ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬

তাৎক্ষণিক

বাজেটে স্বস্তি ও চ্যালেঞ্জের দ্বৈত বার্তা

বাজেটে স্বস্তি ও চ্যালেঞ্জের দ্বৈত বার্তা
×

বাজেটের প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর

ইফতেখারুল ইসলাম 

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬ | ২০:০০

নতুন অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবে অর্থমন্ত্রী বিভিন্ন পণ্যের ওপর উৎসে করের হার কমানোর যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু প্রশ্নটা যতটা প্রস্তাবের, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাস্তবায়নের। এই প্রস্তাবগুলো রাজনৈতিক ইশতেহারের মতো কেবল কি প্রতিশ্রুতি আকারে রয়ে যাবে নাকি এর সুফল সাধারণ নাগরিকরা পাবে– শেষোক্তটাই আমাদের সবার প্রত্যাশা।

বাজেট অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী বিশেষ করে চাল, গম, আলু, গবাদি পশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল ও বীজের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে উৎসে করের হার ৫, ২ ও ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০.৫ শতাংশ করার প্রস্তাব রেখেছেন। দৈনিক সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ পেয়েছে। যদি সরকার এই উদ্যোগ সত্যিই নিতে পারে, তাহলে বাজারে নিঃসন্দেহে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে কর কমানোর সুফল ভোক্তাদের কাছে কতটা পৌঁছাবে, তা নির্ভর করবে বাজার ব্যবস্থাপনা ও তদারকির ওপর।

বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় খাদ্য মূল্যস্ফীতি এখনও সাধারণ মানুষের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর মাসিক ব্যয়ের বড় অংশই খাদ্যপণ্যে ব্যয় হয়। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিপণ্যের ওপর করের বোঝা কমানো উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করবে বলে আশা করা যায়। কৃষক, খামারি ও ব্যবসায়ীরা যদি এই সুবিধার প্রতিফলন বাজারমূল্যে দেখান, তাহলে ভোক্তারা কিছুটা স্বস্তি পাবেন। এতে সরকারের ব্যাপারেও সাধারণ মানুষের একটা ইতিবাচক মনোভাব গড়ে উঠবে।

একই সঙ্গে শিশুখাদ্য, জিরা, দারুচিনি, স্বর্ণ, বৈদ্যুতিক গাড়ি, ল্যাপটপ ও কম্পিউটার, কিডনি ডায়ালাইসিস সেবা, ওষুধ এবং বাদ্যযন্ত্রের দাম কমার সম্ভাবনাও উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে শিশুখাদ্য ও ওষুধের মূল্য হ্রাস জনস্বাস্থ্যের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে। স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় যখন ক্রমাগত বাড়ছে, তখন কিডনি ডায়ালাইসিস সেবার খরচ কমার সম্ভাবনা অসংখ্য রোগীর জন্য স্বস্তির কারণ হতে পারে; তবে সরকার এসব প্রস্তাব কতটা বাস্তবায়ন করতে পারবে তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। অন্যদিকে ল্যাপটপ ও কম্পিউটারের দাম কমলে ডিজিটাল শিক্ষা ও প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানে নতুন গতি আসতে পারে।

বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর কর-সুবিধা পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করার একটি দূরদর্শী পদক্ষেপ। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশ হিসেবে বাংলাদেশে পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো সময়ের দাবি। তাই এ খাতে করছাড় ভবিষ্যৎমুখী সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

তবে বাজেট প্রস্তাবের অন্য দিকটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বাইসাইকেল, সিগারেট, তেলচালিত আমদানি গাড়ি, ট্রান্সফরমার, বিদেশি ওয়াশিং মেশিন, রড, বিদেশি খাদ্যপণ্য, কাজুবাদাম, মধু ও গ্যাস সিলিন্ডারের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর মধ্যে সিগারেটের মূল্যবৃদ্ধি জনস্বাস্থ্য রক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিবাচক হলেও রড ও ট্রান্সফরমারের দাম বৃদ্ধি নির্মাণ ও শিল্প খাতে ব্যয় বাড়াতে পারে। ফলে আবাসন ও অবকাঠামো উন্নয়নের খরচও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাইসাইকেলের দাম বাড়ার বিষয়টি কিছুটা প্রশ্নের জন্ম দেয়। পরিবেশবান্ধব ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবহন হিসেবে বাইসাইকেলের ব্যবহার উৎসাহিত করার পরিবর্তে এর ব্যয় বৃদ্ধি নগর পরিবহন নীতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হয় না। একইভাবে বিদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক বা কর বৃদ্ধি স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে সহায়ক হলেও বাজারে প্রতিযোগিতা কমে গেলে ভোক্তাদের জন্য পণ্যের দাম বাড়তে পারে।

সর্বোপরি, এবারের বাজেট প্রস্তাবে একদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও জনকল্যাণমূলক খাতে কর-সুবিধা দিয়ে জনগণকে স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, অন্যদিকে কিছু খাতে কর বৃদ্ধি করে রাজস্ব আহরণ ও দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষার লক্ষ্যও দেখা যায়। কিন্তু বাজেটের প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। কর কমানোর সুবিধা যদি মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে আটকে যায় এবং বাজারে মূল্য কমে না, তাহলে সাধারণ মানুষ প্রত্যাশিত সুফল পাবে না। তাই কর-সমন্বয়ের পাশাপাশি বাজার তদারকি, প্রতিযোগিতা নিশ্চিতকরণ এবং ভোক্তা সুরক্ষার ব্যবস্থা জোরদার করাই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বাজেটের ঘোষণার চেয়ে তার বাস্তব প্রতিফলনই শেষ পর্যন্ত জনগণের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ইফতেখারুল ইসলাম: সহসম্পাদক, সমকাল  
 

আরও পড়ুন

×