রাজনীতি
ক্ষমতার জৌলুস নয়, মানুষের আস্থা
একেএম শামছুল ইসলাম
একেএম শামছুল ইসলাম
প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩৯ | আপডেট: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:৩৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাজনীতির সবচেয়ে বড় সংকট তখনই তৈরি হয়, যখন শাসক আর শাসিতের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে। ক্ষমতার প্রাসাদ যত উঁচু হয়; মানুষের বাস্তব জীবন থেকে নেতৃত্ব তত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অথচ রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক সত্যটি খুবই সরল– ক্ষমতা মানুষের জন্য; মানুষ ক্ষমতার জন্য নয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গত ছয় মাসের রাজনৈতিক আচরণ ও কিছু সিদ্ধান্তকে এই বাস্তবতার আলোকে দেখলে পরিবর্তনের ধারা চোখে পড়ে। তিনি দাপ্তরিক কাজে নিজের নাম ও পদের আগে ‘মাননীয়’ বা এ ধরনের সম্মানসূচক শব্দের ব্যবহার পরিহার করতে বলেছেন। সেই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় প্রটোকল ও আড়ম্বর কমানো; সরকারি প্রচারণায় ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা এড়ানো; তাঁর ছবি-সংবলিত কোনো ব্যানার ব্যবহার না করা; নিজে গাড়ি চালিয়ে রাজধানীর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা দেখা; সাধারণ মানুষের চলাচল ব্যাহত করে রাস্তা বন্ধ না করা; আহত সেনাসদস্য বা দলীয় কর্মীদের হাসপাতালে দেখতে যাওয়া– এমন ছোট ছোট পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলাদেশের মতো একটি প্রাক-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে পাঁচ দশকের বেশি প্রচলিত ক্ষমতার জৌলুস কমিয়ে আনার বার্তা দিচ্ছেন।
একই বার্তা পাওয়া যায় তাঁর ব্যক্তিগত আচরণের ক্ষেত্রেও। পোশাকের সাধারণত্ব, জনসমক্ষে অনাড়ম্বর উপস্থিতি এবং আচরণে তুলনামূলক সংযমকে কেবল ব্যক্তিগত রুচি হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য অনুধাবন করা যাবে না। প্রধানমন্ত্রী কীভাবে নিজেকে উপস্থাপন করেন, সেটিও ক্ষমতা সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ। তিনি যখন ক্ষমতার চাকচিক্য কমান; নিজেকে বিনয়ের ভঙ্গিতে উপস্থাপন করেন, তখন সাধারণ নাগরিক ও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বও অনেকাংশে কমে যায়।
গত ছয় মাসে সম্ভবত আরও তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে রাজনৈতিক ভাষায়। দেশের রাজনীতি আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ, হুমকি, বিদ্রুপ এবং প্রতিপক্ষকে প্রায় শত্রু হিসেবে উপস্থাপনের ভাষায় অভ্যস্ত। সেই বাস্তবতায় সংসদ কিংবা সংসদের বাইরে বিরোধী পক্ষের অমার্জিত কটাক্ষ, সমালোচনার জবাবে তারেক রহমানের সংযত, শালীন ও গঠনমূলক শব্দচয়ন দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তিনি রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে রাজনৈতিক ভাষাতেই মোকাবিলা করছেন; ব্যক্তিগত আক্রমণাত্মক ভাষায় নয়।
ক্ষমতার শীর্ষে ব্যবহৃত ভাষা ধীরে ধীরে তৃণমূলের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকেও প্রভাবিত করে। নেতা যদি প্রতিপক্ষকে অপমান করেন; মাঠ পর্যায়ের কর্মীরাও সেটিকে রাজনৈতিক আচরণের মডেল হিসবে অনুশীলন করেন। বিপরীতে শীর্ষ নেতৃত্ব যদি সংযত থাকেন; ভিন্নমতকে রাজনৈতিক পরিসরের অংশ হিসেবে গ্রহণ করেন এবং বিরোধীদের উদ্বেগের জবাব শালীনভাবে দেন, তবে দলের তৃণমূলেও একটি ভিন্ন বার্তা যায়। দেশের সংঘাতপ্রবণ রাজনীতিতে তারেক রহমানের ভাষাভঙ্গির প্রভাব ইতোমধ্যে দৃশ্যমান।
ইতিহাসের শিক্ষা অত্যন্ত স্পষ্ট– আড়ম্বর দিয়ে সাময়িক বিস্ময় তৈরি করা যায়, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আস্থা সৃষ্টি করা যায় না। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক ধারার শক্তি ছিল মানুষের কাছে যাওয়া এবং রাষ্ট্র পরিচালনা ও উন্নয়নে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানোর প্রচেষ্টা। শহীদ জিয়া দেশের নানা প্রান্তে ও প্রান্তরে মানুষের কাছে ছুটে গিয়েছেন। নিরন্তর ছিল তাঁর পথচলা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোর মধ্যেও সেই ক্ষমতাকে মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়ার রাজনৈতিক দর্শনের আধুনিক প্রকাশ দেখা যাচ্ছে।
