ঢাকা শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬

আন্তর্জাতিক

লেবানন-ইসরায়েল চুক্তি কতটা ফল দেবে

লেবানন-ইসরায়েল চুক্তি কতটা ফল দেবে
×

সামি হালাবি

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬ | ০৮:২৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

কয়েক মাসের যুদ্ধ, তীব্র চাপ আর কূটনৈতিক টানাপোড়েনের পর লেবানন অবশেষে ইসরায়েলের সঙ্গে একটি ‘যৌথ অভিপ্রায় ঘোষণা’ করেছে। এর প্রতিক্রিয়া আসতেও সময় লাগেনি। হিজবুল্লাহ, তার মিত্রসহ লেবাননের রাজনৈতিক অঙ্গনের বড় একটি অংশ এই অভিপ্রায়ের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। রাস্তায় নেমেছে সাধারণ মানুষ আর সংবাদমাধ্যমে বইছে সমালোচনার ঝড়।

এই স্বাক্ষরিত দলিলের সমস্যা অনেক। এটি অবাস্তব, রাজনৈতিকভাবে বিতর্কমূলক এবং সাংবিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে সন্দেহজনক। এর সবচেয়ে ভয়াবহ দিকটি হলো, এটি আসলে নতুন যুদ্ধের পথ প্রশস্ত করছে। আর সেই যুদ্ধের সব দোষ লেবাননের ঘাড়ে চাপানোর একটা হাতিয়ারে রূপ নিচ্ছে। 

অস্পষ্ট খসড়া চুক্তি, অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা আর মূল প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাওয়ার কৌশলে ইসরায়েল বরাবরই বেশ পটু। এর একটি বড় উদাহরণ অসলো চুক্তি, যার নামই ছিল ‘নীতিমালা ঘোষণা’; যেখানে কেবল ‘আগামী দিনের আলোচনার সাধারণ রূপরেখা’ নির্ধারণ করা হয়েছিল। সীমান্ত, বসতি স্থাপন, জেরুজালেম, শরণার্থী, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের মতো মূল বিষয়গুলো ‘পরবর্তীকালের জন্য’ তুলে রাখা হয়েছিল। আর সেই ‘পরের দিন’ কখনোই আসেনি। ফলস্বরূপ সেই সাময়িক কাঠামোই একসময় স্থায়ী রূপ নেয়। যেখানে ইসরায়েল ইচ্ছামতো যে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার স্বাধীনতা বহাল রাখে, বর্ণবাদ ছড়ায়, দখলদারি চালায়, একের পর এক জমি কেড়ে নেয়। শেষমেশ শর্ত পূরণে ব্যর্থতার জন্য ফিলিস্তিনিদেরই দায়ী করে। 

লেবানন অবশ্য ফিলিস্তিন নয়। আর এ দুটি প্রেক্ষাপট বা দলিলও হুবহু এক নয়। কিন্তু এর পেছনের কূটনৈতিক চাল এতটাই এক; তা বেশ আশঙ্কাজনক। লেবানন ও ইসরায়েল মূল সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান না খুঁজে কেবল ‘যুদ্ধাবসান ঘটানোর আকাঙ্ক্ষা’ প্রকাশ করছে। এই প্রবণতা আপাতদৃষ্টিতে নমনীয় মনে হলেও বাস্তবে এটি এক ফাঁদ হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।

লেবানন এখন যে রূপরেখা মেনে নিয়েছে, তা কাগজ-কলমে বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন। বলা চলে, প্রায় অসম্ভব। কারণ, শুধু একটি সরকারি ডিক্রি বা আদেশ জারি করেই লেবানন রাষ্ট্র হিজবুল্লাহর বিকল্প হয়ে উঠতে পারে না। হিজবুল্লাহর অস্ত্রভান্ডার কেবল একটি সামরিক বাস্তবতা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রতিরোধ; নিজেদের জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা এবং নিজের ভূখণ্ড রক্ষায় লেবানন রাষ্ট্রের ব্যর্থতার এক দীর্ঘ রাজনৈতিক আখ্যান। ওয়াশিংটনে একটা কাগজে সই করলেই এই পুরো কাঠামো রাতারাতি বিলুপ্ত হয়ে যায় না।

