তানিতে সেখানে স্থানান্তরিত প্রায় সব প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ। তাদের চামড়া বেচতে হয় অভ্যন্তরীণ বাজারে, আর প্রধানত চীনে। আমাদের আধাপাকা চামড়া সস্তায় নিয়ে নিজেদের সনদপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানে প্রক্রিয়াজাত করে দেশটি লাভ করছে বিপুল মুনাফা। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারের মান নিয়ন্ত্রক লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (এলডব্লিউজি) আমাদের আটটি প্রতিষ্ঠানকে কেবল সনদ দিয়েছে। হতাশাজনক পরিস্থিতিতেও স্বভাবত ভালো ব্যবসা করছে তারা।

আন্তর্জাতিক সনদপ্রাপ্ত ট্যানারির সংখ্যা বাড়াতে পারলে তাদের মধ্যে কোরবানির চামড়া সংগ্রহে প্রতিযোগিতা দেখা দিত। এটাকে তারা বরং নিত সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে। এতে কোরবানিদাতাদের মাধ্যমে সাহায্যপ্রাপ্তরাই কেবল উপকৃত হতো না; চামড়া খাতে রপ্তানিও দ্রুত বাড়ত। ‘নন-লেদার গুডস’ জনপ্রিয় হওয়ার সময়েও চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের বাজার কিন্তু বিরাট। এর প্রবৃদ্ধিও কম নয়। অথচ দীর্ঘ অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও চামড়া খাতে আমাদের অগ্রগতি সামান্য। বিশেষত এতে মূল্য সংযোজনে আমরা গভীরভাবে পিছিয়ে। যেসব প্রতিষ্ঠান ইউরোপ-আমেরিকায় চামড়াজাত পণ্য পাঠায়, তারাও ক্রেতাদের শর্ত মেনে চামড়া আমদানিপূর্বক তা ব্যবহার করছে। পরিবেশসম্মতভাবে প্রক্রিয়াজাত করতে না পারায় দেশে চামড়ার আমদানি বরং বাড়ছে। এদিকে অভ্যন্তরীণভাবে উৎপাদিত বিপুল সংখ্যক চামড়ার ভালো দাম মিলছে না। এটা এমনকি আধাপাকা চামড়া রপ্তানিতেও।
এসব নিয়ে কম আলোচনা হয়নি। কোরবানির ঈদের সময় আলোচনা স্বভাবতই বাড়ে। কিন্তু অভিজ্ঞতা বদলায় না। অভিজ্ঞতা আরও খারাপ হতে দেখা যায়। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের থেমে থাকা রপ্তানি আয়েও পরিস্থিতিটা প্রতিফলিত। আয় এ ক্ষেত্রে এক বিলিয়ন ডলারের আশপাশেই ঘোরাঘুরি করছে। বড় লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করলেও অগ্রগতি নেই। তবে কোরবানির ঈদ ও অন্য সময়ে প্রাপ্ত পশুর চামড়ার বিপুল ব্যবহার হচ্ছে অভ্যন্তরীণ বাজারে। ভৈরবসহ কিছু এলাকায় চামড়াজাত পণ্য উৎপাদন বেগবান হয়েছে। অনেকের কর্মসংস্থান হয়েছে এতে। গোটা চামড়া খাতেই কর্মসংস্থান ও আয় অনেক বাড়তে পারত এটাকে পশ্চিমাদের চাহিদামতো গড়ে তোলা গেলে। এতে আমাদের প্রকৃতি-পরিবেশের কল্যাণও নিহিত। এলডব্লিউজি চামড়া খাতে নিয়োজিতদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায়ও জোর দিচ্ছে।
বর্তমান সরকারকে চলমান অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে আগামী ঈদুল আজহার আগেই সুনির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে চামড়া খাতে। সিইটিপিকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীতকরণের পদক্ষেপ দ্রুত নিতে হবে। ট্যানারিগুলো নিজে থেকে পরিশোধন প্লান্ট প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী হলে তাদের জোগাতে হবে কার্যকর সহায়তা। আন্তর্জাতিক সনদপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিজ্ঞতা থেকেও তারা শিখতে পারে। চামড়া খাতে কাজের নতুন সংস্কৃতিতে যেতে অনিচ্ছুক হলে সংশ্লিষ্ট ট্যানারদের প্রস্থানের পথও করে দিতে হবে। এ খাতে ঋণ ঘিরে ব্যাংকগুলোর সংকটেও মনোযোগ দেওয়া জরুরি। এসব সমস্যা পুষে রেখে কেবল ন্যূনতম দাম নির্ধারণ করে দিলেই কোরবানির চামড়ার বাজার স্বাভাবিক হবে না। অন্য সময়েও চামড়ার লাভজনক দাম পেতে হবে মাংস ব্যবসায়ীদের। চামড়ার দাম না পাওয়ার কারণেও তারা নাকি মাংসের দাম কমাতে পারছে না।
কোরবানির ঈদ বাদে অন্য সময়ে গরু-ছাগলের মাংস পরিভোগ আমাদের খুবই কম। সে জন্য পশু জবাইও কম হয়ে থাকে। কোরবানির সময় তৈরি হওয়া বিপুল চামড়া কেনায় তাই ট্যানারিগুলোর অনাগ্রহ থাকার কথা নয়। তারা আসলে নামমাত্র দামে কিনে ব্যবসা করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। চামড়ার নিম্নমান আর তা প্রক্রিয়াকরণে ব্যয় বৃদ্ধির কথাও তারা বলে থাকে। ট্যানারদেরও বুঝতে হবে, গ্রহণযোগ্য উপায়ে চামড়া প্রক্রিয়াজাত করতে পারলে তারা প্রবেশ করবে এক নতুন দিগন্তে। সেই লক্ষ্য অর্জনে এ খাতের অন্তত অগ্রসর উদ্যোক্তাদের বুদ্ধি-পরামর্শ জোগাতে হবে সরকারকে। দেশে উৎপাদিত চামড়ায় আমাদের এ খাত তো অনেক বেশি গভীরতা অর্জনের কথা।
হাসান মামুন: সাংবাদিক, কলাম লেখক
- বিষয় :
- হাসান মামুন
