ভূরাজনীতি
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর পররাষ্ট্রনীতিতে কতটা শক্তি জোগাল
আলতাফ পারভেজ
আলতাফ পারভেজ
প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬ | ০৭:৩৬ | আপডেট: ২৮ জুন ২০২৬ | ০৭:৩৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
চীন ও ভারতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সফর বরাবরই দক্ষিণ এশিয়ায় বিশেষ মনোযোগ কাড়ে। উভয় সফর কূটনীতিক চৌহদ্দির বাইরে রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়েও হাজির হয় বাংলাদেশে। সফর ঘিরে ব্যাপক প্রত্যাশা তৈরি হয়; সফর শেষে শুরু হয় চাওয়া-পাওয়ার হিসাব মেলানো। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের আগে-পরেও ঠিক তাই হচ্ছে। অনুসন্ধান চলছে– এই সফর থেকে বাংলাদেশ কী পেতে চলেছে। প্রধানমন্ত্রী হয়তো শিগগির ভারতও যাবেন। সম্ভাব্য সেই সফরের সঙ্গেও চীন সফরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনগুলো মিলিয়ে দেখা শুরু হবে। অতীতে আমরা সে রকম দেখেছি।
বাংলাদেশের যে কোনো প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর থেকে জনসাধারণ যেমন অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে প্রাপ্তির হিসাব কষে; তেমনি ভারত সফর থেকে দেখতে চায় অভিন্ন নদীর পানির হিস্যা ও সীমান্তে শান্তির বার্তা।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহাদি আমিন আনুষ্ঠানিক ব্রিফিংয়ে চীন সফরকে ‘ঐতিহাসিক’ আখ্যা দিয়েছেন। তিনি ১৭টি ‘সমঝোতা স্মারক’ স্বাক্ষর হওয়ার কথা জানিয়েছেন। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রালয়ের ওয়েবসাইটে প্রাপ্ত যৌথ ঘোষণার বিবরণেও সমঝোতা স্মারকগুলোর চুম্বক অংশ পাওয়া যায়।
১৫টি অনুচ্ছেদের ওই ঘোষণায় বলা হয়েছে, উভয় দেশ সামগ্রিক ‘কৌশলগত অংশীদারিত্বমূলক সম্পর্ক’ গড়তে রাজি হয়েছে। এই লক্ষ্যে নিয়মিত সংলাপ হবে ‘২+২’ মডেলে। অর্থাৎ আলোচনায় উভয় দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী থাকবেন। এর আরেকটা অর্থ দাঁড়ায়, উভয় দেশের সামরিক সম্পর্কও গুরুত্ব পাবে।
লক্ষণীয়, যৌথ ঘোষণার চতুর্থ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ‘এক চীন নীতি’র প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে তাইওয়ানকে চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তাইওয়ানের যে কোনো ধরনের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্টভাবে বিরোধিতার সঙ্গে সঙ্গে চীনের পুনরেকত্রীকরণ উদ্যোগে সমর্থন জানিয়েছে।
তাইওয়ান প্রসঙ্গে একটা পৃথক দফা থাকার ভেতর দিয়ে স্পষ্ট হলো– অতীতে বিএনপি তাইওয়ান প্রশ্নে যে অবস্থান নিয়েছিল এবং তার ফলে চীনের সঙ্গে যে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল, সেটা থেকে উভয় পক্ষ বের হতে চেয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ব্রিকস এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার অংশীদার হওয়ার ব্যাপারে চীন বাংলাদেশকে সহায়তা করবে বলেও জানানো হয়।
