ঢাকা মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মত প্রকাশ

বাকস্বাধীনতার সমর্থকরাই এখন বাকস্বাধীনতার বিরুদ্ধে

বাকস্বাধীনতার সমর্থকরাই এখন বাকস্বাধীনতার বিরুদ্ধে
×

মেহদি হাসান

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬ | ০৭:৩৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

‘স্যাটানিক ভার্সাস’ বিতর্কের কথা মনে আছে? ‘জে সুই শার্লি’? ভলতেয়ার ও অরওয়েলের একের পর এক উদ্ধৃতির কথা মনে পড়ে? আমাদের এই যুগের সবচেয়ে বড় পরিহাস হলো, রাজনীতিবিদদের যে দলটি বছরের পর বছর নিজেদের বাকস্বাধীনতার রক্ষক হিসেবে জাহির করেছে, তারাই একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে এর সবচেয়ে কট্টর শত্রুতে পরিণত হয়েছে। ফিলিস্তিনের দিকে তাকিয়ে দেখুন, এর প্রমাণ পাবেন।
কয়েক দশক ধরে পশ্চিমা সরকারগুলো বিশ্বকে উদারনৈতিক মূল্যবোধের জ্ঞান দিয়েছে। তারা মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে একটি উদার গণতান্ত্রিক সমাজের প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে ঘোষণা করেছিল।

প্রতিবাদকে দেশপ্রেমমূলক কাজ হিসেবে গণ্য, আর মতপ্রকাশের অধিকারকে পবিত্র বলে বিবেচনা করা হতো। তারপর এলো গাজার ঘটনা। হঠাৎ যে নীতিগুলোকে একসময় অলঙ্ঘনীয় বলা হতো, সেগুলোই প্রকৃতপক্ষে অত্যন্ত আপসযোগ্য হয়ে উঠল।

ব্রিটেনে আমার জন্ম এবং সেখানে বড় হয়েছি। ব্রিটেন সরকার ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’ নামে প্রত্যক্ষ আন্দোলনকারী দলটিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। কাজটি করা হয়েছিল সংসদে রাজনৈতিক অঙ্গনের সর্বস্তর থেকে আসা ৩৮৫ ভোটের লজ্জাজনক সমর্থনের মধ্য দিয়ে। এর পর থেকে আমরা দেখেছি, যাজক, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে, যাদের হাতে শুধু একটি প্ল্যাকার্ড ছিল। এখানে লেখা ছিল– ‘আমি গণহত্যাবিরোধী; আমি প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে সমর্থন করি’। তারা যুক্তরাজ্যের মদদপুষ্ট গণহত্যার বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস দেখিয়েছে। এটাই তাদের আসল অপরাধ। 

গত সপ্তাহে ব্রিটিশ রাষ্ট্র ফিলিস্তিনপন্থি ব্যক্তিত্বদের বিরুদ্ধে তার দমন অভিযানের অংশ হিসেবে আরও একটি নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিয়েছে। দেশটি মার্কিন ভাষ্যকার চেঙ্ক উইগুর ও হাসান পিকারকে যুক্তরাজ্যে প্রবেশে বাধা দিয়েছে। স্বরাষ্ট্র দপ্তর এর কারণ ব্যাখ্যা না করে শুধু বলেছে, যুক্তরাজ্যে তাদের উপস্থিতি ‘জনস্বার্থের অনুকূল নয়’। দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ‘জানা গেছে, ইহুদি-বিদ্বেষকে আরও উস্কে দিতে পারে এমন উদ্বেগের কারণেই উভয়কে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছে।’

কার্যকলাপ অস্বচ্ছ কিন্তু বার্তা সুস্পষ্ট। এর মানে হলো, এমন কিছু রাজনৈতিক কারণ আছে, যা ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ স্বাগত জানায়। আবার এমন কিছু কারণও আছে, যা নিয়ে তারা খুব শঙ্কিত। বিষয়টি উইগুর বা পাইকারের মতামত নিয়েও নয়। এই দুজনের বলা প্রতিটি কথার সঙ্গে একমত হওয়া অপ্রাসঙ্গিক। উদাহরণস্বরূপ, পাইকার কিছু অর্থোডক্স ইহুদিকে ‘অন্তঃপ্রজননকারী’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। একবার বলেছিলেন, ৯/১১-এর ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্রাপ্য’ ছিল। এই দুটিই আপত্তিকর মন্তব্য, যার জন্য তিনি পরে অনুশোচনা প্রকাশ করেছেন। বাকস্বাধীনতা রক্ষা করা সবচেয়ে জরুরি হয়ে ওঠে যখন সেই বক্তব্য বিতর্কিত হয়। আপনি কেবল নিজের মতামতের পক্ষে কথা বলেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি আপনার সমর্থন দেখাতে পারেন না।

বর্তমানে আমি বসবাস করছি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে; এখানকার ভোটারও। এ দেশের পরিস্থিতি আরও বেশি উদ্বেগজনক। ফিলিস্তিনপন্থি কণ্ঠস্বর এবং বিশেষ করে বিদেশি শিক্ষার্থীদের ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের চালানো দমন-পীড়নকে আধুনিক মার্কিন ইতিহাসে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর গুরুতর আঘাত হিসেবে দেখা উচিত। এমনকি রোনাল্ড রিগ্যান-নিযুক্ত একজন ডানপন্থি বিচারকও ছাত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর এই দমন-পীড়নকে ‘ইহুদিবিদ্বেষের একটি অসাংবিধানিকভাবে ব্যাপক সংজ্ঞার আড়ালে প্রথম সংশোধনীর ওপর সর্বাত্মক আক্রমণ’ বলে নিন্দা করেছেন। মাহমুদ খলিল ও রুমেইসা ওজতুর্কের মতো বিদেশি শিক্ষার্থীরা সহিংস কর্মকাণ্ডের জন্য নয়, বরং তাদের বক্তব্যের জন্য তদন্তের সম্মুখীন, গ্রেপ্তার ও আটক হয়েছেন। ওজতুর্কের ‘অপরাধ’ কী ছিল? তাঁর ছাত্রের এক পত্রিকায় মতামতধর্মী নিবন্ধের সহলেখক হওয়া, যেখানে টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়কে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত সংস্থাগুলো থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়েছিল।

বাকস্বাধীনতার ওপর এই আক্রমণ শুধু অ-নাগরিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বুধবার রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান র‍্যান্ডি ফাইন বলেন, জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিক পাইকারকে ‘আমেরিকায় প্রবেশ করতে দেওয়া উচিত নয়’। তিনি তাঁকে ‘সন্ত্রাসী’ বলে অভিহিত করেন।

এদিকে কংগ্রেস ইসরায়েলের সমালোচনা দমনের উদ্দেশ্যে প্রস্তাব উত্থাপন ও পাস করে চলেছে। বিভিন্ন প্রদেশে ইসরায়েল বয়কটবিরোধী আইন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। ফিলিস্তিনপন্থি বিক্ষোভকারীদের শাস্তি দেওয়ার জন্য রাজনীতিবিদ, দাতা ও লবিং গোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ব্যাপক চাপের মুখে পড়েছে। 

মেহদি হাসান: জেটিওর প্রধান সম্পাদক ও সিইও; দ্য গার্ডিয়ান থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম

আরও পড়ুন

×