জন্মদিন
এম এন লারমার প্রতিবেশ জাতীয়তাবাদ
ঈশিতা দস্তিদার
প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
আজ ১৫ সেপ্টেম্বর, এম এন লারমার ৮৭তম জন্মদিন। বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের আদিবাসী অধিকার সংগ্রামী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাকে।
এম এন লারমা ছিলেন মূলত একজন পরিবেশ-জাতীয়তাবাদী। যে চিন্তায় তাঁর জনপদের স্বাতন্ত্র্যকে পরিবেশ, প্রাকৃতিক ভূ-সম্পদকেন্দ্রিক চর্চা ও তার গঠন-পুনর্গঠনের সঙ্গে যুক্ত করে ভাবা হয়েছিল। তিনি দেখিয়েছেন, প্রতিবেশ কীভাবে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হতে পারে।
পরিবেশ জাতীয়তাবাদের মূল ধারণা হলো স্বদেশ সংযোগ ও সম্পদের সার্বভৌমত্ব। এ ধরনের জাতীয়তাবাদীরা দেশের মাটি, বন, নদী ও পর্বতকে মাতৃভূমির ভৌত সত্তা হিসেবে গণ্য করেন। এই সত্তা তথা পরিবেশের যত্ন নেওয়া ও তার রক্ষণাবেক্ষণ করাই তখন প্রকৃত দেশপ্রেমের প্রতীক হয়ে ওঠে। দেশপ্রেম সেখানে আমলাতন্ত্রের মাঝে ঠাঁই নেয় না। পরিবেশ জাতীয়তাবাদীরা বরাবরই আত্মনির্ভরশীলতার পক্ষে জোর দেন। তাদের মতে, জাতিগুলোর দরকার বিদেশি আমদানি বা আন্তর্জাতিক সংস্থার ওপর নির্ভর না করে তার নিজস্ব পানি, শক্তি, খনিজ সম্পদ এবং খাদ্য সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার লোকজ পথ খোঁজা।
প্রশ্ন উঠতে পারে, এম এন লারমার এ রকম ভাবনার উৎস কী? পটভূমি কী? আমরা জানি, একটি পরিবেশ বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে এম এন লারমার অভিষেক। ষাট দশকের গোড়ার দিকে, পাকিস্তান সরকার নির্মিত কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প পার্বত্য চট্টগ্রামের ৪০ শতাংশ আবাদি জমি ডুবিয়ে দেয় এবং এক লাখের বেশি জনগোষ্ঠীকে বাস্তুচ্যুত করে। তার চেয়েও বড় ব্যাপার, বাঁধটি স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস করেছিল এবং স্থানীয় প্রাণসম্পদের গঠন ও পুনর্গঠনই ব্যাহত করেছিল। একজন ছাত্রনেতা হিসেবে লারমা এ রকম কৃত্রিম প্রকল্পের বিরুদ্ধে প্রথম বড় ধরনের প্রতিবাদ সংগঠিত করেন এবং বাস্তুচ্যুত জুমিয়া (পাহাড়ি কৃষক) জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের দাবি জানান। একই সঙ্গে তিনি এই দাবির সীমাবদ্ধতাও দেখেন।
এই অভিজ্ঞতা তাঁর উপনিবেশবাদবিরোধী ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকে পরিবেশ সংরক্ষণের সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত করে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর প্রণীত প্রথম সংবিধানে দেশের জাতিগত সংখ্যালঘুদের উপেক্ষা করে একটি একক বাঙালি জাতীয় পরিচয় চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে তিনি বারবার বলেছেন। ১৯৭২ সালে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন, যার মাধ্যমে লারমা জুম্ম জাতীয়তাবাদকে এগিয়ে নিতে চেয়েছেন। কতটা পেরেছেন বা পারেননি, সেটা রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়। কিন্তু তাঁর ভাবনার প্রতিবেশগত মর্মটুকু অন্য সব জাতিসত্তার বোঝা জরুরি।
রাজনৈতিক পরিবেশবিদরা যাকে ‘অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদ’ বলেন, অর্থাৎ পাহাড়ি অঞ্চলের জনতাত্ত্বিক ও পরিবেশগত বাস্তবতা পরিবর্তন করার রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টা, তার তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন লারমা।
১৯৭২ সালের সংবিধান বাংলাদেশকে একটি এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামকে তার ঐতিহাসিক প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন থেকে বঞ্চিত করে। গোষ্ঠীগত ভূমি মালিকানা (মৌজা ব্যবস্থা) সংক্রান্ত স্থানীয় নিয়মকানুন সুরক্ষিত রাখার জন্য লারমা তখন স্বায়ত্তশাসন চেয়েছিলেন। লারমা যুক্তি দিয়েছিলেন, ব্যাপক বসতি স্থাপনের ফলে বন উজাড় হবে এবং পাহাড়ের স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হবে। অর্থাৎ সমস্যা শুধু মানুষে-মানুষে হবে না। প্রাণ-প্রকৃতিগতও হবে।
বহু বছর পর এখন কী দেখছি আমরা? পরিবেশ ভাবনাহীন রাজনীতির কুফল নিশ্চয়ই আমরা টের পাচ্ছি। পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাড়াও সমতলের আদিবাসীরা, বিশেষত উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আদিবাসীরাও পূর্বপুরুষের ভূ-সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ, ভোগ, ব্যবহার, অধিকারে সমস্যার সম্মুখীন। বিভিন্ন ধরনের পূর্বাপর ভাবনাহীন সরকারি-বেসরকারি উন্নয়ন প্রকল্প, পর্যটনকেন্দ্র ভূ-সম্পদের ধ্বংস সাধন করে চলেছে। এতে আদিবাসীদের ভূমি হাতছাড়া হওয়ার খবর পাওয়া যায় নিয়মিত। বংশপরম্পরায় নিয়ন্ত্রণে থাকা ভূমিতে আনুষ্ঠানিক অধিকার না থাকায় তারা সবসময় রাষ্ট্র বা প্রভাবশালী বেসরকারি সংস্থার কাছে ভূ-সম্পদ হারানোর ঝুঁকিতে থাকে। অথচ আইএলও কনভেনশন নম্বর ১০৭ এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার সম্পর্কে জাতিসংঘের ঘোষণাপত্রসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন আইন মানুষের ঐতিহ্যবাহী ভূমি অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু এখানে তার বাস্তবায়ন কই?
এম এন লারমা হয়তো এ রকম কিছু কল্পনা করেই জুম্ম জাতীয়তার রূপকল্প হাজির করেছিলেন। তিনি যে ধারণার পথপ্রদর্শক ছিলেন, সেটা ২০২৬ সালেও সমান প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরে আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে তাদের এই পরিবেশগত জাতীয়তার জায়গা থেকে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া জরুরি এবং তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল বহুল চর্চিত ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ সমাজ ও রাষ্ট্র কল্পনা করা সম্ভব।
ড. ঈশিতা দস্তিদার: নৃবিজ্ঞানী ও লেখক
- বিষয় :
- জন্মদিন