অর্থনৈতিক পরিসরে কেবল দুটি বিষয় স্পষ্টভাবে এসেছে; মোংলা বন্দরের আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণে উভয় দেশ কাজ করবে এবং চট্টগ্রামে চীন বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়বে। মোংলা বন্দর প্রশ্নে ‘সম্প্রসারণ’ কথাটা এই অর্থে গুরুত্বপূর্ণ যে, এখানেও চীন অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়তে পারে। একসময় এখানে ভারতের অর্থনৈতিক অঞ্চল হওয়ার কথা ছিল।
এই সফরে চীন-বাংলাদেশ সরাসরি ভূখণ্ডগত সংযোগের বিষয়ও খতিয়ে দেখার আলোচনা হয়েছে। অনেক সংবাদমাধ্যম এটাকে ‘করিডোর’ উল্লেখ করেছে বটে; বাস্তবে বলা হয়েছে ‘ডাইরেক্ট কানেক্টিভিটি’র কথা। করিডোর ও ভূখণ্ডগত সংযোগ পৃথক বিষয়। বাংলাদেশ-চীন ‘কানেক্টিভিটি’তে মিয়ানমার হবে করিডোর।
যৌথ ঘোষণার ১৩ নম্বর অনুচ্ছেদে রোহিঙ্গাদের ফেরত যাওয়ার বিষয়ে চীন ‘সামর্থ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ সহায়তা’ করবে, বলেছে। যদিও ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটির বদলে তাদের ‘জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠী’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করা হয়েছে। এ থেকে আবারও স্পষ্ট হলো, রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীন এখনও বামারদের জাতিগত অবস্থান সমর্থন করছে।
লক্ষণীয়, যৌথ ঘোষণায় বিনিয়োগ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ নতুন বার্তা কম। প্রতিরক্ষা বা সামরিক বিষয়েও তথৈবচ। তবে প্রতিরক্ষা বিষয়ে ‘সহায়তা’ বা কেনাকাটা অনেক সময়ই দৃশ্যমান থাকে না।
তিস্তা নদীর বাংলাদেশ অংশে অবকাঠামোগত যে পরিকল্পনা নিয়ে বহুদিন কথা হচ্ছে, চীন সেই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট কাজে সহায়তায় রাজি হয়েছে। বহুল আলোচিত প্রকল্পটি নিয়ে সম্ভাব্য চুক্তির যে অনুমান হচ্ছিল, সে রকম কিছু ঘটেনি।
‘তিস্তা’ বাংলাদেশের জন্য স্পর্শকাতর প্রসঙ্গ হয়ে উঠেছে। শেখ হাসিনার সরকার প্রায় দেড় যুগ আলোচনা করেও পানির হিস্যা আদায় করতে পারেনি। বিকল্প হিসেবে অবকাঠামোগত সমাধান নিয়েও সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগেছে। বর্তমান সরকারও মনে হচ্ছে এই বিষয়ে ধীরে চলো নীতি নিয়ে এগোচ্ছে। ভারত সফরকালে প্রধানমন্ত্রী হয়তো এ বিষয়ে নয়াদিল্লির সর্বশেষ মনোভাব বুঝতে চাইবেন। চীন সম্ভাব্য এই প্রকল্পে তৃতীয় কারও অংশগ্রহণ চাইছে না। আবার ভারতের আপত্তি থাকলে বাংলাদেশ এখনই প্রকল্পটি নিয়ে এগোতে অনিচ্ছুক, মনে হচ্ছে।

তবে যৌথ ঘোষণার বিপুল সম্ভাবনাময় দুটি অনুচ্ছেদ আছে। একটা হলো পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় সহায়তা। যদিও সংবাদ ভাষ্যগুলোতে তিস্তা প্রকল্পকে প্রধান মনোযোগের বিষয় করে রাখা হয়েছে; বন্যা ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনাগত সহযোগিতায় চীন যে আগ্রহ প্রকাশ করেছে, সেটা বাংলাদেশের জন্য কাজের হতে পারে।
