ঢাকা শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬

দুই বছরে পাঁচ শতাধিক শিল্পকারখানা বন্ধ

দুই বছরে পাঁচ শতাধিক শিল্পকারখানা বন্ধ
×

আবু হেনা মুহিব

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬ | ০৯:২৮ | আপডেট: ০৩ জুলাই ২০২৬ | ০৯:৪৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

গত দুই বছরে পাঁচ শতাধিক শিল্পকারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এই হিসাব শিল্প পুলিশ ও উদ্যোক্তা সংগঠনগুলোর। কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রধান কারণ গ্যাস-বিদ্যুতের অভাব এবং সে কারণে উৎপাদন সক্ষমতা কমে আসা। এমন পরিস্থিতিতে আরও অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

উদ্যোক্তা ও শ্রমিক নেতারা বলছেন, কারখানা বন্ধের কারণে বহু শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। শুধু পোশাক খাতেই কাজ হারিয়েছেন দেড় লাখ শ্রমিক। অন্যান্য খাত হিসাবে নিলে এ সংখ্যা অনেক বড় হবে।

শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়ার প্রভাবে রপ্তানি আয়ও কমছে। সদ্যসমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি আগের অর্থছরের চেয়ে ১ শতাংশের মতো কমেছে। আর রপ্তানি আয় কমেছে আগের বছরের তুলনায় ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ। পাশাপাশি এই সময়ে নতুন রপ্তানি আদেশ কমেছে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর হালনাগাদ উপাত্ত বলছে, গত অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি মাত্র ২ দশমিক ৮৬ শতাংশে নেমে এসেছে। 

শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়া দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের অভিঘাত বলছেন অর্থনীতিবিদরা। গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান সমকালকে বলেন, এত শিল্পকারখানা বন্ধ থাকা এবং আরও বড় সংখ্যক কারখানা বন্ধের ঝুঁকিতে থাকা দেশের সার্বিক অর্থনীতির জন্য অনেক বড় অভিঘাত। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। 

তাঁর মতে, সরকার প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করলেও অনেক শিল্পকারখানাই এখন আর উৎপাদনে ফেরার মতো অবস্থায় নেই। কিছু কারখানার জন্য টাকাই যথেষ্ট নয়। তাদের জন্য ‘এক্সিট পলিসি’ নেওয়া যেতে পারে। আর প্রণোদনায় প্রাণ ফিরবে এমন কারখানায় পরিচালন পুজি জোগান ও গ্যাস-বিদ্যুতের ব্যবস্থা করতে হবে। শ্রমিকের একটু ভালো রাখার জন্য শিল্প এলাকায় ওএমএস কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা দরকার। 

কাজ হারিয়েছেন দেড় লাখ শ্রমিক
ইন্ডাস্ট্রিঅল গ্লোবাল ইউনিয়ন ট্রেড ইউনিয়নের একটি বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম। ১৩০টি দেশে তাদের কার্যক্রম রয়েছে। প্ল্যাটফর্মটির বাংলাদেশ কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার মনে করেন, দুই বছরে বন্ধ কারখানার প্রকৃত সংখ্যা ৫০০ নয়, এর দ্বিগুণ হবে। বড় কারখানার বাইরে ছোট কারখানা বন্ধ হলে সরকারি সংস্থা বা বাহিনী তা নথিভুক্ত করে না। তাঁর দাবি, গত দু্‌ই বছরে শুধু পোশাক খাতেই দেড় লাখ শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। 

উদ্যোক্তা ও শ্রমিক নেতারা জানিয়েছেন, কারখানা বন্ধের প্রধান কারণ গ্যাস-বিদ্যুতের অভাব এবং উৎপাদন সক্ষমতা কমে আসা। কিছু কারখানার ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা দুর্বলতা ও সময়মতো শিপমেন্ট করতে না পারা বন্ধ হওয়ার কারণ। আন্তর্জাতিক কারণের মধ্যে রয়েছে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলাকে কেন্দ্র করে জ্বালানিসহ বিশ্ববাজারে অস্থিরতা; রাশিয়া, ইউক্রেনের যুদ্ধের অভিঘাত, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আরোপ এবং এর জেরে বিশ্ববাণিজ্যের ওলট-পালট পরিস্থিতি ও বিশ্ববাজারে নিম্নমুখী চাহিদা। 

