সমকালীন প্রসঙ্গ
সামাজিক সংস্কৃতি ভাঙলে পথ হারায় রাষ্ট্র
মামুনুর রশীদ
মামুনুর রশীদ
প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬ | ০৮:২৯ | আপডেট: ০৩ জুলাই ২০২৬ | ১২:৪৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
বিদ্যালয়ে প্রথম প্রবেশ করেই শিক্ষকের সঙ্গে পরিচয় হয়, যার নাম মানুষ নিজের জীবনে বিস্মৃত হয় না। তিনি অভিভাবক, তবে বেশিদিন নয়। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর অভিভাবকের পরিচয়টা লুপ্ত হওয়ার পথে চলে যায়। অভিভাবকের পরিবর্তন হতে হতে একসময় অনেক বড় একজন অভিভাবক মাথার ওপর বসেন, যিনি রাষ্ট্রেরও অভিভাবক। তারপর আসে শিক্ষা, চাকরি, রাজনীতির অভিভাবক। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দুষ্কর্মের অভিভাবকও বটে। আবার কিছু ক্ষেত্রে খুব অল্প বয়সে অভিভাবক ত্যাগ করে আমরা হয়ে যাই বেপরোয়া। অভিভাবক শব্দের যে কত রকম ব্যবহার আছে, তার সবটা আমার জানা নেই। শুধু এইটুকু জানি, যিনি সৎ পথে তাঁর অনুসারীদের পথ দেখান। আবার কিছু অভিভাবক থাকেন, যারা সমাজেরও অভিভাবক। এই সমাজের অভিভাবকদের নিয়েই যত সমস্যা। তারা দিন দিন কোণঠাসা হয়ে যাচ্ছেন, হারিয়ে যাচ্ছেন এবং সমাজে রেফারির দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না।
পশ্চিমা বিশ্বে অভিভাবকের প্রয়োজন হয় না। সেখানে আইনকানুনই অভিভাবক। শিশু বয়স থেকে আইন মানতে শেখে এবং জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত আইন মেনে পরপারে চলে যায়। সেখানে সমাজের কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু প্রাচ্যদেশে সবকিছুরই নিয়ন্ত্রক ছিল সমাজ। আইন ততটা কার্যকর ছিল না। ছিল কিছু নিয়মকানুন, শৃঙ্খলা ও পরম্পরা, যা প্রাচ্যদেশে রাজারাও মেনে চলত। যে রাজা সমাজকে মানত না, সে রাজার কপালে দুঃখ থাকত। আমরা এখন একটা অদ্ভুত ব্যবস্থায় পড়ে গেছি। আইন মানব না; অভিভাবক মানব না; শৃঙ্খলাও মানব না– তোরা যে যা বলিস ভাই, আমার সোনার হরিণ চাই। অর্থ চাই, বিত্ত চাই, সম্মান চাই; কিন্তু কোনো কিছু মেনে নয়। বেপরোয়া এই ব্যবস্থার কবলে আমরা পড়ে গেছি।

প্রাচ্যদেশের মধ্যে জাপান একটা আদর্শ। সেখানে বয়সকে মানে, আইন মানে, গুরুশিষ্য পরম্পরা মানে, পরিবার মানে। এসব মেনেই তারা পৃথিবীর একটি উন্নত দেশে পরিণত হয়েছে। একদা প্রাচ্যদেশে, সব জায়গাতে এই ব্যবস্থা ছিল। রবীন্দ্রনাথ এই সমাজের ভরসাতেই শান্তিনিকেতনের মতো একটি বিশাল প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। শিক্ষাক্ষেত্রে একেবারেই শিশুকাল থেকে পরিণত বয়স পর্যন্ত একটি তপোবন শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করেছিলেন, যেখানে প্রাকৃতিক পরিবেশ, গাছের নিবিড় ছায়া, শিক্ষকদের স্নেহ, শিক্ষার্থীদের শ্রদ্ধায় একটি পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল। লিখিত কোনো নিয়মের প্রয়োজন ছিল না। সবকিছুই একটা অলিখিত সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে চলত। এত বড় ভারতবর্ষ, তার নিয়ন্ত্রণ যখন দিল্লির হাতে, তখন এই বাংলার জীবনযাপনই বা কেমন ছিল? বিপুল সংখ্যক প্রহরী বা পাইক-বরকন্দাজ ছিল না। উৎপাদন মালিকানার একটা ব্যবস্থা ছিল; একটা অর্থনীতিও ছিল। শোষণ যে ছিল না, তা নয়। আজকের মতো আধুনিক বিচার ব্যবস্থা ছিল না, তবে একটা সামাজিক বিচার ব্যবস্থা অবশ্যই ছিল। সেই সময়ে বাংলায় মসলিনের মতো অত্যন্ত উঁচুমানের একটা বস্ত্রের উৎপাদন শুরু