রাজনৈতিক কারণে খুন
সহিংসতার দুষ্টচক্র ভাঙ্গিতে হইবে
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩২
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশে চলতি বৎসরের প্রথম সাড়ে পাঁচ মাসে প্রায় পাঁচ ডজন রাজনৈতিক নেতাকর্মী খুন হইবার খবর উদ্বেগজনক। বুধবার প্রকাশিত সমকালের শীর্ষ প্রতিবেদনে আরও দেখা যাইতেছে, ইহাদের মধ্যে সিংহভাগই ক্ষমতাসীন দল বিএনপির নেতাকর্মী। দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সহিংসতা নূতন না হইলেও সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক নেতাকর্মী হত্যার ঘটনা যেইভাবে বৃদ্ধি পাইয়াছে, উহা উপেক্ষার অবকাশ নাই। এহেন প্রাণহানি একই সঙ্গে গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং জননিরাপত্তার জন্য অশনিসংকেত।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান ও সমকালের নিজস্ব তথ্য বিশ্লেষণে উঠিয়া আসিয়াছে, দলীয় কোন্দল এবং অন্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সহিত সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনায়ই সর্বাধিক প্রাণ হারাইয়াছেন। এই সকল প্রাণহানি প্রমাণ করিতেছে রাজনীতিতে স্বার্থের দ্বন্দ্ব কতটা প্রকট হইয়া উঠিয়াছে। স্থানীয় বিরোধ কিংবা জমি ও পারিবারিক দ্বন্দ্বে প্রাণহানিও বেদনাদায়ক। আমরা মনে করি, রাজনৈতিক মতভেদ বা ক্ষমতার প্রতিযোগিতার পরিণতি কখনও প্রাণহানি হইতে পারে না।
প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা হইতে পারে যুক্তি, জনসমর্থন কিংবা নির্বাচনের মাধ্যমে। সেইখানে অস্ত্র, হামলা এবং হত্যা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নহে। সবচাইতে হতাশাজনক বিষয় হইল, স্বীয় দলের নেতাকর্মীদের কোন্দলে পারস্পরিক প্রাণহানি। পরিসংখ্যানে যেমনটা উঠিয়া আসিয়াছে, সাড়ে পাঁচ মাসের মধ্যে নিহত ৫৯ রাজনৈতিক নেতাকর্মীর মধ্যে ৪৫ জনই বিএনপির নেতাকর্মী। একই দলের হইয়াও স্বার্থ, পদ-পদবি, দলীয় পরিচয় ব্যবহার করিয়া টাকা উপার্জনের ন্যায় বিষয়ে বিরোধের কারণেই কোন্দল দেখা যায়, যাহা সহিংসতায় গড়ায়। এই রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন বন্ধ করিতে সুস্থ ধারার রাজনীতির বিকল্প নাই।
সাড়ে পাঁচ মাসের রাজনৈতিক খুনের সংখ্যা স্পষ্ট করিতেছে, দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ অস্থির ও সহিংস হইয়া উঠিতেছে। ইহার সহিত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সংযোগও অস্পষ্ট নহে। সাম্প্রতিক সময়ে খুন, ছিনতাই, সহিংসতা কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসিতেছে না। মব সহিংসতা ও শিশু নির্যাতনের অঘটনা বাড়িয়াছে উদ্বেগজনক হারে। বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নিরাপত্তা বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যুও থামিয়া নাই। দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনিতে না পারিলে রাজনৈতিক খুন ও হানাহানি বন্ধ করাও কঠিন হইবে।
আমরা দেখিয়াছি, রাজনৈতিক সহিংসতার অধিকাংশ ঘটনার বিচার প্রলম্বিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে মামলা হয়, গ্রেপ্তারও হয়; কিন্তু দীর্ঘসূত্রতা, প্রভাব কিংবা তদন্তের দুর্বলতার কারণে বিচার প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হইয়া পড়ে। ইহার ফলে অপরাধীদের মধ্যে দায়মুক্তির সংস্কৃতি গড়িয়া ওঠে এবং সহিংসতা আরও উৎসাহিত হয়। ইহার সহিত স্বীয় দল হইতে দায়মুক্তি দেওয়া হইলে রাজনীতির নামে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হইয়া পড়ে।
এই ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলসমূহের কঠোর হইবার বিকল্প নাই। দলের নাম ব্যবহার করিয়া কেহ যাহাতে ব্যক্তিগত স্বার্থে সন্ত্রাস, দখলদারিত্ব বা প্রতিশোধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়াইয়া না পড়ে তজ্জন্য পূর্বেই দল হইতে কঠোর অবস্থান জানান দিতে হইবে। খুনাখুনি, সহিংসতা কিংবা যেই কোনো অপরাধে দলীয়ভাবেও তাহার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান লইতে হইবে। কেবল সাময়িক বহিষ্কার বা দায় এড়াইবার বিবৃতি দিয়া দায়িত্ব শেষ হয় না। রাজনৈতিক সংগঠনসমূহকেই প্রমাণ করিত হইবে যে তাহারা সহিংসতা নহে, শান্তির রাজনীতির পক্ষে।
রাজনীতির উদ্দেশ্য মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করা, প্রাণের সুরক্ষা, প্রাণ কাড়িয়া লওয়া নহে। সেইজন্য রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধে সরকার, রাজনৈতিক দল, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং নাগরিক সমাজ–সকলের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রতিটি হত্যার নিরপেক্ষ তদন্ত, দ্রুত বিচার এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতির অবসানই রাজনৈতিক সহিংসতার এই দুষ্টচক্র ভাঙ্গিতে পারে। এইখানে সরকারি দল হিসেবে বিএনপির দায়িত্ব অধিক হইলেও বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী দায় এড়াইতে পারে না। ইহার সহিত কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকেও দেশের আইনশৃঙ্খলার প্রতি শ্রদ্ধা দেখাইতে হইবে।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়