পরিসংখ্যান কী বলে 
শিল্প পুলিশের হিসাবে ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দুই বছরে ৪৫৭টি শিল্পকারখানা বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে বস্ত্র ও তৈরি পোশাক কারখানা রয়েছে ১৭০টি। বাকি ২৮৭টি পোশাকবহির্ভূত। বন্ধ হওয়ার তালিকায় তৈরি পোশাক উৎপাদক ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সদস্য কারখানা ১০৮টি, নিট ক্যাটেগরির পণ্য উৎপাদক ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিকেএমইএর কারখানা ৩৫টি, বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএর কারখানা আটটি। বাকি ১৯টি বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ বা বেপজার অধিভুক্ত কারখানা। 

তবে শিল্প পুলিশের তথ্যের সঙ্গে পোশাক ও বস্ত্র খাতের তিন সংগঠনের তথ্যের ফারাক রয়েছে। বিজিএমইএর উপাত্ত বলছে, দুই বছরে সংগঠনের ২২১টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে গত বছর সর্বাধিক ১৪১টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। আগের বছর ২০২৪ সালে বন্ধ হয় ৭৭টি কারখানা। ঢাকা ও চট্টগ্রাম জোন মিলে বিজিএমইএর সদস্য কারখানা এখন ২ হাজার ১২৭টি। 

শিল্পাঞ্চলে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট
গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া ও চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ আগের চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমেছে। চাহিদার তুলনায় সাভার ও আশুলিয়ার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর সরবরাহ প্রায় ৪০ শতাংশ কম। ফলে লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হয়। 

অন্যদিকে বিদ্যুৎ না থাকলে উৎপাদন অব্যাহত রাখতে জেনারেটর চালাতে হয়। সে ক্ষেত্রেও গ্যাস ও ডিজেল চাহিদামতো না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি দাম বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে।

এ ছাড়া নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় অনেক কারখানা উৎপাদনে যেতে পারছে না। চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জের ডজন খানেক স্টিল রি-রোলিং মিল এবং সিরামিক কারখানা গ্যাসের চাপ সংকটের কারণে তাদের চুল্লি ঠিকমতো চালু রাখতে পারছে না।

আরও কারখানা ঝুঁকিতে
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান সমকালকে বলেন, বন্ধ হওয়া দুই শতাধিক কারখানার বাইরে আরও দুই শতাধিক কারখানা বন্ধের ঝুঁকিতে রয়েছে। কারখানাগুলো এখন আংশিক সচল। যে কোনো সময় এগুলো বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সরকারের প্রণোদনা তহবিল থেকে ঋণ পাওয়ার আগ্রহ দেখানো এই ৪০০ কারখানার সক্ষমতা যাচাইয়ে দুটি অডিট ফার্মকে এরই মধ্যে কাজ দেওয়া হয়েছে। কারখানাগুলো পরিদর্শন করে বিজিএমইএর কাছে প্রতিবেদন জমা দেবে তারা। অডিট ফার্মগুলোর সুপারিশের ভিত্তিতে বিজিএমইএ বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে তালিকা দিয়ে ঋণ সহায়তা দেওয়ার অনুরোধ জানাবে। 

বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, ‘যদি আমাকে ৫০০ বার প্রশ্ন করেন, শিল্পের জন্য কী চান? প্রতিবারই আমি বলব নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ।’ গ্যাস-বিদ্যুৎ পাওয়া না গেলে ঋণ সহায়তা দিয়ে শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না।’