এখানেই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ: রাজনীতি তাহলে কাদের জন্য? এর উত্তরও শুধু বক্তৃতায় নয়; কাজে দিতে হয়। গত ছয় মাসে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল খনন ইত্যাদি উদ্যোগের কেন্দ্রে রয়েছে সরকারকে মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা। প্রশাসনকে আরও কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করা; মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা দ্রুত সমাধানের চেষ্টা ও জনসেবাকে সহজ করা। সরকারের কর্মকাণ্ডকে মানুষের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগগুলো সফল হলে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটতে পারে– রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার দূরত্ব কমে যাওয়া।
মনে রাখা জরুরি– দেশের মানুষ এখন বক্তৃতার চেয়ে ফলাফল চায়। তারা জানতে চায় না– সরকার কী বলছে। তারা দেখতে চায়– সরকার কী করছে। কৃষক সার, কীটনাশক পাচ্ছে কিনা; উৎপাদনের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে কিনা; তরুণরা কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছে কিনা; ব্যবসায়ীরা অপ্রয়োজনীয় হয়রানি ছাড়া কাজ করতে পারছে কিনা; সাধারণ মানুষ নিরাপত্তা ও সরকারি সেবা পাচ্ছে কিনা; মানুষ বিদ্যুৎ, গ্যাস পাচ্ছে কিনা– এসবই শেষ পর্যন্ত সরকারের প্রকৃত কর্মদক্ষতার সূচক।

তারেক রহমানের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও বিনয়ের আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ প্রকাশ হলো সরকারের সীমাবদ্ধতাকে অস্বীকার না করা। ১৬ বছরের বেশি ফ্যাসিবাদী শাসন এবং চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনের প্রেক্ষাপটে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা নিয়েছে। বিপর্যস্ত পরিস্থিতিতে মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী সব ক্ষেত্রে উপযুক্ত সেবা দেওয়া সম্ভব হয়নি। বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকটের আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিতও রয়েছে। দেশের প্রচলিত ক্ষমতার সংস্কৃতিতে সরকার সাধারণত নিজের সাফল্য তুলে ধরে। ব্যর্থতা বা সীমাবদ্ধতা স্বীকারের প্রবণতা বিরল। সেই জায়গায় তারেক রহমান অকপটে প্রকৃত অবস্থা স্বীকার করে বিভিন্নমুখী পদক্ষেপ গ্রহণের কথা সংসদে জানিয়েছেন এবং জনগণের কাছে আরও সময় ও সহযোগিতা চেয়েছেন। এটা কোনো দুর্বলতা নয়; বরং রাজনৈতিক বিনয়ের শক্তিশালী বহিঃপ্রকাশ। বাংলাদেশের মতো ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এটি বিবর্তনের ইঙ্গিত।
তারেক রহমানের সাদামাটা পোশাক, প্রটোকলে সংযম, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি পরিমিত ভাষা কিংবা সরকারের সীমাবদ্ধতা স্বীকার– সবই আলাদা ঘটনা হিসেবে দেখলে সম্ভবত পুরো চিত্রটি অনুধাবন করা মুশকিল। একসঙ্গে দেখলে এগুলো ক্ষমতা সম্পর্কে একটি ভিন্ন রাজনৈতিক ধারণার ইঙ্গিত বহন করে। সুতরাং তারেক রহমানের বিগত ছয় মাসকে প্রচলিত মাপকাঠিতে শুধু নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাস হিসেবে দেখতে গিয়ে এই পরবর্তনগুলো অগ্রাহ্য করা যাবে না।
ইতিহাস কোনো সরকারের গাড়িবহর, প্রটোকল কিংবা ক্ষমতার জৌলুস মনে রাখে না। ইতিহাস মনে রাখে– কে ক্ষমতাকে মানুষের কাছে নিয়ে গিয়েছিল; কে তাদের কণ্ঠ শুনেছিল এবং জনগণের কাছে জবাবদিহি ছিল; কে নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করার সাহস দেখিয়েছিল এবং কে রাষ্ট্রের শক্তিকে নিজের মর্যাদা বাড়ানোর পরিবর্তে মানুষের মর্যাদা বাড়াতে ব্যবহার করেছিল।
তারেক রহমানের গত ছয় মাসের পদক্ষেপগুলো অন্তত একটি সম্ভাবনাকে ইঙ্গিত করে– দেশের রাজনীতি হয়তো ধীরে ধীরে ক্ষমতার জৌলুস থেকে মানুষের আস্থার দিকে, ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা থেকে প্রতিষ্ঠানমুখিতার দিকে এবং কথার রাজনীতি থেকে কাজের রাজনীতির দিকে এগিয়ে যেতে পারে। কারণ ক্ষমতার সবচেয়ে বড় অলংকার কোনো বিশেষণ নয়। ক্ষমতার সবচেয়ে বড় অলংকার হলো মানুষের আস্থা।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ড. একেএম শামছুল ইসলাম, পিএসসি, জি (অব.): প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা
- বিষয় :
- রাজনীতি