ঢাকা শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬

পাবলিক পরীক্ষা

অকৃতকার্য কমাতে চাই পরীক্ষাব্যবস্থার সংস্কার

অকৃতকার্য কমাতে চাই পরীক্ষাব্যবস্থার সংস্কার
×

মাহবুবুর রাজ্জাক

মাহবুবুর রাজ্জাক

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬ | ০৮:২৮ | আপডেট: ০৩ জুলাই ২০২৬ | ১১:২৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হয়েছে। সব শিক্ষা বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া হবে বলে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন। এটি একটি ভালো সিদ্ধান্ত। এতদিন শিক্ষা বোর্ডভেদে প্রশ্নপত্রের ভিন্নতা এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে নীতিগত ভিন্নতার কারণে বিভিন্ন বোর্ডের পাসের হারের মধ্যে তারতম্য দেখা যেত। কোনো কোনো বোর্ডের ক্ষেত্রে পাসের হার এতটাই কম হতো, সেই বোর্ডের ছাত্রদের প্রতি বৈষম্য করা হয়েছে কিনা– এ প্রশ্নও শোনা যেত। সব বোর্ডে একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হলে সেই অভিযোগ নিশ্চয় কমবে। 

তবে মনোযোগ দেওয়ার মতো আরও বিষয় আছে। যেমন– ফল বিপর্যয়। পাবলিক পরীক্ষায় মাঝেমধ্যে ফল বিপর্যয় কেন হবে? এটি শিক্ষার্থীদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। অতীতে রাজনৈতিক কারণে ‘শিক্ষায় উন্নয়ন’ কৃত্রিমভাবে প্রদর্শনের জন্য ইচ্ছাকৃত ভালো ফল দেখানোর প্রয়োজন হতো। এতে পাসের হারই শুধু বাড়িয়ে দেখানো হতো না; জিপিএ ৫ প্রাপ্ত ছাত্রদের সংখ্যাও বাড়িয়ে দেখানো হতো। এক সময় জিপিএ ৫ প্রাপ্ত ছাত্রের সংখ্যা এতই বেড়ে গিয়েছিল, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধার ভিত্তিতে ছাত্র ভর্তি করা কঠিন হয়ে উঠেছিল। ফল ভালো দেখানোর জন্য নকলের সুযোগ দেওয়া হতো; প্রশ্নপত্র ফাঁস হতো।

শুধু তাই নয়। শোনা যায়, উত্তরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে নমনীয়তা প্রদর্শনের নির্দেশও দেওয়া হতো। 

জুলাই অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার এসে প্রকৃত মূল্যায়ন করতে গিয়ে দেখা গেল বিরাট ফল বিপর্যয়। পাসের হার কমলো। জিপিএ ৫ কমলো। বর্তমান সরকার এসে বলল– আর নকল চলবে না। আনন্দের বিষয়, সরকার পরীক্ষায় নকল দূর করার ব্যাপারে ছাত্র-শিক্ষক সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছে। তবে ফল বিপর্যয় কাটাতে কতটা সক্ষম হবে?  

পাবলিক পরীক্ষায় অকৃতকার্য ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা অনেক বড়। যে শিক্ষাব্যবস্থায় এত বড় আকারে ফল বিপর্যয় ঘটে, সেই শিক্ষাব্যবস্থা অবশ্যই ত্রুটিপূর্ণ। ১০-১২ বছর পড়াশোনার পর এই যে লাখে লাখে ফেল, তার দায় কি শুধুই ছাত্রছাত্রীর? পাবলিক পরীক্ষার আসল উদ্দেশ্য কী? শুধুই ছাত্রছাত্রীর মেধা যাচাই? নাকি যার যার মেধাগত অবস্থানের ভিত্তিতে শ্রমবাজারের জন্য প্রস্তুত করে দেওয়া?

