ঢাকা শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬

গোল বেধেছে গোবরে

গোল বেধেছে গোবরে
×

 জাহিদুর রহমান

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬ | ০৯:২৫ | আপডেট: ০৩ জুলাই ২০২৬ | ০৯:৩০

| প্রিন্ট সংস্করণ

কৃষি মন্ত্রণালয়ের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে গোবর সার নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। মাত্র ৪ টাকা কেজি দরে গোবর সার সংগ্রহের নির্দেশনা, বিপুল পরিমাণ গোবরের অপর্যাপ্ততা এবং কর্মসূচির শেষ দিনে সরকারি আদেশ (জিও) সংশোধনের ঘটনায় বেকায়দায় পড়েছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তারা। তাদের আশঙ্কা, কোনো কোনো উপজেলায় গাছ লাগানোর পর নিয়মের পরিবর্তন হওয়ায় তারা ভবিষ্যতে অডিট আপত্তির মুখে পড়তে পারেন। 

সরকারের ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে চলতি বছর কৃষকদের মধ্যে ১৬ লাখ ২৮ হাজার বিভিন্ন প্রজাতির ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা বিতরণের উদ্যোগ নেয় কৃষি মন্ত্রণালয়। 

গত ৪ জুন কৃষি মন্ত্রণালয় একটি সরকারি আদেশ জারি করে ৩০ জুনের মধ্যে কৃষি প্রণোদনার গাছ বিতরণ কর্মসূচি বাস্তবায়নের নির্দেশ দেয়। 

জিও অনুযায়ী, প্রজাতিভেদে প্রতিটি চারার মূল্য ৩০ থেকে ১৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। প্রতিটি চারার সঙ্গে একটি বাঁশের খুঁটির জন্য ৫০ টাকা এবং প্রতিটি চারার জন্য ৪ টাকা দরে ৩০ কেজি গোবর সার বিতরণের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। এ হিসাবে একজন কৃষকের পাঁচটি চারার বিপরীতে ১৫০ কেজি গোবর সার পাওয়ার কথা। শুধু গোবর সারের জন্য একজন কৃষকের অনুকূলে বরাদ্দ ধরা হয় ৬০০ টাকা। 

দেশের বিভিন্ন জেলার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অধিকাংশ এলাকাতেই স্থানীয়ভাবে পর্যাপ্ত পরিমাণ গোবর সার পাওয়া যায় না। আবার যেসব এলাকায় পাওয়া যায়, সেখান থেকেও এত বিপুল পরিমাণ গোবর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংগ্রহ করা কঠিন। অনেক উপজেলায় কয়েক হাজার কৃষকের জন্য কয়েকশ টন গোবরের প্রয়োজন, যা মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সংগ্রহ ও বিতরণ করা প্রায় অসম্ভব।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেন, ‘গোবরের জন্য যে দাম ধরা হয়েছে, সেটি বাস্তব বাজারদরের সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আমরা খামার থেকে কাঁচা গোবর হয়তো কিছু ক্ষেত্রে কম দামে সংগ্রহ করতে পারি। কিন্তু বস্তায় ভরা, পরিবহন, শ্রমিক ও বিতরণ ব্যয় যোগ করলে সেই দাম কয়েক গুণ হয়ে যায়। মাঠের বাস্তবতা বিবেচনা না করেই কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা কৃষকদের জন্য সময়মতো চারা বিতরণ করতে চেয়েছি। কিন্তু গোবর সার সংগ্রহ করতে গিয়ে পুরো কর্মসূচিই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়।’

মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাজারদরের তুলনায় অস্বাভাবিক কম মূল্য নির্ধারণ করায় অনেক এলাকায় মানসম্মত গোবর সংগ্রহ সম্ভব হয়নি। ফলে কোথাও কোথাও নিম্নমানের গোবর সরবরাহ ও বিতরণের অভিযোগ উঠেছে।

