ইউনিয়নের নামকরণ কিংবা আধুনিক জমিদারি
সাইফুর রহমান তপন
সাইফুর রহমান তপন
প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬ | ১৮:৫৩
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের নির্বাচনী এলাকার (বগুড়া-২ আসন) নবগঠিত তিনটি ইউনিয়নের নামকরণ নিয়ে একটি বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ওই তিনটি ইউনিয়নের নাম হলো ‘মীরবাড়ী’, ‘সীমান্ত’ ও ‘দিগন্ত’। অভিযোগ উঠেছে, মীরবাড়ীর নামকরণ হয়েছে প্রতিমন্ত্রীর বংশ পদবি ‘মীর’-এর সঙ্গে মিলিয়ে; আর ‘সীমান্ত’ ও ‘দিগন্ত’ তাঁর দুই ছেলের নাম। স্থানীয় বিএনপি নেতা এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে মঙ্গলবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সমকালও এ অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে।
প্রসঙ্গত, সম্প্রতি বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলা ভেঙে মোকামতলা নামে নতুন একটি উপজেলা গঠন করা হয়েছে। এ দুই উপজেলায় আবার গঠিত হয়েছে নতুন চারটি ইউনিয়ন, উল্লিখিত তিনটি ইউনিয়ন যার অন্তর্ভুক্ত।
প্রতিমন্ত্রী অবশ্য এসব অভিযোগ নাকচ করে ওই নামকরণে তাঁর পরিবারের সংশ্লিষ্টতাকে ‘অলৌকিক’ বলেছেন। এ বিষয়ে জাতীয় সংসদে সোমবার বিরোধীদলীয় এক সদস্য প্রশ্ন তুললে মীর শাহে আলম বেশ রসিয়ে রসিয়ে এর উত্তর দেন। তিনি বলেছেন, “অলৌকিকভাবে আমার সন্তানদের নাম ইউনিয়ন পরিষদের নামের সঙ্গে মিলে গেছে ঠিকই, কিন্তু আমার সন্তানদের নাম হচ্ছে– মীর সীমান্ত, মীর দিগন্ত। আমার যদি ইচ্ছা থাকত, তাহলে জেলা প্রশাসককে বলতাম ‘নাম রাখেন মীর সীমান্ত, না হলে মীর দিগন্ত’। কিন্তু নামের আগে তো মীর নেই।” মোক্ষম যুক্তি বটে!
কিন্তু গোল বাধিয়েছে সমকালের ওই প্রতিবেদন; সেখানে বলা হয়েছে, গত ৩ জুন শিবগঞ্জ উপজেলার এক সভায় বিএনপির এক নেতা ইউনিয়নগুলোর নামকরণের বিষয়ে প্রস্তাব করলে সভায় সর্বসম্মতিক্রমে তা গৃহীত হয়। পরে উপজেলা প্রশাসন থেকে নামগুলো লিখিত প্রস্তাব আকারে জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়। জেলা প্রশাসক ১১ জুন মীরবাড়ী ইউনিয়ন এবং ১৪ জুন সীমান্ত ইউনিয়ন ও দিগন্ত ইউনিয়ন নামে গেজেট জারি করেন।
তবে প্রতিমন্ত্রী এত সহজে যাওয়ার পাত্র নন। দলীয় এমপিদের টেবিল চাপড়ানো সমর্থনের মধ্যে তিনি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দিগন্ত ও সীমান্ত নামের এলাকা স্থাপনার তালিকা তুলে ধরেন সংসদে। তারই অংশ হিসেবে বলেন, ‘আল্লাহ বাঁচাইছে যে মাননীয় সংসদ সদস্য যে বলেননি বিজিবির সীমান্ত ব্যাংক লিমিটেড, ওটা আমার ব্যাংক। তিনি যে দয়া করে বলেননি, খুলনা থেকে পার্বতীপুরে যে ট্রেন যায় সীমান্ত এক্সপ্রেস, সেটিও আমার ট্রেন। তিনি যে দয়া করে বলেননি, গুলশান ১-এ যে দিগন্ত টাওয়ার রয়েছে, সেটিও আমার।’
কে বলতে পারে, একদিন সত্যি সত্যিই রাষ্ট্রীয় কোনও ব্যাংক বা ভবন মীর শাহে আলমের হবে না? আইনগতভাবে তো বাংলাদেশের সব নদনদীর মালিক বাংলাদেশ সরকার। তা বলে কি হবিগঞ্জের সুতাং ও শুটকী নদীর মতো কিছু নদীর মালিকানা দাবি করা থেকে স্থানীয় প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তিকে বিরত রাখা গেছে? আগ্রহীরা চাইলে ২০২৩ সালে ২৩ সেপ্টেম্বর সমকালে প্রকাশিত এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনটি পড়ে নিতে পারেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর টেলিভিশন চ্যানেলসহ অনেক প্রতিষ্ঠানের মালিকানা রাতারাতি পরিবর্তন হতে কি আমরা দেখিনি?
