ঢাকা মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নতুন বেতন কাঠামো

বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীদের কী হবে

বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীদের কী হবে
×

শেখ নাহিদ নিয়াজী

শেখ নাহিদ নিয়াজী

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩৬ | আপডেট: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১২:৩০

| প্রিন্ট সংস্করণ

বৈষম্যের বিরুদ্ধের চব্বিশের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হলেও দুর্ভাগ্যবশত পুরোনো অর্থনৈতিক বৈষম্য এক চুলও নড়েনি। সরকারি-বেসরকারি চাকরির মধ্যে ব্যাপক ফারাক। সম্প্রতি সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ইতোপূর্বে আমরা দেখেছি, যখন সরকারি চাকরিজীবীদের হঠাৎ বড় অঙ্কের বেতন বৃদ্ধি পায়, তখন জাতীয় অর্থনীতিতে কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করে। এর ফলে সবার জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, বাড়ি ভাড়া এবং পরিষেবা বাবদ খরচও বেড়ে যায়। বেসরকারি খাতের কর্মচারীদের জন্য এটি একটি দ্বৈত সংকট তৈরি করে, যেখানে বাজারের মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃত মজুরি হ্রাস পায়। 

এই অর্থনৈতিক মডেলের মূল অবিচার এর অর্থায়নের পদ্ধতির মধ্যে নিহিত। কারণ নতুন বেতন কাঠামো বস্তুত করদাতাদের টাকারই ভর্তুকিপ্রাপ্ত। লাখ লাখ বেসরকারি খাতের পেশাজীবী, শিক্ষক থেকে করপোরেট অফিসাররা তাদের কষ্টার্জিত আয় থেকে প্রতি মাসে উৎসে দিয়ে থাকেন। তারা নির্ভরযোগ্য এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে জাতীয় কোষাগারে অর্থ প্রদান করেন। অথচ বিনিময়ে সরকারের কাছ থেকে প্রায় কোনো বাস্তব পরিষেবা বা রাষ্ট্রীয় সুবিধা পান না বলেই চলে। জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলা বিপুলসংখ্যক বেসরকারি খাতের কর্মচারীর বিষয়ে সরকার উদাসীন বলেই মনে হয়। ব্যাংকিং খাত ছাড়া বেশির ভাগ বেসরকারি খাতের কর্মীদের কোনো সুনির্দিষ্ট বেতন কাঠামো নেই। অনেক বেসরকারি সংস্থায় ভালো মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি নেই। যে কারণে তাদের কর্মচারীরা ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার জন্য কোনো প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি বা পেনশন পান না। যে কারণে বেসরকারি কর্মী ক্রমাগত আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে জীবনযাপন করেন।

বেসরকারি খাতের সাধারণ করদাতারা অসুস্থ হলে সরকারি হাসপাতাল কিংবা অন্য জায়গায় বিশেষ কোনো সুবিধা বা বিশেষায়িত সেবা পান না। তারা তাদের সন্তানদের ভালো স্কুল-কলেজে ভর্তি করানোর ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ সুবিধা পান না। স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার এই ব্যয়বহুল, বাণিজ্যিকীকৃত বেসরকারি বাজারে সব নিজেদেরই ব্যবস্থা করতে হয়।

বর্তমান কাঠামো ইঙ্গিত দেয়, রাষ্ট্র আমলাতন্ত্রের জন্য একটি ‘বিশেষ ক্লাব’ হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। যখন জননীতি দেশের কৃষি, তৈরি পোশাক, প্রযুক্তি এবং পরিষেবা খাতের চালিকাশক্তি লাখ লাখ মানুষকে উপেক্ষা করে সরকারি কর্মচারীদের ব্যাপকভাবে সুবিধা দেয়, তখন তা আর গণতান্ত্রিক থাকে না। এটি নাগরিকদের একটি বেদনাদায়ক প্রশ্ন করতে বাধ্য করে: দেশটি কি দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্রযন্ত্র দ্বারা পরিচালিত ও শাসিত হতে থাকবে? একটি ন্যায্য ও ন্যায়সংগত সমাজের পরিবর্তে, এই নীতি এমন এক অলিগার্কদের দেশের প্রতিচ্ছবি, যেখানে আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সন্তুষ্ট ও অনুগত রাখার জন্য সম্পদ প্রবাহিত করা হয়। 