বিটিএমএ সূত্রে জানা গেছে, সংগঠনের সদস্য ২৩৪টি কারখানা বন্ধ রয়েছে। অবশ্য এই হিসাব ২০১৯ সাল থেকে গতকাল পর্যন্ত। বন্ধ কারখানার মধ্যে ১১৪টি স্পিনিং অর্থাৎ সুতা উৎপাদনের কারখানা। বন্ধ থাকা বাকি কারখানাগুলো কাপড় তৈরি, ডায়িং, প্রিন্টিং ও ফিনিশিংয়ের। বন্ধ হওয়ার পর বিটিএমএর কারখানার সংখ্যা এখন ১ হাজার ৮৬৯টি। বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল সম্প্রতি জানিয়েছেন, তাঁরই পাঁচটি স্পিনিং মিল বন্ধ রয়েছে। 

বিটিএমএ সূত্র জানিয়েছে, কারখানা বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি ১ হাজার ১২১ কারখানায় আংশিক উৎপাদনে রয়েছে। সক্ষমতার প্রায় অর্ধেক উৎপাদন হচ্ছে কারখানাগুলোতে। বিজিএমইএর এ মুহূর্তে আংশিক সচল কারখানার সংখ্যা ১ হাজার ৩২১টি। আংশিক চালু কারখানাগুলোর অধিকাংশই বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। 
আশুলিয়ার লিটিল স্টার স্পিনিং মিল দীর্ঘদিন ধরে সক্ষমতার ৫০ শতাংশ কম উৎপাদন করছে। মিলটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম খোরশেদ আলম সমকালকে বলেন, তাঁর কারখানায় গ্যাসের চাপ থাকার কথা ১০ পিএসআইজি। অথচ বেশির ভাগ দিনই ১ বা ২ পিএসআইজির বেশি থাকে না। এ কারণে মেশিন চালু করা যায় না। কোনো রকমে সক্ষমতার ৫০ শতাংশ পর্যন্ত উৎপাদন চালু রাখার চেষ্টা করছেন তিনি। 

রপ্তানি আদেশ কমছে
রপ্তানি আদেশের পরিস্থিতি বোঝা যায় ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন- ইউডির উপাত্তে। রপ্তানি আদেশ পাওয়ার পর পোশাক উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামাল আমদানি করে থাকে কারখানাগুলো। আদেশে উল্লিখিত পোশাকের পরিমাণ অনুযায়ী কাঁচামালের প্রয়োজনীয়তার সনদ হচ্ছে ইউডি। এ সনদ সরকারের পক্ষে পোশাক খাতের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ দিয়ে থাকে।

উপাত্তে দেখা যায়, আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে রপ্তানি ইউডি সংখ্যা ও অর্থমূল্যে ব্যাপক হারে কমেছে। গত বছরের মার্চ মাসে ইউডির সংখ্যা ছিল ২৩ হাজার ৬৯৭টি। অর্থের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৩৫ কোটি ডলার। এ বছরের মার্চে ইউডি কমে হয়েছে ২১ হাজার ৪৪১টি। অর্থমূল্য ২০০ কোটি ডলারের কিছু কম। 

গত বছরের এপ্রিলে ইউডির সংখ্যা ছিল ২১ হাজার ৪৮৮টি। এর বিপরীতে পণ্যের অর্থমূল্য ছিল ২৩৪ কোটি ১৬ লাখ ডলার। এ বছরের এপ্রিলে ইউডি ছিল ২৭ হাজার ৫১৫টি। অর্থমূল্য ২৮৫ কোটি ডলারের কম। গত বছরের মে মাসে ইউডি ছিল ২৬ হাজার ৫৪১টি। অর্থের পরিমাণ ২২৭ কোটি ডলার। এ বছরের একই মাসে ইউডি কমে হয় ২৬ হাজার ৬৮টি। অর্থমূল্য কমে দাঁড়ায় ২৫৪ কোটি ডলার। গত বছরের জুনে ছিল ১৮ হাজার ৩৭২টি। অর্থের পরিমাণ ছিল ২২৭ কোটি ডলারের বেশি, যা গেল জুনে হয়েছে ১৭৯ কোটি ডলার। 

 

আরও পড়ুন

×