ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

সমাজ

বাংলার সুর ও সংস্কৃতির গোড়ার কথা

বাংলার সুর ও সংস্কৃতির গোড়ার কথা
×

মামুনুর রশীদ

মামুনুর রশীদ

প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬ | ১০:১৩ | আপডেট: ২৯ জুন ২০২৬ | ১০:১৫

কবি ও তাত্ত্বিক ফরহাদ মজহার সম্প্রতি দ্য বিজনিস স্ট্যান্ডার্ডের ‘জিরো সাম গেম’ অনুষ্ঠানে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন; মুসলিম ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংগীতে সম্পর্ক বিষয়ে। তিনি বলেছেন, নিরাকার খোদার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক স্থাপনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম সুর। যিনি সর্বত্র বিরাজমান কিন্তু অদৃশ্য, তাকে ধরার জন্যই সংগীত; বাংলার সুরের ভুবনের গোড়ার দর্শনে এটা রয়েছে। কিছুদিন আগে আমি সমকালেই মুসলিম পরিবারের সংস্কৃতিচর্চার ওপর একটি লেখা লিখেছিলাম। ফরহাদ মজহার এ প্রসঙ্গে আব্বাসউদ্দীনের গানের সূত্র নিয়ে এসেছেন।

বস্তুত বাংলার মুসলিম পরিবারে সংগীতচর্চা শুরু হয়েছে বেশ বিলম্বে। কাজী নজরুল ইসলামের গানে ‘রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ গানটি কলকাতাকেন্দ্রিক সংগীতচর্চাকে অতিক্রম করে সারাবাংলায় এক প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। আব্বাসউদ্দীন অবশ্য এর আগে থেকেই উত্তরবঙ্গে ভাওয়াইয়া ও নানা লোকসংগীতের জনপ্রিয় গায়ক ছিলেন। নজরুল অনেক ইসলামী গজল ও গান দিয়ে মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারে সঙ্গীতচর্চায় উৎসাহ জুগিয়েছেন। 

অবশ্য এর অনেক আগে থেকেও মুসলমানদের মধ্যে উচ্চাঙ্গ সংগীতচর্চার বড় ধরনের প্রচলন দেখা যায়। ত্রিপুরা রাজ্যের ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর পুর্বপুরুষেরা সংগীতচর্চা করেছেন। আলাউদ্দিন খাঁ, আয়েত আলী খাঁ এবং তদীয় বংশীয়রা যেমন বাহাদুর হোসেন খাঁ– তারা বাংলার গণ্ডি পেরিয়ে বিশাল ভারতবর্ষেও স্থান করে নিয়েছেন। উত্তর ভারতের বিভিন্ন স্থানে নানা ঘরানা গড়ে উঠেছিল। ওস্তাদ করিম খাঁ, বড়ে গোলাম আলী খাঁ, বাদল খাঁ, কালে খাঁ এবং আরও অনেক উচ্চাঙ্গ সংগীতের ওস্তাদ বড় বড় আসর মাতিয়ে রাখতেন। ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খাঁ বেনারসে সানাই বাজিয়ে আল্লাহর নৈকট্য লাভের কথা বলেছেন। 

এসব ওস্তাদ মনেপ্রাণে ছিলেন অসাম্প্রদায়িক। তাদের শিষ্যত্ব যারা গ্রহণ করেছেন, তারাও বিভিন্ন ধর্মের। করিম খাঁ হিন্দু মন্দিরে গিয়ে কীর্তনের সুরে উচ্চাঙ্গ সংগীত গেয়ে সবাইকে মুগ্ধ করেছেন।

এ তো গেল উচ্চাঙ্গ সংগীতের কথা। কিন্তু বাংলার লোকজীবনে শত শত বছর ধরে মুসলমানদের সংগীতচর্চার অনেক তথ্যই পাওয়া যায়। বিশেষত সুফি সাধকরা সংগীতকে উপাসনার বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেছেন। মাইজভান্ডারীরা বহু বছর ধরে সংগীতকে ব্যবহার করে এক ভিন্ন ঘরানার সৃষ্টি করেছেন। এ কথা সত্যি, এসবের ভিন্নমতও তখনকার সমাজে প্রচলিত ছিল। সংগীতে বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার নিয়েও নানা কথা, বিরুদ্ধমত এসেছে। কিন্তু সংগীতের প্রয়োজন কখনও আমাদের সমাজে বাধাগ্রস্ত হয়নি। এসব সংগীত ও সমাজের শান্তি পাশাপাশি চলেছে। কিন্তু ১৯৪৬-৪৭ সাল ও তার আগে হিন্দু-মুসলিম যে দাঙ্গা অনুষ্ঠিত হয়, তাতে সাময়িকভাবে সংগীত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই সময় একটা আত্মপরিচয়ের সংকটে মুসলিম পরিবারগুলো ভুগত। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকদের ভাষার ওপর আক্রমণ বাঙালি মুসলমানকে বাঙালি সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গে একাত্ম করে এবং বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পর তারা ক্রমেই আত্মপরিচয়ের সংকট থেকে মুক্ত হয়। বিপুলসংখ্যক হিন্দুর দেশত্যাগের পর থমকে যাওয়া পরিস্থিতিতে মুসলিম পরিবারে শিল্প-সাহিত্য নতুনভাবে ফিরে আসে। 

অনেক গুণী শিল্পী-সাহিত্যিকের যেমন জয়যাত্রার সূচনা হয়, তেমনি বিপুলসংখ্যক গায়ক, সুরকার, গীতিকারের জন্ম হয়। ভাষাশহীদদের স্মরণে অবিনাশী গানেরও জন্ম হয়। একেবারে তরুণ গীতিকারদের দ্বারা রচিত গান তরুণ সুরকারদের সংগীতে নতুন জীবনের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। 

