রপ্তানি খাত
প্রতিযোগিতা সক্ষমতা অর্জনের এখনই সময়
খাজা মাঈন উদ্দিন
খাজা মাঈন উদ্দিন
প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬ | ০৭:৩৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
পণ্যটি তৈরি গাজীপুরের এক কারখানায়; পশ্চিমা বিশ্বের কোনো খুচরা দোকানে এমন একটি পোশাকের বিক্রয়মূল্য বেড়ে দাঁড়াচ্ছে রপ্তানিমূল্যের ৩-৪ গুণ। এটিও মার্কিন ‘ফাস্ট ফ্যাশন’ ক্রেতাদের কাছে রীতিমতো সস্তা। এই সরবরাহ ব্যবস্থা না থাকলে তাদের একই মানের স্থানীয় ব্র্যান্ডের একটি শার্ট কিনতে ব্যয় করতে হতো ৪-৫ গুণ ডলার দিয়ে।
সাবেক থাই প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রা একবার ঢাকায় বলেছিলেন, পশ্চিমা ভোগ ব্যবস্থা চলছে এশিয়ার মানুষের ভর্তুকিতে। পশ্চিমারা উপকৃত হয় এশীয় শ্রমশক্তির কষ্টের বিনিময়ে; যে কষ্ট তারা হজম করে পাশ্চাত্যের বাজারে তথাকথিত প্রতিযোগিতা সক্ষম দাম উপহার দিতে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সেই উপকারভোগীর বাইরে নন। অথচ মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি (ইউএসটিআর) সম্প্রতি বাংলাদেশসহ ৬০টি অর্থনীতিতে ‘ফোর্সড লেবার’ বা জিম্মি শ্রম আছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাই তাঁর প্রস্তাব: বাংলাদেশের পণ্য, বিশেষত তৈরি পোশাকের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হোক।
সাশ্রয়ী মূল্যে ভোগ্যপণ্য পেতে তারা সীমানা পেরিয়ে পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার সুবিধা নিয়েছেন। আর এখন বলছেন, সেই ব্যবস্থা শোষণমূলক! ন্যায্যতার বিচার করলে মার্কিন ক্রেতাদের উচিত বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা পোশাকের জন্য অনেক বেশি বা ন্যায্যমূল্য পরিশোধ করা। শর্ত জুড়ে দিতে পারতেন যেন রপ্তানি আয়ের উদ্বৃত্ত মূল্যের নির্দিষ্ট অংশ শ্রমিকদের মধ্যে বণ্টন করা হয়।
ইউএসটিআর দপ্তর যে আইন (ট্রেড অ্যাক্ট, সেকশন ৩০১) মোতাবেক জিম্মি শ্রমের অভিযোগ এনেছে, সেখানে বলা হয়েছে বিদেশি বাণিজ্য যদি ‘অযৌক্তিক, অন্যায্য বা বৈষম্যমূলক’ হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের ওপর বোঝা সৃষ্টি করে, তবে তার বিরুদ্ধে তদন্ত করা ও প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
নীতিবাদীরা প্রশ্ন করতে পারেন, ইউএসটিআর-প্রস্তাবিত অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর এবং সে অনুযায়ী বাণিজ্য পরিচালিত হলে কি এই শাস্তিমূলক শুল্ক এশিয়ার হাজারো কারখানায় অভিযুক্ত জিম্মি শ্রম ‘জায়েজ’ করে দেবে?