ভারতের সঙ্গে আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোতে চুক্তি হোক বা না-হোক ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় পানি পাওয়ার সম্ভাবনা কম। এসব নদীর উজানে এত ড্যাম ও ব্যারাজ প্রকল্প হচ্ছে যে, অতীতের মতো নিরবচ্ছিন্ন পানিপ্রবাহ আর হয়তো কখনোই পাওয়া যাবে না। এটা রূঢ় বাস্তবতা।
ফলে বাংলাদেশের এখন পানির হিস্যার লড়াইয়ের পাশাপাশি পানি ব্যবস্থাপনায় বেশি মনোযোগ দেওয়া দরকার। যেহেতু আমাদের একটা ভালো বৃষ্টি মৌসুম আছে এবং নদনদীর ব্যাপক নেটওয়ার্ক; সেসব ব্যবহার করে চীনা জ্ঞান কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ পানি সমস্যার পরিবেশসম্মত সমাধানে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। এ ক্ষেত্রে এগোতে হলে বাংলাদেশকে ব্যাপকভাবে পানি ব্যবস্থাপনার যুগে প্রবেশ করতে হবে। তার জন্য পানিসম্পদ ঘিরে প্রশাসনিক ও প্রকৌশলগত দক্ষতা বাড়ানোও জরুরি। চীন হয়তো তারেক রহমান সরকারের সামনে সেই চ্যালেঞ্জই ছুড়ে দিয়েছে।
চীন সরাসরি ‘কানেক্টিভিটি’র যে প্রস্তাব দিয়েছে, সেটা বাংলাদেশ আরও এগিয়ে নিতে পারে। এ ধরনের সংযোগ বেশি ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ হবে না। মিয়ানমারের ওপর দিয়ে আরাকান পর্যন্ত চীন সংযুক্ত হওয়ার পথে আছে। আবার চট্টগ্রাম-কক্সবাজার অংশে বাংলাদেশও একই রকম লক্ষ্যে কিছু অবকাঠামো তৈরি করে রেখেছে। বিষয়টি এগিয়ে নিতে রাজনৈতিক সক্ষমতা দেখানোর পালা এখন। বাংলাদেশ এ রকম ভূখণ্ডগত সংযোগে যুক্ত হলে চীনের পাশাপাশি আসিয়ান দেশগুলোর অর্থনীতির সঙ্গেও যুক্ত হতে পারবে।
গত ৫৫ বছরে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের অর্থনৈতিক অংশ খুব বেশি এগোয়নি। ভারতের দিক থেকে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। উভয় প্রয়োজনে চীন ও আসিয়ানের দিকে ফেরা বাংলাদেশের জন্য জরুরি এখন। ভারতও অনেক দিন ধরে ‘লুক ইস্ট’ নীতি নিয়ে এগোচ্ছে।
ব্রিকসসহ নানান পরিসরে চীন-ভারত অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়াতে সচেষ্ট। বাংলাদেশ আলোচ্য ‘কানেক্টিভিটি’ প্রস্তাবে তাদের যুক্ত করার চেষ্টা করতে পারে। কাজটা কূটনৈতিকভাবে নিশ্চয়ই চ্যালেঞ্জিং। কিন্তু চেষ্টা করতে ক্ষতি কী! জিয়াউর রহমান সার্ক গঠনে সফল হয়েছিলেন। সেটাও তখন চ্যালেঞ্জিং ছিল। সে রকম বহুপক্ষীয় সম্ভাবনার দ্বার খোলা না গেলেও চীনের ‘ডাইরেক্ট কানেক্টিভিটি’র প্রস্তাব তারেক রহমানকে ভারত সফরে বড় পুঁজি দিয়েছে। অনেক বিষয়ে দরকষাকষিতে এটা নীরবেই তাঁর হাতকে শক্তি জোগাল। তবে কেবল কূটনৈতিক দরাদরি হাতিয়ার হিসেবে নয়, যে কোনো অবস্থায় চীনের সরাসরি সংযোগের প্রস্তাব ইতিবাচকভাবে দেখা উচিত ঢাকার। এটা হয়তো রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানেও সহায়তা করবে।
আলতাফ পারভেজ: দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস বিষয়ে গবেষক
- বিষয় :
- রাজনীতি
