আন্তর্জাতিক
মামদানি-প্রভাব মার্কিন রক্ষণশীলতার প্রাচীর ভাঙতে পারবে?
শশী থারুর
প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩১
| প্রিন্ট সংস্করণ
২০২৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত নিউইয়র্কের সাম্প্রতিক কংগ্রেসের প্রাথমিক নির্বাচন জাতীয় ডেমোক্রেটিক শিবিরের নীতিনির্ধারকদের মনে তীব্র ঝাঁকুনি দিয়েছে। এটি কোনো সাধারণ স্থানীয় পরিবর্তন নয়, বরং এটি একটি বড় রাজনৈতিক মেরূকরণের স্পষ্ট ইঙ্গিত। মেয়র মামদানির সমর্থনপুষ্ট ‘ডেমোক্রেটিক সোশালিস্ট’দের একটি প্রগতিশীল প্যানেল ড্যান গোল্ডম্যান এবং আদ্রিয়ানো এসপাইয়াতের মতো দীর্ঘদিনের ক্ষমতাশালী ও প্রতিষ্ঠিত হেভিওয়েট প্রার্থীদের পরাজিত করে এক নজিরবিহীন জয় ছিনিয়ে নিয়েছে। ভারতীয়দের কাছে বিষয়টি বাড়তি আগ্রহের কারণ ছিল, যেহেতু তাদেরই একজন–কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতা মীরা নায়ারের ছেলে–নিউইয়র্কের সবচেয়ে ক্ষমতাধর পদের জন্য লড়ছেন। তবে এর পাশাপাশি নিউইয়র্ক রাজ্যের রাজনীতিতে তিনি যে ব্যাপক প্রভাব ফেলছেন, সেদিকেও ভারতীয়দের নজর দেওয়া উচিত।
এই চূড়ান্ত বিজয় গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী দারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ের এবং ক্লেয়ার ভালদেজের পাশাপাশি তাদের বামপন্থি মিত্র ব্র্যাড ল্যান্ডারকে কংগ্রেসের পথে অনেকটাই এগিয়ে দিয়েছে। নিউইয়র্কে ডেমোক্রেটিক প্রাথমিক পর্বে জেতার মানে হলো মূল নির্বাচনে জয় প্রায় নিশ্চিত। কারণ এখানকার সিংহভাগ ভোটারই ডেমোক্র্যাটপন্থি। এই নিরঙ্কুশ জয় প্রমাণ করে যে, নিউইয়র্কের গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন এখন আর সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের ভেতরে থাকা কোনো বিদ্রোহী উপদল মাত্র নয়; বরং তারা শহরের ডেমোক্র্যাট ভোটারদের প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নিতে পেরেছে।
এই তিনটি প্রাইমারির ফলাফল হাউস ডেমোক্রেটিক লিডার হাকিম জেফ্রিজের মতো বড় বড় দলীয় নেতার জন্য একটি বড় ধাক্কা, যিনি এই বর্তমান মধ্যপন্থি এমপিদের পক্ষে জোরেশোরে প্রচারণা চালিয়েছিলেন। একই সঙ্গে এই ফলাফল আগামী নভেম্বরের জাতীয় মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে দলের ভেতরের এক গভীর আদর্শিক ফাটলকে প্রকাশ্যে এনেছে।
তা ছাড়া এই প্রাথমিক চ্যালেঞ্জগুলোর একটি কেন্দ্রীয় ভিত্তি ছিল গাজা যুদ্ধে ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির তীব্র বিরোধিতা। তাই এই বিজয়গুলো দেখায় যে প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়েও পররাষ্ট্রনীতি অতি ঘনবসতিপূর্ণ শহুরে এলাকায় ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে টানতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। গাজা ও ইরানের যুদ্ধ–দুটিই মার্কিন জনগণের কাছে জনপ্রিয় ছিল না, কিন্তু মার্কিন ভোটাররা সাধারণত ভোটদানকালে পররাষ্ট্রনীতির কথা মাথায় রাখেন না। তবে এবার তারা মার্কিন সমর্থনকে তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, ‘আমার নামে এই যুদ্ধ চলবে না’। অবশ্যই অভ্যন্তরীণ ইস্যুগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ভোটাররা মূলত জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং জননিরাপত্তার সংকটের মুখোমুখি হয়ে তীব্র অর্থনৈতিক হস্তক্ষেপের একটি নীতিকে বেছে নিয়েছেন। বিজয়ী প্যানেলটি মূলত আবাসন সুরক্ষা সামনে রেখে জনসমর্থন আদায় করেছে; যার মধ্যে ছিল ভাড়ানিয়ন্ত্রিত বাড়িগুলোর ভাড়া বৃদ্ধি স্থগিত করা, বিনা কারণে উচ্ছেদ প্রতিরোধে ‘গুড কজ’ আইন করা এবং পাবলিক হাউজিং বা সরকারি আবাসনে ব্যাপক বিনিয়োগ। আবাসনের এই উদ্যোগগুলোর সঙ্গে তারা অর্থনৈতিক স্বস্তির প্রতিশ্রুতিও যোগ করেছিল। যেমন– ২০৩০ সালের মধ্যে ন্যূনতম মজুরি বাড়িয়ে ঘণ্টায় ৩০ ডলার করা।
এসব জনকল্যাণমূলক কাজের অর্থ জোগাতে তারা করপোরেশন এবং বছরে ১০ লাখ ডলারের বেশি আয় করা ব্যক্তিদের ওপর চড়া কর আরোপের প্রস্তাব করেছে। একই সঙ্গে তারা জননিরাপত্তার কাঠামোগত সংস্কার এবং অভিবাসন ও কাস্টমস প্রয়োগকারী সংস্থা (আইসিই) বিলুপ্ত করার অঙ্গীকার করেছে। ডেমোক্রেটিক এস্টাবলিশমেন্ট বা মূলধারার নেতারা এই ধরনের নীতি মেনে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। এসপাইয়াত এবং গোল্ডম্যানের মতো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যক্তিত্বদের উৎখাত করে প্রগতিশীল ভোটাররা দাবি তুলেছেন–কারা তাদের প্রতিনিধিত্ব করবেন এবং কী কাজ করবেন, তার সম্পূর্ণ কাঠামোগত পরিবর্তন দরকার।
এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট অতীত ধারাবাহিকতা রয়েছে, যা অতীতের রাজনৈতিক বিদ্রোহকে আজকের বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেয়। ২০১৮ সালে আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্তেজের (এওসি) চমকপ্রদ বিজয় ছিল এই ধারার প্রথম ইঙ্গিত। তিনি মার্কিন জাতীয় রাজনীতিতে সমাজতন্ত্রের পুনরুত্থানের রূপরেখা ও ভাষা তৈরি করে দিয়েছিলেন। আর প্রমাণ করেছিলেন যে, সুস্পষ্ট গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক আদর্শ নিয়ে গড়ে ওঠা একটি সুসংগঠিত তৃণমূল প্রচারণা অনায়াসে একজন শক্তিশালী নেতাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারে। তবে ২০২৫ সালে মেয়র জোহরান মামদানির অভাবনীয় বিজয় ছিল সেই প্রাতিষ্ঠানিক চালিকাশক্তি, যা সমাজকর্মী ও কর্মীদের একটি শিথিল জোটকে এক সুশৃঙ্খল ও শক্তিশালী শাসনযন্ত্রে রূপান্তর করেছে।
শশী থারুর: ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী; দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম
- বিষয় :
- আন্তর্জাতিক
