প্রাথমিক শিক্ষা
শিক্ষক বদলিতে পশ্চাদ্গমন!
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬ | ০৮:২৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বদলি কার্যক্রম লইয়া নূতন সিদ্ধান্ত উদ্বেগজনক। উহা অনলাইনের পরিবর্তে অফলাইনে করিবার সিদ্ধান্ত হইয়াছে। একই সঙ্গে এই কার্যক্রমে দু্ইজন করিয়া বহিরাগত গণ্যমান্য ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্তির বিধান রাখা হইয়াছে। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সমকালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হইয়াছে, শিক্ষক বদলি কার্যক্রমে গণ্যমান্য ব্যক্তিদের যুক্ত করিবার কারণে প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা তৈয়ার হইয়াছে। প্রসঙ্গত অফলাইন বদলি ব্যবস্থায় রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, তদবির, ঘুষ ও দুর্নীতির কারণে ২০২৩ সালে প্রাথমিকে অনলাইন বদলি কার্যক্রমের সূচনা হইয়াছিল। সেইখানে পুনরায় পশ্চাতে গমনের হেতু কী?
ইহা সত্য, মাঝখানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বদলি লইয়া এক ধরনের অচলাবস্থা তৈয়ার হইয়াছিল। উহা সমাধানে অনলাইনের অব্যবস্থাপনা দূরীকরণের প্রচেষ্টাই জরুরি ছিল। তৎপরিবর্তে এই অফলাইনের সিদ্ধান্তে যাওয়া অযৌক্তিক। নূতন এই ব্যবস্থায় গণ্যমান্য ব্যক্তি তথা রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি বা অন্য কোনো প্রভাবশালী মহলের সুপারিশ অবশ্যমান্য হইয়া উঠিলে বদলি ব্যবস্থা যদ্রূপ নিরপেক্ষতা হারাইবে, তদ্রূপ ইহা ঘিরিয়া অনিয়ম ও দুর্নীতি বৃহৎ আকার ধারণ করিবে।
আমরা মনে করি, শিক্ষক বদলির মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানবসম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিতকরণ। কোথাও শিক্ষক সংকট, কোথাও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের অভাব, আবার কোথাও অতিরিক্ত শিক্ষক– এই সকল বাস্তবতা বিবেচনা করিয়াই বদলির সিদ্ধান্ত হইবে। কিন্তু যদি ব্যক্তিগত পরিচয়, রাজনৈতিক আনুগত্য বা সামাজিক প্রভাব বদলির প্রধান নিয়ামক হইয়া দাঁড়ায়, তবে প্রকৃত প্রয়োজনের পরিবর্তে ব্যক্তিস্বার্থ প্রাধান্য পাইবে। ইহার ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি আরও অধিক শিক্ষক সংকটে পড়িতে পারে। অপরদিকে শহরাঞ্চলে শিক্ষক কেন্দ্রীভূত হইবার প্রবণতা বৃদ্ধি পাইতে পারে।
এই ধরনের প্রভাব কেবল প্রশাসনিক বৈষম্যই সৃষ্টি করিবে না, বরং শিক্ষকদিগের মধ্যেও অসন্তোষ ও বৈরিতা বৃদ্ধি করিবে। একজন শিক্ষক যদি মনে করিয়া থাকেন, তাঁহার যোগ্যতা, কর্মদক্ষতা বা চাকুরির ন্যায্য অধিকারের পরিবর্তে সুপারিশই বদলির একমাত্র উপায়, তাহা হইলে পেশার প্রতি তাঁহার আস্থা ও অনুপ্রেরণা হ্রাস পাইতে বাধ্য।
প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসনের নূতন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বদলি প্রক্রিয়া চার স্তরে সম্পন্ন হইবে। যথায় বদলির সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিবর্তে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব, বিভাগীয় কমিশনার, ডিসি ও ইউএনওর নেতৃত্বাধীন বিভিন্ন কমিটির উপর ন্যস্ত করা হইয়াছে। কমিটিতে দুইজন করিয়া বহিরাগত গণ্যমান্য ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্তির বিধান রাখিবার কারণে সরকারি বদলি প্রক্রিয়ায় বেসরকারি ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা তৈয়ার করিবে এবং অতীতের ন্যায় ঘুষ, তদবির ও দুর্নীতির ঝুঁকি নিশ্চিতভাবেই বৃদ্ধি পাইবে।
প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসনের এই সময়ে শিক্ষক বদলিও সম্পূর্ণ অনলাইন ও স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হওয়া জরুরি। বদলির জন্য আবেদন, অগ্রাধিকার নির্ধারণ, শূন্য পদের তথ্য, বিষয়ভিত্তিক প্রয়োজন এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত– সকল কিছু অনলাইন প্ল্যাটফর্মে দৃশ্যমান থাকিলে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ অনেকাংশে হ্রাস পাইবে।
সরকারের উচিত এমন একটা বদলি ব্যবস্থা গড়িয়া তোলা, যেইখানে একজন শিক্ষক নিশ্চিত থাকিবেন– তাঁহার বদলি হইবে কেবল নীতিমালা, প্রয়োজন এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে; কোনো ব্যক্তি, সুপারিশ বা প্রভাবের ভিত্তিতে নহে। স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক বদলি ব্যবস্থা যদ্রূপ শিক্ষকদের অধিকার রক্ষা করিবে, তদ্রূপ শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থাও সুদৃঢ় হইবে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জনৈক শিক্ষক সমকালের প্রতিবেদককে বলিয়াছেন, তাহারা অনলাইন বদলিকেই যথোপযুক্ত বলিয়া মনে করেন। এই পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট স্কোরের ভিত্তিতে স্বচ্ছতার সহিত বদলি হইতে পারেন। আমরা চাই, প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসন বিষয়টা পুনর্বিবেচনা করিবে। প্রযুক্তিনির্ভর সফটওয়্যারের মাধ্যমে শূন্য পদ, চাকুরির মেয়াদ, দুর্গম এলাকা, পারিবারিক ও স্বাস্থ্যগত প্রয়োজনসহ বিভিন্ন সূচক স্বয়ংক্রিয়ভাবে মূল্যায়ন করিয়া বদলি সম্পন্ন করিলেই কেবল স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ সম্ভব হইবে।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়