আবার লেবাননের সেনাবাহিনীও হঠাৎ দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার মূল শক্তি হয়ে উঠতে পারবে না, যা সবাই ওপরে ওপরে চাইছে। কারণ এই বাহিনী এখনও টাকা-পয়সার সংকটে জর্জরিত; অতিরিক্ত কাজের চাপে ক্লান্ত; রাজনৈতিকভাবে আপসগ্রস্ত এবং এমন এক বিদেশি সামরিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল, যা স্বয়ং ইসরায়েল ও আমেরিকার বেঁধে দেওয়া রেড লাইনের মধ্যে বন্দি।
সহজ কথায়, লেবাননের সার্বভৌম ক্ষমতা যেখানে সবচেয়ে দুর্বল, ঠিক সেখানেই তাকে একটি শক্তিশালী সার্বভৌম রাষ্ট্রের মতো আচরণ করতে বলা হচ্ছে। তাকে এমন সব সশস্ত্র গোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করতে বলা হচ্ছে, যাদের সে হারাতে পারবে না। এমন এক শত্রুর সঙ্গে আলোচনা করতে হচ্ছে, যাকে সে রুখতে অক্ষম এবং এমন সব বাধ্যবাধকতা মেনে নিতে হচ্ছে, যার বাস্তবায়ন নির্ভর করছে এমন কিছু শক্তির ওপর, যারা লেবাননের সার্বভৌমত্বকে মোটেও অগ্রাধিকার দেয় না।

এই চুক্তির সবচেয়ে বিপজ্জনক ধারাগুলো হলো, যা যুদ্ধক্ষেত্রের গণ্ডি ছাড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বা আইনি ফোরামে যে কোনো পক্ষের ‘শত্রুতামূলক’ বা ‘প্রতিকূল’ পদক্ষেপ বন্ধ করার যে শর্ত দেওয়া হয়েছে, তা সাধারণ লেবানিজ, যুদ্ধাপরাধের শিকার মানুষ এবং আন্তর্জাতিক আইনের সমর্থকদের জন্য উদ্বেগের কারণ হওয়া উচিত।
সামরিক দিক থেকে লেবানন কখনোই ইসরায়েলের সমকক্ষ নয়। তাই তার হাতে টিকে থাকা একমাত্র হাতিয়ার হলো কূটনৈতিক, আইনি ও রাজনৈতিক লড়াই। ‘উত্তেজনা প্রশমন’-এর নামে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) মতো জায়গায় লেবাননের যাওয়ার অধিকার খর্ব করার মানে হলো যেসব ক্ষেত্রে লেবাননের সামান্য হলেও প্রভাব খাটানোর সুযোগ ছিল, সেখানেই রাষ্ট্রকে একেবারে নিরস্ত্র করে দেওয়া।

এর পেছনে একটি গভীর সাংবিধানিক সংকটও রয়েছে। তীব্র প্রতিবাদের মুখে পড়ে লেবাননের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী হয়তো একসময় এই দলিলকে একটি ‘বাধ্যতামূলক চুক্তি’ না বলে কেবলই একটি ‘রাজনৈতিক বোঝাপড়া’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু নাম বদলালেই তো আর ভেতরের সত্যিটা বদলে যায় না। এই লেখার বিষয়বস্তু যদি যুদ্ধ ও শান্তি, আঞ্চলিক সীমানা নির্ধারণ, আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা, নিরাপত্তা বাহিনীর মোতায়েন, স্বীকৃতি, সেনা প্রত্যাহার কিংবা লেবাননের আইনি পদক্ষেপের ওপর নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত হয়, তবে একে আর কেবলই ‘কূটনৈতিক নাটক’ বলার সুযোগ থাকে না।

ঠিক এই কারণেই চুক্তিটি যুদ্ধ ঠেকাতে পারছে না। বরং এটি এমন একটি আইনি ও রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করছে, যা দিয়ে আগামী দিনে লেবাননের বিরুদ্ধে নতুন একটি যুদ্ধকে বৈধতা দেওয়া হবে।

সামি হালাবি: বৈরুতভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক বাদিল দ্য অলটারনেটিভ পলিসি ইনস্টিটিউটের পরিচালক; আলজাজিরা থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম

আরও পড়ুন

×