ঢাকা শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬

চারদিক

যাদুকাটা নদী সুরক্ষায় করণীয়

যাদুকাটা নদী সুরক্ষায় করণীয়
×

রাসেল আহমদ

প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের উচ্চ আদালত দেশের সব নদীকে জীবন্ত সত্তা বা জুরিস্টিক (লিগ্যাল) পারসন হিসেবে ঘোষণা করেছেন। অর্থাৎ নদী কেবল রাষ্ট্রের সম্পদ নয়; আইনের দৃষ্টিতেও তার স্বতন্ত্র সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু আইনের এই স্বীকৃতি বাস্তবে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে, তার উত্তর খুঁজতে গেলে সুনামগঞ্জের আন্তঃসীমান্ত নদী যাদুকাটার দিকে তাকালেই গভীর উদ্বেগের জন্ম দেয়। অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলন, নদীতীর ধ্বংস, দুর্বল নজরদারি এবং দীর্ঘদিনের ত্রুটিপূর্ণ সম্পদ ব্যবস্থাপনার ফলে নদীটি ক্রমেই অস্তিত্ব সংকটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরে যাদুকাটা হাজারো শ্রমজীবী মানুষের জীবিকার উৎস। একসময় স্থানীয় মানুষ হাতে বেলচা, ঝুড়ি ও নৌকা ব্যবহার করে সীমিত পরিসরে বালু-পাথর সংগ্রহ করতেন। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হতো না, আবার মানুষের কর্মসংস্থানও টিকে থাকত। সময়ের সঙ্গে সেই শ্রমনির্ভর ব্যবস্থা জায়গা ছেড়ে দেয় যন্ত্রনির্ভর বাণিজ্যিক আহরণকে। ড্রেজার, বোমা মেশিন ও শ্যালো মেশিনের মাধ্যমে অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। ফলে নদীর তলদেশের স্বাভাবিক গঠন বদলে যাচ্ছে, তীরের স্থিতিশীলতা নষ্ট হচ্ছে এবং ভাঙনের ঝুঁকি বাড়ছে।

সাম্প্রতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আরও উদ্বেগজনক তথ্য। অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত এলাকার বাইরে রাতের অন্ধকারে শতাধিক ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন চলছে। বালু উত্তোলনের সঙ্গে হাজারো মানুষের জীবিকা জড়িত। তাই সমাধান কখনোই সব ধরনের উত্তোলন বন্ধ করে দেওয়া নয়। তেমন সিদ্ধান্ত বাস্তবসম্মতও হবে না, সামাজিকভাবেও গ্রহণযোগ্য হবে না। প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থাপনা, যেখানে বৈধ, নিয়ন্ত্রিত ও পরিবেশসম্মত উপায়ে সম্পদ আহরণ হবে এবং একই সঙ্গে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশগত সক্ষমতা অক্ষুণ্ন থাকবে। উন্নয়ন ও পরিবেশকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখার সময় অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে। এখন প্রয়োজন এমন নীতি, যেখানে মানুষের জীবিকা ও প্রকৃতির সুরক্ষা একই কাঠামোর অংশ হয়ে ওঠে।

নদীকে মুনাফাকেন্দ্রিক শোষণের ক্ষেত্র নয়, বরং রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষিত প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে পরিচালনা করা দরকার। সরকারিভাবে বালু-পাথর সংগ্রহকেন্দ্র স্থাপন করে শ্রমজীবী মানুষকে হাতে বেলচা, ঝুড়ি ও নেটের মতো সনাতনী পদ্ধতিতে সীমিত পরিসরে আহরণের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। পরে সরকার নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী অনুমোদিত ব্যবসায়ীদের কাছে সেই বালু-পাথর বিক্রি করবে। ব্যবসায়ীরা নির্ধারিত ভ্যাট, কর ও রয়্যালটি পরিশোধ করে বৈধভাবে তা সংগ্রহ করবেন। এতে একদিকে যেমন সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য কমতে পারে, অন্যদিকে সরকারও আরও স্বচ্ছভাবে রাজস্ব আদায় করতে সক্ষম হবে। অবশ্য এই প্রস্তাব বাস্তবায়নের আগে এর অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক ও আইনগত সম্ভাব্যতা নিয়ে বিস্তৃত মূল্যায়ন প্রয়োজন।

একই সঙ্গে কয়েকটি বিষয় এখন আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ড্রেজার, বোমা মেশিন ও শ্যালো মেশিনের অবৈধ ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। নদীতীর কেটে বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে। শ্রমিকদের জিম্মি করে রাখা সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে হবে এবং আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি প্রকৃত শ্রমজীবী মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা, বিকল্প কর্মসংস্থান এবং প্রয়োজন হলে মৌসুমি সহায়তা কর্মসূচির কথাও ভাবতে হবে। কারণ নদী রক্ষার নীতি তখনই কার্যকর হয়, যখন তা মানুষের জীবন-জীবিকার বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।

তবে যাদুকাটাকে রক্ষায় এখন প্রয়োজন একটি সমন্বিত রাষ্ট্রীয় কর্মপরিকল্পনা। নদীর পুরো প্রবাহের পরিবেশগত মূল্যায়ন করে কোথায়, কতটুকু এবং কোন মৌসুমে বালু উত্তোলন করা যাবে, তার বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড নির্ধারণ করতে হবে। যাদুকাটা নদীর প্রকৃত মূল্য ইজারার অঙ্কে নির্ধারিত হতে পারে না; তার মূল্য নির্ধারিত হবে শ্রমজীবী মানুষের প্রথাগত অধিকার প্রতিষ্ঠায়, কৃষিজমি রক্ষায়, মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণে, জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখতে এবং তীরবর্তী জনপদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার সক্ষমতায়।

রাসেল আহমদ: সাংবাদিক 

আরও পড়ুন

×