জনপ্রশাসন
চারটা পর্যন্ত অফিস সময় স্থায়ী হয়ে গেল?
এম এম মুসা
এম এম মুসা
প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২২ | আপডেট: ১৪ জুলাই ২০২৬ | ০৯:৫২
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ২ এপ্রিল মন্ত্রিসভার বৈঠকে সরকারি ও বেসরকারি– উভয় ধরনের অফিসের কার্যসময় ১ ঘণ্টা কমিয়ে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা নির্ধারণ করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এর আগে অফিসের সময় ছিল সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে অফিস সময় সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা এবং গ্রাহক লেনদেনের সময় সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৩টা নির্ধারণ করা হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল– এই সময়সূচি ‘পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত’ বলবৎ থাকবে। অর্থাৎ শুরু থেকেই এ সিদ্ধান্তে কোনো সুনির্দিষ্ট মেয়াদ বা স্বয়ংক্রিয় পর্যালোচনা-তারিখ যুক্ত ছিল না।
তিন মাসের অধিক সময় পর, মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সংকট তুলনামূলক প্রশমিত হওয়ায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে তাদের পূর্ববর্তী ৮ ঘণ্টার (সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা) কর্মসূচিতে ফিরে গেলেও সরকারি অফিসগুলো এখনও বিকেল ৪টা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ।
এর প্রত্যক্ষ অর্থনৈতিক পরিণতি হলো ব্যবসায়ী ও নাগরিকদের ক্ষতি। বেসরকারি খাত সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা (৮ ঘণ্টা) সক্রিয় থাকলেও ভূমি নিবন্ধন অফিস, আয়কর সার্কেল, ভ্যাট অফিস, যৌথ মূলধনি কোম্পানি ও ফার্মগুলোর নিবন্ধক (আরজেএসসি), কাস্টম হাউস কিংবা উপজেলা ভূমি অফিসের মতো প্রতিষ্ঠান; যা কেবল সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা (৭ ঘণ্টা) পর্যন্ত সচল থাকে, সেখানে একজন ব্যবসায়িক প্রতিনিধিকে নিজের প্রতিষ্ঠান পরিচালনার পাশাপাশি সরকারি কার্যক্রমও ৭ ঘণ্টার মধ্যে সম্পন্ন করতে হয়। ফলে যাতায়াত, লাইন ও কাগজপত্র প্রক্রিয়াকরণের সময় বাদ দিলে কার্যকর উৎপাদনশীল সময় আরও সংকুচিত হয়ে পড়ে, যা দালাল-নির্ভরতা ও অনানুষ্ঠানিক মধ্যস্থতাকারীর ওপর নির্ভরতা বাড়িয়ে দেয়।
২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসনের ফলে সৃষ্ট ইউরোপীয় জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাউন্সিল বিদ্যুৎ ব্যবহার হ্রাসের যে জরুরি প্রবিধান গ্রহণ করেছিল, তাতে স্পষ্টভাবে একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ উল্লেখ ছিল– ১ ডিসেম্বর ২০২২ থেকে ৩১ মার্চ ২০২৩ পর্যন্ত। অর্থাৎ সংকট মোকাবিলার ব্যবস্থাটি শুরু থেকেই একটি সুনির্দিষ্ট মেয়াদান্তে আবদ্ধ, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংকট প্রশমিত হওয়ার পর ব্যবস্থাটি প্রত্যাহারের নিশ্চয়তা দেয়। এর বিপরীতে বাংলাদেশের প্রজ্ঞাপনে ব্যবহৃত ‘পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত’ শব্দবন্ধ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দুর্বল একটি কাঠামো তৈরি করে, যেখানে প্রত্যাহারের দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে প্রশাসনের সক্রিয় উদ্যোগের ওপর নির্ভরশীল। এ উদ্যোগ নেওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক প্রণোদনা দুর্বল।
