নির্বাচনী খরচের হিসাব না দেওয়া সাতটি দল জরিমানার মুখে
নির্বাচন ভবন। ছবি-সংগৃহীত
অমরেশ রায়
প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬ | ০৯:১৭ | আপডেট: ০৩ জুলাই ২০২৬ | ১০:২৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
নির্বাচনী খরচের হিসাব না দেওয়ায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া সাতটি রাজনৈতিক দলকে জরিমানা গুনতে যাচ্ছে। এরই মধ্যে নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে দলগুলোকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এই নোটিশেই জরিমানা দিয়ে হিসাব জমা দেওয়ার জন্য কেন তাদের ১৫ দিন সময় বেঁধে দেওয়া হবে না– তা জানতে চাওয়া হয়েছে।
তবে নির্বাচনী খরচের হিসাব জমা দিতে ব্যর্থ হওয়া দুই প্রার্থীর বিরুদ্ধে অনেকটাই ‘নমনীয়’ ইসি। আইন অনুযায়ী, তাদের বিরুদ্ধে মামলা না করে খোঁজখবর নিতে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইসি বলছে, দুই সহস্রাধিক প্রার্থীর মধ্যে মাত্র দুজনের হিসাব জমা না দেওয়ার বিষয়টি খুবই নগণ্য, অতীতের যে কোনো নির্বাচনের চেয়ে তা অনেক কম। এই বিবেচনায় বিষয়টিকে মানবিকভাবে দেখার কথা বলা হয়েছে।
ইসি সূত্র বলছে, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে ইসিতে নিবন্ধিত ৫৬টি দলের মধ্যে ৫০টি অংশ নেয়। ইসির সর্বশেষ বর্ধিত সময় অনুযায়ী, দলগুলোর নির্বাচনী খরচের হিসাব জমা দেওয়ার শেষ সময় ছিল গত ১৩ জুন। এই সময় পর্যন্ত হিসাব জমা দিয়েছে ৪৩টি দল। বাকি সাতটি দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি), আমজনতার দল, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (বিএমএল) এবং ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট (এনডিএম) এখনও খরচের হিসাব জমা দেয়নি।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, জাতীয় নির্বাচনের ফলের গেজেট প্রকাশের ৯০ দিনের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনী খরচের হিসাব দিতে হয়। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। পরদিন ১৩ ফেব্রুয়ারি রাতে ইসি বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করে। সে হিসাবে গত ১৩ মে খরচের হিসাব জমা দেওয়ার সময় পার হয়। এই সময়ের মধ্যে জামায়াতসহ ২৭টি দল হিসাব জমা দেয়। বিএনপিসহ ২৩টি দল হিসাব দিতে ব্যর্থ হয়।
পরে ইসি সময় এক মাস বাড়িয়ে ১৩ জুন নির্ধারণ করেছিল। চিঠি দিয়ে এসব দলকে সতর্কও করে দেয় ইসি। এই সময়ের মধ্যে বিএনপিসহ আরও ১৬টি দল, অর্থাৎ মোট ৪৩টি দল হিসাব জমা দেয়। গেজেট প্রকাশের প্রায় সাড়ে চার মাস (১৩৪ দিন) পরও সাতটি দলের কাছ থেকে ব্যয়ের হিসাব পায়নি ইসি। একটি দল অবশ্য সময় বাড়াতে আবেদন জানিয়ে চিঠি দেয় ইসিকে।
আরপিওর বিধান অনুযায়ী, কোনো দল নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাদের নির্বাচনী ব্যয় জমা দিতে ব্যর্থ হলে ইসি ওই দলকে ৩০ দিনের মধ্যে বিবরণী জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে সতর্কতামূলক নোটিশ জারি করবে। এর পরও ওই রাজনৈতিক দল ব্যয় বিবরণী দিতে ব্যর্থ হলে কমিশন ১০ হাজার টাকা জরিমানা সাপেক্ষে আরও ১৫ দিন সময় দিতে পারবে। যদি সেই বর্ধিত সময়ের মধ্যেও বিবরণী জমা দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে কমিশন ওই দলের নিবন্ধন বাতিল করতে পারবে।
এ পরিস্থিতে ইসি গত ২৫ জুন দলগুলোকে শোকজ নোটিশ পাঠায়। ইসির উপসচিব মোহাম্মদ মনির হোসেন স্বাক্ষরিত চিঠিতে কেন তাদের ১০ হাজার টাকা জরিমানাসহ ১৫ দিনের মধ্যে হিসাব দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হবে না– তা জানতে চাওয়া হয়েছে।
এদিকে, গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ২৯৯টি আসনে প্রার্থী ছিলেন দুই হাজার ২৮ জন। এর মধ্যে দলীয় প্রার্থী ছিলেন এক হাজার ৭৫৫ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৩ জন। দুই দফা সময় বাড়ানোর পর প্রার্থীদের নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব জমা দেওয়ার সময়সীমা পার হয়েছে গত ১৪ জুন। এই সময়ের মধ্যে দুই প্রার্থী হিসাব জমা দিতে ব্যর্থ হন। তবে এই দুজনের নাম ও পরিচয় জানাতে চাননি ইসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ইসি সূত্র বলছে, হিসাব জমা দেওয়ার নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর কয়েকজন প্রার্থীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রথম দফায় ৬ মে পর্যন্ত সময় বাড়িয়েছিল ইসি। এর মধ্যেও ২১ প্রার্থী তাদের হিসাব জমা দেননি। পরে আরপিও অনুযায়ী নির্বাচনী ব্যয় বিবরণী জমা দিতে ব্যর্থ হলে জেল-জরিমানার বিধান তুলে ধরে ১৪ জুন পর্যন্ত সময় দিয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের মাধ্যমে চিঠি দেওয়া হয় এসব প্রার্থীকে। এই সময়ের মধ্যে আরও ১৯ প্রার্থী হিসাব জমা দিলেও দুজনের বিষয়ে কোনো কিছুই অবগত নন বলে জানান রিটার্নিং কর্মকর্তারা।
আরপিও অনুযায়ী, নির্বাচনের ফলের গেজেট হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব জমা দিতে হয়। অবশ্য আবেদন জানালে এই সময়সীমা বাড়াতে পারে ইসি। এর পরও ব্যয়ের হিসাব জমা না দিলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীকে সর্বোচ্চ সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে।
জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ সমকালকে বলেন, সাতটি দল ও দুই প্রার্থী এখনও নির্বাচনী ব্যয় বিবরণী জমা দেয়নি। দলগুলোকে হিসাব জমা দেওয়ার তাগিদ দিয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে যে দুই প্রার্থী হিসাব জমা দিতে পারেননি, তাদের ব্যাপারে ইসি কিছুটা নমনীয় থাকবে। কেননা, দুই হাজারের বেশি প্রার্থীর মধ্যে মাত্র দুজন, সংখ্যাগত হিসাবে এটা অতি নগণ্য। হয়তো অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হিসাব জমা দিতে পারেননি তারা। তাদের বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে ব্যয় বিবরণী আদায়ের জন্য রিটার্নিং কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
- বিষয় :
- নির্বাচন
- জরিমান
- নির্বাচন কমিশন
- রাজনৈতিক দল
