ঢাকা মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

উচ্চারণের বিপরীতে

রাজনৈতিক ছলনার ডাকসু পর্ব

রাজনৈতিক ছলনার ডাকসু পর্ব
×

মাহবুব আজীজ

মাহবুব আজীজ

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৪৩ | আপডেট: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:৪৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের রাজনীতির অন্যতম নিয়ামক ভূমিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভূমিকা ও অংশগ্রহণ নিয়মিত। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা প্রধান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। যদিও শিক্ষার্থীদের মধ্যে গণতন্ত্রের অনুশীলনে ডাকসু (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ) নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক সরকারকেই বিশেষ আগ্রহী হতে দেখা যায়নি। 

সর্বশেষ ডাকসু নির্বাচন হয়েছিল ২০২৫ সালে অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে। তার আগেরটি ছয় বছর আগে, ২০১৯ সালে। আর তারও ২৯ বছর আগে ১৯৯০ সালে ডাকসু নির্বাচন হয়েছিল।

সর্বশেষ ডাকসু নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ অধিকাংশ পদে জয়ী হয়। সেই ডাকসুর মেয়াদ শেষ হলো গতকাল ১৪ সেপ্টেম্বর। নির্বাচন না হলে এই মেয়াদ আরও তিন মাস বাড়বে; ওই সময়ের মধ্যে নির্বাচন না হলে ছাত্র সংসদ বিলুপ্ত হবে। 

বিভিন্ন হলের দখল নিয়ে ক্ষমতাসীনদের মধ্যেই উপদলীয় সংঘর্ষের ঘটনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত হলেও বর্তমান ডাকসুর মেয়াদকালে এটি দেখা যায়নি। ক্লাস ও পরীক্ষার ক্ষেত্রে বিঘ্ন ঘটেনি। অবশ্য ডাকসুর পাশাপাশি জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ভূমিকারও প্রশংসা করতে হবে। ক্ষমতাসীন বিএনপির এই ছাত্র সংগঠন গত এক বছরে কোনো হল দখলের চেষ্টা করেনি। তবে ছাত্রশিবির তাদের মূল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি– শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট, খাদ্যমান, ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পায়নি। এই সময়ে ক্যাম্পাসে বরং মব সন্ত্রাস বেড়েছে। 

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের ১৫ বছর আগে থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের একক আধিপত্য ছিল; ছাত্রশিবির রাজনীতি করতে পারত না; ছাত্রদল হলগুলো থেকে বিতাড়িত ছিল। কিন্তু শিবিরের বিপুল নেতাকর্মী আত্মপরিচয় লুকিয়ে ‘ছাত্রলীগ’ হয়ে বা ছাত্রলীগের ছত্রছায়ায় থেকে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনের আড়ালে বছরের পর বছর নিজেদের সংগঠিত করছিলেন। 

জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে সম্মিলিত শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধে ‘প্রকৃত’ ছাত্রলীগ নেতাকর্মী হল থেকে পালায়; ছাত্রলীগ পরিচয়ে কিংবা ছত্রছায়ায় হলে থাকা শিবির নেতাকর্মী থেকে যায় বহাল তবিয়তে। অভ্যুত্থানের পরপর ছাত্রদল সংগঠন গুছিয়ে তুলতে না পারলেও ছাত্রশিবিরের সেই অসুবিধা হয়নি। ক্যাম্পাসে শিবিরের রাজনীতি প্রবল হয়ে ওঠে; ডাকসু নির্বাচনে তার প্রতিফলনও মেলে। ছাত্রদলসহ বাম ছাত্র সংগঠনের অভিযোগ– সে সময় পর্যবেক্ষণ দল বা পরিবেশ টিম গঠনের মাধ্যমে শিবিরের নেতাকর্মী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনেও প্রভাব বিস্তার করে।

২০২৫ সালের আগস্ট মাসে ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করলে ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’র ব্যানারে আন্দোলনের প্রেক্ষিতে হলে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ রাখার সিদ্ধান্ত বহাল থাকে। ছাত্রদলের অভিযোগ, তারা যাতে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাতে না পারে, সে জন্যই শিবিরকর্মীরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের নামে এই তৎপরতা চালায়। লেজুড়বৃত্তির ছাত্র রাজনীতির বিরোধিতা করে ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েমসহ শিবিরের নেতৃবৃন্দ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর প্রচারণায় অংশ নেন। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সাদিক কায়েম জামায়াতের প্রার্থী হচ্ছেন। তাহলে কোন যুক্তিতে শিবির লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতির বিরোধিতা করে; বোধগম্য নয়।

২.
গত এক বছরে ডাকসু নেতারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা বা বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষ অর্জনে শিক্ষার্থীবান্ধব উদ্যোগ আয়োজনের বদলে এমন কিছু তৎপরতার সঙ্গে জড়িয়েছেন, যা ছাত্র প্রতিনিধিদের কাজ কিনা– বিতর্ক রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে উচ্ছেদ অভিযানের নামে ক্ষমতা দেখানো, মাঠে খেলতে আসা শিশুদের হেনস্তা, হিজড়াদের সঙ্গে বিতণ্ডাসহ দিনকয়েক আগে শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য ওয়েবসাইট তৈরি করে সমালোচিত হয়েছেন ডাকসুর শিবির নেতারা। 