আসলে মীর শাহে আলমকে পরিবারের সদস্যদের নামে এলাকার নামকরণ চাইতে হবে কেন, তাঁর শিষ্য-সাবুদেরা আছেন না? ওই যে, রবি ঠাকুরের ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতায় আছে না, ‘বাবু যত বলে পারিষদ-দলে বলে তার শতগুণ।’ প্রতিমন্ত্রী কীসে খুশি হবেন, তা তাঁর ‘পারিষদ-দল’-এর চেয়ে কে ভালো জানে? এদিক থেকে মীর শাহে আলমকে বেনিফিট অব ডাউট দেওয়াই যায়।
কিন্তু তিনি কি প্রিয় শিষ্যদের এ ‘উপহার’ ফিরিয়ে দিয়েছেন? তা তো করেননি। বরং ওই বিতর্কিত সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন।
এটারও অবশ্য ব্যাখ্যা আছে। মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত যতই লিখুন, ‘জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে?’ মানুষ আসলে অমরত্বই চায়। দৈহিকভাবে সম্ভব না হলেও মানুষ অন্তত নিজের নামটা বাঁচিয়ে রাখতে চায়। ইতিহাসে তার ভূরি ভূরি প্রমাণ আছে। যেমন ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজ, বরিশালের ব্রজমোহন কলেজ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতাদের– তারা শত বছর আগে দেহ রাখলেও– জনমনে বাঁচিয়ে রেখেছে। তো স্থানীয় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমেরও ‘অমরত্বের প্রত্যাশা’ অস্বাভাবিক কিছু নয়।
সমস্যা হলো, এ রীতিমতো পরের ধনে পোদ্দারি। নির্দিষ্ট পরিমাণ জমি দান করে সে জমিতে প্রতিষ্ঠিত কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম যে কেউ নিজের বা পরিবারের কারও নামে রাখতে পারে, এমন বিধান প্রচলিত আইনেই আছে। এমনকি মীর বংশের ‘ঐতিহ্য’ তুলে ধরতে প্রতিমন্ত্রী মহোদয় কোনো একটা এলাকা কিনে সেখানে ইচ্ছেমতো স্থাপনাও তৈরি করতে পারেন। কিন্তু আলোচ্য ক্ষেত্রে নিছক ক্ষমতার জোরে তিনি তিন তিনটি ইউনিয়নে নিজের পরিবারের নাম বসিয়ে দিতে চেয়েছেন।
এখানে প্রচলিত আইনেরও লঙ্ঘন ঘটেছে। ইউনিয়ন পরিষদ আইন ২০০৯-এর ১১(১) ধারা অনুযায়ী, জেলা প্রশাসক সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপনে কয়েকটি গ্রাম বা সংলগ্ন মৌজা বা গ্রামের সমন্বয়ে একটি ওয়ার্ড এবং ৯টি ওয়ার্ডের সমন্বয়ে একটি ইউনিয়ন ঘোষণা করতে পারেন। নবগঠিত ইউনিয়নের নাম নির্ধারণ করবেন জেলা প্রশাসক। তবে কোনো ব্যক্তির নামে ইউনিয়নের নামকরণ করা যাবে না।
আগের দিনে অনেক রাজা বা জমিদারকে এমনটা করতে দেখা যেত। জনগণের অর্থে গড়া প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করতেন তারা নিজের বা পরিবারের সদস্যদের নামে। কিন্তু সে যুগ বহু আগেই হয়েছে বাসি, সামন্তপ্রভুর শাসনের জায়গায় এসেছে জনগণের শাসন– যাকে বলা হয় গণতন্ত্র। গণতন্ত্রে জমিদারি চলন চলে না।
প্রতিমন্ত্রীর শাহে আলমের বংশের কেউ অতীতে জমিদার ছিলেন কিনা জানি না; তবে এটা নিশ্চিত তিনি লব্ধপ্রতিষ্ঠ ব্যবসায়ী; নির্বাচন কমিশনে দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী ১২টি প্রতিষ্ঠানের মালিক। ছেলেকে পড়িয়েছেন সেই বিলেতে, যেখানে পড়ালেখা শেষ করে স্বদেশে ফিরে এসে এ দেশের অনেকেই শত বছর আগে আধুনিকতার আলো ছড়াতেন। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি একটা গণতান্ত্রিক দলের নেতা, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের প্রতিমন্ত্রী। তাকে কি এমন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়ানো মানায়?
সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক, সমকাল
- বিষয় :
- সাইফুর রহমান তপন
