ইসলাম ও সমাজ
ভূমিকম্প আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন
মো. শাহজাহান কবীর
প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬ | ০৮:২২
| প্রিন্ট সংস্করণ
ভূমিকম্প মহান আল্লাহর কুদরতের একটি বড় নিদর্শন। মাটির নিচের প্লেট নড়ে ওঠা বৈজ্ঞানিক কারণ হলেও ইসলামের দৃষ্টিতে এর পেছনে রয়েছে মহান আল্লাহর হিকমত, সতর্কবাণী এবং বান্দার জন্য পরীক্ষা। কোরআন ও হাদিসে কিয়ামতের আলামত হিসেবে ভূমিকম্প বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন: ‘কিয়ামত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ না ভূমিকম্প বৃদ্ধি পাবে’ (সহিহ বুখারি)। তাই ঘন ঘন ভূমিকম্প হওয়া মুমিনের জন্য একটি হুঁশিয়ারি সংকেত। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দাকে গাফিলতি থেকে জাগানোর জন্য একটি ঝাঁকুনি।
আল্লাহতায়ালা সুরা বনি ইসরায়েলের ৫৯ আয়াতে এরশাদ করেন: ‘আর আমি নিদর্শনসমূহ প্রেরণ করি কেবল ভয় দেখানোর জন্য।’
ইমাম ইবনু কাসির (র.) বলেন, ভূমিকম্প, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদি আল্লাহর পাঠানো নিদর্শন, যাতে মানুষ পাপ থেকে তওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে। হযরত উমর (রা.)-এর যুগে মদিনায় ভূমিকম্প হলে তিনি মিম্বরে দাঁড়িয়ে মানুষকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, ‘হে মানুষ! তোমরা যদি এভাবে পাপ কাজ চালিয়ে যাও, তাহলে আমি তোমাদের সঙ্গে এই শহরে বসবাস করব না।’ তিনি ভূমিকম্পকে জনগণের পাপের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছেন।
ইসলাম ভূমিকম্পকে শুধু প্রাকৃতিক ঘটনা বলে উড়িয়ে দেয় না; এর আধ্যাত্মিক কারণও দেখায়। সমাজে জিনা, সুদ, অন্যায়, অবিচার, ওয়াদা ভঙ্গ, আমানতের খেয়ানত বেড়ে গেলে আল্লাহ নিদর্শন পাঠান। রাসুলে কারিম (সা.) বলেন, ‘যখন আমার উম্মত ১৫টি কাজ করবে, তখন তাদের ওপর বিপদ নেমে আসবে... এবং ভূমিকম্প প্রকাশ পাবে’ (তিরমিজি)– আমানতের খেয়ানত, সুদ খাওয়া, গান-বাজনা বৃদ্ধি ইত্যাদি।
ভূমিকম্প একটি ভয়ের মুহূর্ত। এই সময় ইসলাম আমাদের কিছু আধ্যাত্মিক ও বাস্তব করণীয় শিখিয়েছে। মহান আল্লাহকে ভয় ও তাওবা করা প্রথম ও প্রধান কাজ। ভূমিকম্প দেখে বলতে হবে: ‘এটা আল্লাহর নিদর্শন। হে আল্লাহ, আমরা আপনার দিকে ফিরে এলাম।’
সাহাবাদের যুগে বড় কোনো নিদর্শন দেখা দিলে তারা সালাত আদায় করতেন। ভূমিকম্পের সময়ও দুই রাকাত নফল সালাত আদায় করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া সুন্নাহ। বেশি বেশি জিকির ও আস্তাগফিরুল্লাহ পড়া, লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জোয়ালেমিন– এই দোয়া পড়া। কারণ গুনাহই বিপদ ডেকে আনে। হাদিসে বর্ণিত, রাসুলে কারিম (সা.) বলেন: সাদকা আল্লাহর রাগকে নিভিয়ে দেয় (তিরমিজি)। বিপদের সময় গরিব-দুঃখীকে দান করলে আল্লাহর গজব দূর হয়।
ভূমিকম্প শুরু হলে খোলা মাঠ, শক্ত টেবিলের নিচে বা দেয়ালের কোণে আশ্রয় নিতে হবে। ভবনের নিচে দৌড় দেওয়া যাবে না। পরিবারসহ একটি জরুরি ব্যাগে পানি, শুকনো খাবার, টর্চ, ফার্স্ট এইড, জরুরি কাগজপত্র রাখতে হবে। মসজিদ ও মহল্লাভিত্তিক উদ্ধার টিম তৈরি রাখতে হবে।
টাকা বাঁচিয়ে দুর্বল ঘর বানানো যাবে না। আল্লাহর দেওয়া জ্ঞান দিয়ে ভূমিকম্প সহনীয় স্থাপনা বানাতে হবে। এটাও আল্লাহর হুকুম মানা। যারা ঘরবাড়ি হারিয়েছে, আহত হয়েছে, তাদের পাশে দাঁড়ানো জরুরি। রাসুলে কারিম (সা.) বলেন, যে তার ভাইয়ের সাহায্যে থাকে, আল্লাহ তার সাহায্যে থাকেন (সহিহ বুখারি)।
ভূমিকম্পের পর গুজব ও আতঙ্ক ছড়ানো যাবে না। যাচাই না করে কিছু প্রচার করা যাবে না।
ইসলাম বিপদের সময় মুসলিম-অমুসলিম সবাই একসঙ্গে উদ্ধারকাজ পরিচালনা করার কথা বলে। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে ভূমিকম্প ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে হেফাজত করুন।
ড. মো. শাহজাহান কবীর: বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ, ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা
- বিষয় :
- ইসলাম প্রচার