এমন পরিস্থিতিতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশোধিত আদেশে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি আরও অনিশ্চয়তায় পড়ে যায়। কর্মসূচির শেষ দিন গত ৩০ জুন বিকেলে কৃষি মন্ত্রণালয় একই স্মারক নম্বর ও একই তারিখে আগের জিও সংশোধন করে নতুন নির্দেশনা জারি করে। 

সংশোধিত জিওতে বলা হয়, প্রতি চারার জন্য ৩০ কেজির পরিবর্তে মাত্র ৫ কেজি গোবর সার বিতরণ করতে হবে। প্রতি কেজি ৪ টাকা দর বহাল রেখে পাঁচটি চারার জন্য মোট ১০০ টাকার গোবর সার বিতরণ এবং অবশিষ্ট ৫০০ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এতে যেসব উপজেলায় কর্মসূচির বাস্তবায়ন শেষ হয়ে গেছে, সেসব কৃষি কর্মকর্তা বেকায়দায় পড়েছেন। অনেক উপজেলায় ইতোমধ্যে চারা, বাঁশের খুঁটি ও গোবর সার বিতরণ হয়ে গেছে। 

একাধিক উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারা আগের সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন করেছেন। এখন কাজ শেষ হওয়ার পর নিয়ম পরিবর্তন হওয়ায় অতিরিক্ত অর্থ ফেরত দেওয়া কিংবা হিসাব সমন্বয় করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দক্ষিণাঞ্চলের এক উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা সরকারের কর্মসূচি বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করেছি। কিন্তু মাঠে কাজ শেষ হওয়ার পর জিও পরিবর্তন হওয়ায় আমরা এখন বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি। ভবিষ্যতে অডিট আপত্তি উঠলে তার দায় কে নেবে?’

আরেক কর্মকর্তা বলেন, একই স্মারক নম্বর ও একই তারিখে দিনের শেষভাগে জিও সংশোধনের ফলে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য নতুন সমস্যা তৈরি হয়েছে। অনেক উপজেলা ইতোমধ্যে টাকা খরচ করেছে এবং নিয়ম অনুযায়ী হিসাব সম্পন্ন করেছে। এখন পেছনের তারিখ থেকে নতুন নির্দেশনা কার্যকর করা বাস্তবে সম্ভব নয়।
কৃষি-সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্দেশ্য অত্যন্ত ইতিবাচক। তবে জাতীয় পর্যায়ের এমন বৃহৎ কর্মসূচির পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা, স্থানীয় বাজারদর ও সরবরাহ ব্যবস্থার বিষয় আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

মৃত্তিকা সম্পদ বিশেষজ্ঞ আমীর মো. জাহিদ বলেন, চারা রোপণের সময় পরিমাণের চেয়ে জৈব সারের গুণগত মান বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ভার্মিকম্পোস্ট বা ট্রাইকোকম্পোস্ট তুলনামূলক বেশি কার্যকর। সেখানে বিপুল পরিমাণ কাঁচা গোবর ব্যবহারের সিদ্ধান্ত বাস্তবতা ও বৈজ্ঞানিক উভয় দিক থেকেই পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।

এ বিষয়ে কৃষি সচিব ড. রফিকুল ই মোহামেদ সমকালকে বলেন, ‘গাছ বিতরণ কর্মসূচিতে গোবর সার নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ার পর গতকাল কৃষি মন্ত্রণালয় সভা করেছে। সেখানে গাছ বিতরণে নানা প্রতিবন্ধকতা উঠে এসেছে। মূলত একেকটি গাছে ৩০ কেজি গোবর সার বিতরণের সিদ্ধান্ত বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল। গোবর সারের কেজিপ্রতি ৪ টাকা দাম নির্ধারণও অবাস্তব। ফলে আমরা এখন প্রতিটি গাছের জন্য ৫ কেজি গোবর সার বিতরণের আদেশ জারি করেছি। তবে যারা আগে ৩০ কেজি করে বিতরণ করেছেন, তাদের কোনো সমস্যা হবে না। ভবিষ্যতে আমরা এ বিষয়ে আরও সতর্ক থাকব।’

আরও পড়ুন

×