যাই হোক, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ফল বিপর্যয়ের অভিশাপ দূর করতে হবে। এ জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পেশ করছি। প্রথম প্রস্তাব, গ্রেড বাউন্ডারি এখনকার মতো সুনির্দিষ্ট না রেখে প্রয়োজন অনুযায়ী সমন্বয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। কোনো কোনো বছরের পরীক্ষার প্রশ্ন অন্যান্য বছরের প্রশ্নের তুলনায় কঠিন হতে পারে। বর্তমান গ্রেডিং পদ্ধতিতে যেই ছাত্র তিন-চার বছর আগে পরীক্ষা দিলে জিপিএ ৫ পেতে পারত; প্রশ্ন কঠিন হলে সেই ছাত্রটি এবার পরীক্ষা দিয়ে পাস নাও করতে পারে। পরীক্ষার গ্রেড নির্ধারণের সময় এ বিষয়টি মাথায় না রাখলে অন্যায় হবে। যদি সাধারণ অবস্থায় শতকরা ৮০ নম্বরের ওপরে পেলে ‘এ+’ গ্রেড দেওয়া হয়; প্রশ্ন কঠিন হয়ে থাকলে শতকরা ৮০ নম্বরের সামান্য কম পেলেও ‘এ+’ গ্রেড দেওয়া যেতে পারে। মার্কশিটে গ্রেডের সঙ্গে প্রাপ্ত প্রকৃত নম্বর উল্লেখ করে দিলেই বোঝা যাবে পরীক্ষায় প্রশ্ন কঠিন হয়েছে। 

দ্বিতীয় প্রস্তাব, বিভিন্ন বিষয়কে সিলেবাসের দৈর্ঘ্য অনুযায়ী কয়েকটি ছোট ছোট মডিউলে ভাগ করে দিতে হবে। এখনকার মতো অনেক বিষয়ের সব পরীক্ষা একসঙ্গে দেওয়া এবং একসঙ্গে পাস করার বাধ্যবাধকতা উঠিয়ে দিতে হবে। তৃতীয় প্রস্তাব, পাবলিক পরীক্ষাগুলো দুই বছর শেষে না নিয়ে ছয় মাস পরপর নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। কেউ সমর্থ হলে সব কটি মডিউলের পরীক্ষা একবারেই দিতে পারে। আবার কেউ চাইলে একাধিকবার কয়েকটি মডিউল করে ধাপে ধাপে পরীক্ষা দিতে পারবে। কোনো মডিউলে খারাপ করলে ছয় মাস পরই আবার পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পাওয়া যাবে। দুই বছর ধরে ঢাউস সিলেবাসের অনেক বিষয় একসঙ্গে পড়ে একবারে পরীক্ষা দিলে মেধার পরীক্ষা হয় না; মুখস্থ বিদ্যার পরীক্ষা হয়।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে মুখস্থ বিদ্যাকে বিদায় জানানো দরকার। উচ্চ মাধ্যমিকে অনেক বিষয় যেমন– পদার্থবিজ্ঞান বিষয় দুই বছর পড়াশোনার পর দুই ভাগে পরীক্ষা দিতে হয়। এটিকে যদি চারটি মডিউলে ভাগ করে চারবারে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া যায়, তবে শিক্ষার্থীদের ওপর মুখস্থ করার চাপ কমে আসবে।    
সর্বশেষ প্রস্তাব হলো পাবলিক পরীক্ষায় সনদ পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়ের সংখ্যা কমিয়ে আনতে হবে।

ইংলিশ মিডিয়ামে কেউ চাইলে সর্বনিম্ন ৩টি বিষয় পাস করেই উচ্চ মাধ্যমিক (এ লেভেল) সনদ লাভ করতে পারে। অতিরিক্ত বিষয় পাস করলে তার ক্যারিয়ার অপশন বেশি থাকে। কেউ পদার্থ, গণিত ও রসায়নে পাস করলেই প্রকৌশলে ভর্তি হতে পারে। তবে অতিরিক্ত হিসেবে জীববিজ্ঞানে পাস করলে মেডিকেল এবং বিজ্ঞানের আরও অনেক শাখায় ভর্তির সুযোগ উন্মুক্ত থাকে। তাই উচ্চ মাধ্যমিক বিজ্ঞানের কোনো ছাত্র যদি পদার্থ, গণিত, রসায়ন ও জীববিজ্ঞান নিয়ে গণিতে বা জীববিজ্ঞানে পাস করতে না পারে তাকে পুরাপুরি ফেল করিয়ে দেওয়ার মানে হয় না। যে কয়টি বিষয়ে সে পাস করেছে তা যদি সনদ পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সর্বনিম্ন বিষয় সংখ্যার সমান হয় তবে তাকে সনদ দেওয়া যায়। যার যার মেধাগত সামর্থ্যের ভিত্তিতে তাকে শ্রমবাজারের জন্য প্রস্তুত করে দেওয়াই ভালো। পাখি আকাশে উড়তে পারে; পাখিকে ওড়ার সনদ দিন। মাছ আকাশে ওড়ে না; সাঁতার কাটে। তাকে সাঁতার কাটার সনদ নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিন।        

ড. মাহবুবুর রাজ্জাক: অধ্যাপক, যন্ত্রকৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-বুয়েট

আরও পড়ুন

×