নতুন এই হার বাস্তবায়িত হলে বরং বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্যের ওপর মোট শুল্কহার হয়ে পড়বে ২৯ শতাংশ। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরে ক্ষতির মুখে পড়বে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের খাত তৈরি পোশাকশিল্প।
এর আগে ২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশের ওপর ৩৭ শতাংশ ‘রেসিপ্রোক্যাল’ বা পারস্পরিক বা প্রতিদানমূলক শুল্ক আরোপ করেছিল। অন্তর্বর্তী সরকার আলোচনার মাধ্যমে, কিছু শর্ত মেনে, তা ২০ শতাংশে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়।
সস্তা পণ্য বিক্রি করা বাংলাদেশের পক্ষে ঝুঁকে থাকা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে ভারসাম্য আনতে ট্রাম্পের চাপের মুখে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স মার্কিন জায়ান্ট বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার জন্য ৩.৭ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা ও ওয়াশিংটন ডিসি পারস্পরিক শুল্কবিষয়ক চুক্তি ‘এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোক্যাল ট্যারিফস’ বা ‘আর্ট’ স্বাক্ষর করে। এই চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র শর্তসাপেক্ষে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর আরোপিত শুল্ক ১৯ শতাংশ ধার্য করে। অন্যদিকে মার্কিন কৃষিপণ্য, বিশেষত পোলট্রি খাতের কিছু সংবেদনশীল ও এখনও প্রতিযোগিতা-অক্ষম পণ্যের জন্য অগ্রাধিকারমূলক বাজার প্রবেশ সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় বাংলাদেশ।
চুক্তির প্রতি সম্মান দেখাতেই হয়তো সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে শুল্ক হ্রাসের প্রস্তাব করেছে। দেশের রপ্তানি পণ্য প্রধানত তৈরি পোশাকের একক বৃহত্তম গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র এবং এর বর্তমান রপ্তানি মূল্যমান প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার। সেই দেশই এখন অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপের সতর্ক বার্তা দিয়েছে। এর ওপর গণশুনানি হওয়ার কথা আগামী ৭ জুলাই।
এটাই কি তাহলে ট্রাম্পীয় প্রতিদানের নমুনা? নাকি ভূ-রাজনৈতিক চিন্তা থেকে নব্য সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রটি ক্ষুদ্র শক্তিগুলোকে জাতীয় স্বার্থের বিষয়ে ছাড় দিতে বাধ্য করতে চায়? সাম্রাজ্যবাদী নীতি অনুসরণের কারণে অতীতের বৃহৎ শক্তিগুলোর পতনের ইতিহাস হয়তো ব্যবসামনস্ক ট্রাম্প আমলে নেননি।
কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, ‘আর্ট’ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রথম বড় চুক্তি হলেও যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য বাংলাদেশি শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করলে ঢাকা পাল্টা প্রতিসাম্য শুল্ক আরোপ করতে পারবে না। অবশ্য তাত্ত্বিকভাবে ঢাকা এ ধরনের যে কোনো চুক্তি থেকেই বেরিয়ে আসতে পারে। কিন্তু বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ‘পারস্পরিক’ চুক্তিগুলোর ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসন রাজনৈতিক আধিপত্য ব্যবহার করেছে। এই বাস্তবতার ধারণা কমবেশি প্রভাবিত করে বাংলাদেশের ব্যবসায়ী, কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের মনোজগৎ।
বাংলাদেশের নিজস্ব সমস্যার মধ্যে রয়েছে সংকীর্ণ রপ্তানি পণ্যভিত্তি। তাতেও আবার ৮০ শতাংশের বেশি অবদান তৈরি পোশাক খাতের এবং মার্কিন বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা। এ ছাড়া এমন অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা রপ্তানিকারক ও সরকার উভয়েরই দর কষাকষির সক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়।
তবে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ অনেক বেশি খোলা মন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কিংবা অন্য যে কোনো অংশীদারের সঙ্গে আলোচনায় যোগ দিতে পারে। লক্ষ্য বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক শর্তে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ। দেশের ভেতরেও সম্ভাবনাময় খাতে উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা প্রদান, অবকাঠামোগত ও নিয়ন্ত্রক দুর্বলতা দূরীকরণের সুযোগ রয়েছে। সরকারের উচিত আন্তর্জাতিক আইনি, মানবিক ও পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণ করে এইবার সত্যিকারের রপ্তানি বহুমুখীকরণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া।
যেসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে, সেখানে উন্নতি করতে হবে নিজস্ব উদ্যোগে; বাইরের চাপিয়ে দেওয়া ব্যবস্থার ভয়ে নয়, যাতে আন্তর্জাতিক পরিসরে দেশের মাথা উঁচু থাকে। বৈশ্বিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে বাণিজ্যে অংশগ্রহণের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক ভিতকে শক্তিশালীকরণ এবং পণ্যের প্রকৃত ও ন্যায্য প্রতিযোগিতা সক্ষমতা অর্জনের এখনই সময়।
খাজা মাঈন উদ্দিন: সাংবাদিক ও বিশ্লেষক
[email protected].
- বিষয় :
- খাজা মাঈন উদ্দিন