একটি সত্যিকারের অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তিমূলক পদ্ধতির জন্য জবাবদিহির রূপরেখা প্রয়োজন। এই সংকট মোকাবিলায় সরকারকে অবশ্যই বেসরকারি খাতের কর্মচারীদের সামাজিক সুরক্ষা এবং অবসর-পরবর্তী সুবিধার জন্য বিশেষভাবে নিবেদিত উল্লেখযোগ্য জাতীয় তহবিল গঠন করতে হবে। এই রাষ্ট্র-সমর্থিত তহবিলটি সর্বজনীন অবদানভিত্তিক ভবিষ্য তহবিল, গ্র্যাচুইটির নিশ্চয়তা অথবা বেসরকারি কর্মীদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি একটি ‘পেনশন প্রকল্প’ সহজতর করতে পারে। এ ধরনের তহবিলে সরকারি অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে সরকার অবশেষে প্রমাণ করবে, এটি তার রাজস্ব সৃষ্টিকারী নাগরিকদের মূল্যায়ন করে। এই তহবিল সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে স্বচ্ছভাবে পরিচালিত হতে পারে, যা নিশ্চিত করবে যে এমনকি মাঝারি ও ছোট আকারের বেসরকারি কোম্পানি বা সংস্থাগুলোও এ উদ্যোগে অংশগ্রহণ করতে এবং তাদের কর্মীদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে পারবে। 

সরকারকে অবশ্যই উপলব্ধি করতে হবে– বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে তীব্র অস্থিরতার সম্মুখীন। রাষ্ট্র যদি তার নিজস্ব শ্রমশক্তিকে মুদ্রাস্ফীতি থেকে রক্ষা করার জন্য হস্তক্ষেপ করতে পারে, তবে রাজস্ব সৃষ্টিকারী বেসরকারি খাতের কর্মীদের সুরক্ষা দেওয়া তার নৈতিক ও অর্থনৈতিক দায়িত্ব। এই প্রাতিষ্ঠানিক অবিচার দূর করতে সরকারকে বেসরকারি খাতের জন্য কাঠামোগত সংস্কার আনতে হবে। প্রথমত, শ্রম মন্ত্রণালয়কে বাধ্যতামূলক করপোরেট সুরক্ষা ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে, যাতে প্রতিটি বেসরকারি কোম্পানি প্রভিডেন্ট ফান্ড এবং গ্র্যাচুইটি প্রদান করে। দ্বিতীয়ত, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) সুস্পষ্ট কর ছাড় চালু করতে হবে, যেমন করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো অথবা মুদ্রাস্ফীতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বেসরকারি কর্মচারীদের জন্য সরাসরি স্বয়ংক্রিয় রিবেট প্রদান করা। পরিশেষে রাষ্ট্রকে কর শনাক্তকরণ নম্বরকে (টিআইএন) জনসেবামূলক সুবিধার সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে, যাতে যাচাইকৃত করদাতারা ভর্তুকিযুক্ত সরকারি স্বাস্থ্যসেবা এবং রাষ্ট্রীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভর্তির সুযোগ পান। 

সকল নাগরিকের জন্য সরকারকে অবশ্যই ভারসাম্য রক্ষায় গতিশীল ও ইতিবাচক পদক্ষেপ নিতে হবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামোর উন্নতি নিশ্চয় প্রয়োজন আছে। কিন্তু তাদের নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণা করলেই যেভাবে বাজারে প্রভাব পড়ে, সেখানেও সরকারের করণীয় আছে। 

শেখ নাহিদ নিয়াজী: সহযোগী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ 
[email protected]

আরও পড়ুন

×