ষাটের দশকে একদিকে সামরিক শাসন, অন্যদিকে শিল্পচর্চা ও আন্দোলনের সুবর্ণ সময়। সেই সময়ে পঞ্চগীতিকবির গান মুসলিম পরিবারে প্রবেশ করে। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল আমাদের স্বাধিকার আন্দোলনে পাশে এসে দাঁড়ান। এই সময়ে ছায়ানটের আয়োজনে রমনার বটমূলে পহেলা বৈশাখ উদযাপন অবিস্মরণীয় ঘটনা। সকল উদযাপনেই সংগীত মুখ্য ভূমিকা পালন করে। 

এই সময়ে পাকিস্তানি শাসকরা বাংলার সংস্কৃতিচর্চাকে হিন্দুয়ানি লেবাস দেওয়ার অপচেষ্টা চালায়। সকল অপচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে অবশেষে মানুষ মুক্তিকামী হয়ে ওঠে। যার ফল মুক্তিযুদ্ধ।

মুক্তিযুদ্ধে সংগীতের ব্যবহার মানুষকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে। এই সময়ে পাকিস্তানিদের নিপীড়ন সংগীতশিল্পীদের ওপর নিষ্ঠুরভাবে বেড়ে যায়। সুরকার, সংগীতজ্ঞ আলতাফ মাহমুদকে নৃশংসভাবে তারা হত্যা করে। বোঝা যায়, সংগীত পাকিস্তানি শাসকদের শত্রুতে পরিণত হয়েছে। একই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও সেই সাম্প্রদায়িক ভাবাপন্ন ধর্মীয় উস্কানি বিভিন্ন স্থানে নানা ধরনের বাধার সৃষ্টি করে। সম্প্রতি মাজারগুলোতে আক্রমণ করে ধ্বংস করার যে প্রবণতা, তাও ওই চিন্তার ধারাবাহিকতার আরেক রূপ। 

প্রশ্ন হচ্ছে, যুগ যুগ ধরে যে অসাম্প্রদায়িক চেতনা বাংলাদেশের মৌল আদর্শের প্রতিফলন হিসেবে দেখা গেছে, সেখানে ক্রীড়া, সংগীত, চারুকলা, নাটক এসবকে কোণঠাসা করার একটা প্রবণতা এই সময়ে আমরা দেখতে পাই। অথচ বাংলাদেশে একটা সাংস্কৃতিক আবহের সঙ্গে সুফি মতাদর্শ অত্যন্ত সহায়ক একটি প্রবণতা হিসেবে দেখা যেত। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ক্রীড়া ও সংগীত শিক্ষাকে নির্বাসনে দেওয়ার অপচেষ্টা হয়েছিল। মানুষের মনে যদি সংগীতের অনুরণন না থাকে; কাব্যের প্রভাব না থাকে; চারুকলার অন্তর্বর্তী ছবিটি না ফুটে ওঠে বা সমাজ বাস্তবতার চিত্র নাট্যকলায় যদি সমাজের আয়নাটা না দেখতে পায়, তাহলে সে কেমন মানুষ হবে? সেই মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়তে শুরু করেছে। 

এই প্রেক্ষিতে ফরহাদ মজহারের আলোচনাটি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, সৎ ধর্মীয় চিন্তার সঙ্গে শিল্পের কোনো বিরোধ নেই। যদি থাকত তাহলে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, বিসমিল্লাহ খাঁ, করিম খাঁ– তারা সংগীতের মাঝে আরাধনা খুঁজতেন না এবং অতলস্পর্শী সংগীত রচনা করতেন না। এ কথা আরও প্রমাণ করে ঢাকায় যখন উচ্চাঙ্গ সংগীত এবং সুফি গায়কদের অনুষ্ঠান হয়েছে তখন সব বয়সের ও সব ধর্মের মানুষ রাতব্যাপী সেসব অনুষ্ঠানে যোগ দিত। প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নাটক, সংগীত, নৃত্যকলা, চারুকলা বিভাগ রয়েছে। কিন্তু স্কুল-কলেজে তার চর্চা নেই। বর্তমানে এই চর্চার আয়োজন অবশ্যই সুকুমার বৃত্তিকে আরও বেগবান করে তুলবে। আমরা অবশ্যই চাইব এই চর্চা প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত একটা সুস্থ ধারায় বিকশিত হোক।

প্রকৃত ধার্মিক মানুষদের মধ্যে সব সময়ই একটা অসাম্প্রদায়িক চর্চা থাকে। দাঙ্গার সময় দেখা গেছে এক ধর্মের মানুষ আরেক ধর্মের মানুষের প্রাণ রক্ষা করছে। ধর্মের শিক্ষাই হচ্ছে অন্য ধর্মের প্রতি সহিষ্ণুতা প্রকাশ করা। প্রতিহিংসার স্থান সেখানে নেই। ধর্মের বিষয়টিকে ভিন্ন খাতে প্রভাবিত করেছে অধার্মিকেরা, মূলত সম্পদ করায়ত্ত করার জন্য। এই সমাজ বাস্তবতায় ধর্মের সুললিত বাণী সংগীতের মতো একটি চমৎকার মাধ্যমে প্রকাশিত হওয়া অবশ্যই মানবিক পৃথিবী গড়ে তোলার আহ্বান জানাবে। আমাদের দুর্ভাগ্য, লাখো প্রাণের বিনিময়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা এলেও রাষ্ট্রকে আমরা মানবিক করতে পারিনি। আমাদের সেই ব্যর্থতা চিরদিনের ব্যর্থতা হওয়া উচিত নয়।

মামুনুর রশীদ: নাট্যকার ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

আরও পড়ুন

×