১০ সেপ্টেম্বর ডাকসু শিক্ষকদের মূল্যায়নের ওয়েবসাইটের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করে। সেখানে শিক্ষার্থীদের ‘শিক্ষক মূল্যায়ন’ ফলাফল সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং বহু শিক্ষক সামাজিক হেনস্তার শিকার হন। ডাকসু এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে এভাবে শিক্ষকদের মূল্যায়নের ভার নিতে পারে কিনা– এটি যেমন প্রশ্ন; একইভাবে এর সঙ্গে গোপনীয়তা ও শিক্ষকের সম্মানের প্রসঙ্গও জড়িত। শিক্ষকের মান ও যোগ্যতা মূল্যায়নের একাডেমিক ব্যবস্থা থাকতে পারে, থাকাও উচিত। তবে সেটির ভার ছাত্র প্রতিনিধিরা নিয়ে নেন কোন যুক্তিতে? ছাত্র রাজনীতিতে সুবিধা নেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষক রাজনীতিতেও কাউকে কাউকে সুবিধা দিতে?

৩.
ডাকসু বা শিবির নেতাদের পক্ষ থেকে ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টাও দৃশ্যমান; বিশেষত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অস্বীকার করে বিকৃত ইতিহাস সামনে নিয়ে আসার অপপ্রয়াস। গতবছর ৫ আগস্ট টিএসসিতে ‘৩৬ জুলাই: আমরা থামব না’ শীর্ষক কর্মসূচিতে শিবির দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীদের জাতীয় বীর আখ্যা দিয়ে আলোকচিত্র প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করে। শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের মুখে প্রদর্শনী থেকে যুদ্ধাপরাধীদের ছবি অবশ্য সরাতে বাধ্য হন তারা (প্রথম আলো, ৬ আগস্ট, ২০২৫)।

এদিকে সংস্কার শেষে সম্প্রতি চালু হয় ডাকসু সংগ্রহশালা। এতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রধান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একক বা গৌরবোজ্জ্বল ছবি সরিয়ে যুক্ত করা হয় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি (বিডিনিউজ, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬)। 

১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান ও পরবর্তী ডাকসু নির্বাচন, ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদির হত্যার আগে-পরের স্থিরচিত্র সংগ্রহশালায় ঠাঁই পেয়েছে। এতে জিন্নাহর তিনটি ছবি রাখা হয়। এর মধ্যে একটি ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে তিনি ঘোষণা করছেন– ‘কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।’

কিন্তু সংগ্রহশালায় ষাট দশকের বাঙালি রেনেসাঁর কোনো উল্লেখ নেই। ছয় দফা নেই; আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নেই; সত্তরের নির্বাচন নেই; ৭ মার্চের ভাষণ নেই, যেখানে বঙ্গবন্ধু ঐন্দ্রজালিক আহ্বান জানাচ্ছেন– ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম; এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। বঙ্গবন্ধুর একক বা গুরুত্বপূর্ণ ছবি সংগ্রহশালায় না রাখলেও ১৯৭৪ সালে তাঁর দুই ছেলের বিয়ের ছবির পেপার কাটিং রয়েছে। এ নিয়ে ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণআন্দোলনবিষয়ক সম্পাদক তাসনিম জুমা বলেছেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ফ্যাসিবাদের সব আইকনের ছবি এখান থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। আর ৭২-৭৫ সালের অংশে তাঁর ছবি আছে।’ কিন্তু ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ অংশে কেন নেই– এ প্রশ্নে জুমা বলেন, ‘ইচ্ছা হয়নি, তাই রাখিনি।’

মুক্তিযুদ্ধের রক্তস্নাত ইতিহাস ডাকসু ও শিবির নেতাকর্মীর ইচ্ছাস্বাধীন সিদ্ধান্তের বিষয়? অবশ্য ছাত্রদলসহ বাম ছাত্র সংগঠনগুলো জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের তীব্র বিরোধিতা করে শিবিরের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ এনেছে। প্রতিবাদী একজন নিজ উদ্যোগে সংগ্রহশালায় ঢুকে জিন্নাহর ছবি ছিঁড়েও ফেলেছেন! ইতিহাস বিকৃতির এ ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক চেষ্টাকে অপ্রাসঙ্গিক মনে করবার কারণ নেই। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে সব দল-মতের মানুষের অকুতোভয় মিছিলে আমরা স্লোগান শুনেছি– ‘বঙ্গবন্ধুর বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই।’ কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের পর ডাকসু সংগ্রহশালায় বঙ্গবন্ধুর আলোকচিত্র সরিয়ে জিন্নাহর প্রতিকৃতি স্থাপন! এই রাজনৈতিক ছলনা দেশ, ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যয়ের বিরোধী। প্রগতিশীল অপরাপর রাজনৈতিক শক্তিকে এই অপরাজনীতিকে মোকাবিলা করে প্রকৃত সত্যে উদ্ভাসিত করতে হবে আগামী প্রজন্মকে। এর কোনো বিকল্প নেই। 

মাহবুব আজীজ: উপসম্পাদক, সমকাল; সাহিত্যিক
[email protected]

আরও পড়ুন

×