হয়েছিল, যা সারা পৃথিবীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। এর মূলে হয়তো একটা অভিভাবকত্বের উদাহরণ পাওয়া যায়। মানুষ সেই ব্যবস্থায় দুর্বিনীত হতে পারত না। কিন্তু শাসন যখন হয়েছে, নিয়মের কড়াকড়ি যখন হয়েছে, তখন অনিয়মও বেড়ে গেছে। এরপর আসে দমনপীড়নের পালা। পরিস্থিতির সবচেয়ে অবনতি ঘটে ব্রিটিশ শাসনামলে। তারা এ দেশের সামাজিক সংস্কৃতিকে ভেঙে দিয়ে নিজেদের জন্য একটা বড় লুণ্ঠনের ব্যবস্থা করে। আর লুণ্ঠিত সম্পদ তারা নিজ দেশে নিয়ে যায়। তাদের হীন উদ্দেশ্যগুলোকে চরিতার্থ করতে নিজস্ব কিছু অভিভাবককে চাপিয়ে দেয়। এই অভিভাবকরা সত্যিকারের অভিভাবক ছিলেন না। তারা ছিলেন শাসকের চাপিয়ে দেওয়া এক শ্রেণির লোক, যাদের হাতে ছিল অস্ত্রসহ নানা ধরনের নিপীড়নযন্ত্র। এর মধ্যে শিক্ষা ব্যবস্থা যাদের হাতে ছিল, তারা সমাজের এক ধরনের অভিভাবক হয়ে ওঠেন।
ব্রিটিশরাও একসময় তার প্রয়োজনে এ দেশে শিক্ষিত শ্রেণি তৈরির চেষ্টা করে। অনেক স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয় এবং বিদ্যাসাগরের মতো সমাজসংস্কারক এই শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্রতী হন। সেখানে কিছু খাঁটি শিক্ষকেরও জন্ম হয়, যারা সমাজের অভিভাবকরূপে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। শিক্ষক শুধু শিক্ষা দান করেন না; সমাজের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার কাজেও নিয়োজিত হন। কিন্তু অন্যদিকে আইন রক্ষার জন্য কিছু উকিল-মোক্তারের জন্ম হয়, যাদের মধ্যে একটা অংশ সমাজের নৈতিকতাবিরোধী কাজকর্মেও লিপ্ত হয়। তারা নিজেরাও সমাজের অভিভাবক হতে চায়। এই সময়ে সব ধর্মের একটা সুন্দর আদান-প্রদান ছিল। কিন্তু ব্রিটিশরা যখন ডিভাইড অ্যান্ড রুল নিয়মকে সমাজে কার্যকর করতে চায়, তখনই আসে সমাজে সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্ন। অভিভাবকরা দ্বিখণ্ডিত হয়; সমাজে তাদের শক্তি কমে আসতে থাকে। তার স্থান দখল করে রাজনীতি। ব্রিটিশের দুরভিসন্ধিমূলক তৎপরতায় ভারত বিভক্ত হয়। সাম্প্রদায়িকতার চূড়ান্ত পরিণতিতে বিশৃঙ্খলা আরও বাড়তে থাকে। তার মধ্যেও অভিভাবকত্বের একটা ভূমিকা লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু রাষ্ট্র শাসনে রাজনীতির ভয়াবহ অংশগ্রহণ অভিভাবকদের দুর্বল করে ফেলে। এই দুর্বলতার সুযোগে সমাজে দুর্বৃত্তদের একটা বড় জায়গা সৃষ্টি হয়। এখানে দুর্নীতি, ধর্মের ব্যবহার মিলে অভিভাবকদের আঘাত করতে থাকে। এই অভিভাবকদের অভাবে রাজনৈতিক শক্তি দিন দিন আরও শক্তিশালী হয়। এর মধ্যে দু-চারবার রাজনৈতিক শক্তিতে কিছুটা ইতিবাচক পরিস্থিতি দেখা গেলেও প্রযুক্তির ভয়াবহ অগ্রগতিতে মানুষ সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একা হয়ে যায়। হাতে হাতে পৌঁছে যায় প্রযুক্তির সহজ যন্ত্রপাতি। মানুষ সমর্পিত হয় প্রযুক্তির বেড়াজালে। তার যেন আর অভিভাবক প্রয়োজন নেই। কিন্তু অভিভাবকের প্রয়োজন না থাকলে যন্ত্রের কোনো দায়বদ্ধতা সমাজের প্রতি থাকে না। যন্ত্র হয়ে ওঠে সকল জ্ঞান-বুদ্ধির নিয়ামক। সেটাই বড় সংকট।
এই সংকটকে অতিক্রম করে মানুষ ন্যায্যতা, নীতি এবং আদর্শে ফিরে আসতে পারবে? যেখানে রাজনীতি ক্রমশ উদ্দেশ্যহীন এবং আদর্শহীন হয়ে পড়ে। কিন্তু এ কথাও সত্য, মানুষকে সত্য, ন্যায় ও আদর্শের কাছে ফিরে আসতেই হবে।
মামুনুর রশীদ: নাট্যকার ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব
- বিষয় :
- মামুনুর রশীদ