এখন প্রশ্ন হলো, কেন বেসরকারি খাত ফিরে গেল, কিন্তু সরকারি খাত ফিরল না? এর একটা কারণ হলো, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছে হিসাব পরিষ্কার। প্রতিষ্ঠান কম সময় চললে তার নিজের লাভ কমে যায়। তাই সংকট কমার সঙ্গে তিনি দ্রুত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন। কিন্তু সরকারি অফিসের বেলায় এমন কোনো সরাসরি চাপ নেই। কর্মঘণ্টা কম থাকলে সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত কোনো ক্ষতি হয় না। বরং তাদের জন্য এ ব্যবস্থা কিছুটা আরামদায়কও। তাই এ নিয়ম বদলানোর কোনো তাড়া কারও মধ্যে নেই।
আরেকটা কারণ হলো, প্রথম ঘোষণাতেই কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদ বলা হয়নি। শুধু বলা হয়েছিল, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এ নিয়ম চলবে। অর্থাৎ কবে এই নিয়ম বদলাবে, তা আগে থেকে ঠিক করা ছিল না। এমন নিয়ম একবার চালু হলে তা বদলাতে অনেক সময় লেগে যায়। কারণ এটা বদলানোর কেউ নির্দিষ্ট করে দায়িত্ব নেয় না।
যাদের হাতে সময় কম, টাকা কম, তাদের জন্য এ সমস্যা সবচেয়ে বেশি। একজন গার্মেন্টস কর্মী, দোকান কর্মচারী, দিনমজুর– বেশির ভাগেরই অফিস থেকে ছুটি নেওয়ার সুযোগ কম। এই চাপে পড়ে অনেকে বাধ্য হন দালালের সাহায্য নিতে। দালালকে বাড়তি টাকা দিতে হয়। এভাবে দুর্নীতির একটা সুযোগ তৈরি হয়। যাদের হাতে টাকা আছে, তাদের জন্য সমস্যা কম। তারা লোক পাঠিয়ে, পরিচিত মানুষের মাধ্যমে দ্রুত কাজ করিয়ে নিতে পারেন।
এটা পরিষ্কার করে বলা দরকার, জ্বালানি বাঁচানোর সিদ্ধান্তটা ভুল ছিল না। সংকটের সময় এমন সিদ্ধান্ত প্রয়োজনীয় বটে। সমস্যা হলো সিদ্ধান্তটা প্রত্যাহারের সময় নিয়ে। সংকট কমে গেছে। বেসরকারি খাত ফিরেও গেছে আগের কর্মঘণ্টায়। কিন্তু সরকারি খাত এখনও আগের জায়গায় রয়ে গেছে। এ ফারাকটাই আসল সমস্যা।
এখন উচিত হলো সরকারি অফিসও বেসরকারি খাতের মতো আগের নিয়মে ফিরিয়ে আনা। অর্থাৎ সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা। এতে মানুষের ভোগান্তি কমবে। দ্বিতীয় পথ হলো, যদি সময় কম রাখতেই হয়, তাহলে অনলাইনে সেবা বাড়িয়ে দেওয়া। যেমন জন্মনিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, কর দেওয়া– এসব কাজ যদি ঘরে বসে অনলাইনে করা যায়, তাহলে অফিসে গিয়ে লাইনে দাঁড়াতে হবে না। অফিসের সময় কম হলেও মানুষের সমস্যা কম হবে। ভবিষ্যতে এমন সমস্যা এড়াতে আগেই সময় ঠিক করা উচিত হবে।
সবশেষে বলা যায়, এক ঘণ্টার ফারাক দেখতে সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু এর প্রভাব অনেক বড়। ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ এর ভুক্তভোগী এবং এটি দুর্নীতির পথ প্রশস্ত করছে। তাই একে আর ছোট করে দেখার অবকাশ নেই। সরকারের উচিত দ্রুত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া।
এম এম মুসা: উন্নয়নকর্মী ও গবেষক
- বিষয় :
- জনপ্রশাসন