ঢাকা সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬

আন্তর্জাতিক

চীনের নতুন ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার বৈশ্বিক বার্তা

চীনের নতুন ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার বৈশ্বিক বার্তা
×

হাও নান

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ | ০৭:১৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

গত ৬ জুলাই চীনের একটি কৌশলগত পারমাণবিক সাবমেরিন প্রশান্ত মহাসাগরের সুনির্দিষ্ট এক জায়গায় একটি ডামি যুদ্ধাস্ত্রবাহী ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। বেইজিং এই উৎক্ষেপণকে ‘নিয়মিত পরীক্ষা’ হিসেবে তুলে ধরেছে। এ ছাড়া তারা জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে এ বিষয়ে আগে থেকেই অবহিত করা হয়েছিল এবং এই পরীক্ষার নিশানা কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্র ছিল না।

তবে চীনের এই পদক্ষেপে আঞ্চলিক বিভিন্ন দেশ তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। অস্ট্রেলিয়া, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলো এই পরীক্ষার বিষয়ে অপর্যাপ্ত তথ্য দেওয়া এবং পরমাণুমুক্ত অঞ্চলবিষয়ক রাজনীতির প্রসঙ্গ টেনে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এসব প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এগুলো এই বার্তা দেয়, পারমাণবিক রাজনীতি এখন আর কেবল পরাশক্তিগুলোর অস্ত্রাগারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং তার চেয়ে অনেক দূর এগিয়ে গেছে।

এই পরীক্ষাকে কয়েকটি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়েছে। প্রথমত, এটি বেইজিংয়ের পারমাণবিক আঘাত পাওয়ার পর পাল্টা আঘাত হানার পরিপক্ব ক্ষমতার প্রমাণ। দ্বিতীয়ত, এটি মার্কিন মিত্র ও সহযোগীদের প্রতি চ্যালেঞ্জ। তৃতীয়ত, এটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত নীতিমালার জন্য সংকট এবং চতুর্থত, এটি সেসব দেশের জন্য একটি প্রচ্ছন্ন বার্তা, যারা ইতোমধ্যে নিজেদের পারমাণবিক নীতি পুনর্মূল্যায়ন করছে। মূলত এই পরীক্ষা পরিবর্তনশীল পারমাণবিক ব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরে।

বর্তমান পারমাণবিক ব্যবস্থা ক্রমশ তিনটি ধারায় রূপ নিচ্ছে। প্রথমটি হলো চীন ও রাশিয়ার কৌশলগত জোট বা সমীকরণ। দ্বিতীয়টি হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ‘সম্প্রসারিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা’। তৃতীয়টি হলো দ্বিতীয় বা আঞ্চলিক স্তরের পারমাণবিক শক্তিধারী, পারমাণবিক সক্ষমতার দ্বারপ্রান্তে থাকা দেশ এবং ‘নিরাপত্তা বলয় নিয়ে উদ্বিগ্ন’ মিত্র দেশগুলোর একটি মিশ্র মধ্যবর্তী স্তর। প্রথম দুটি ধারা যেখানে আরও শক্তিশালী ও কঠোর হচ্ছে, সেখানে তৃতীয় ধারাটি এখনও পরিবর্তনশীল বা নমনীয় রয়ে গেছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন-রাশিয়া জোটের সমীকরণটি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যদিও তাদের পারমাণবিক নীতি ভিন্ন, তবুও ২০১৬ সাল থেকে বেইজিং ও মস্কো ‘কৌশলগত স্থিতিশীলতা’কে কেন্দ্র করে একটি অভিন্ন ধারা তৈরি করেছে। তাদের যৌথ বিবৃতিতে বিশ্বব্যাপী অস্থিতিশীলতার জন্য মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, দূরপাল্লার প্রচলিত হামলা চালানোর সক্ষমতা, ‘অকাস’ (অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের) জোট, মহাকাশের সামরিকীকরণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ‘একচ্ছত্র নিরাপত্তা’ অর্জনের চেষ্টাকে দায়ী করা হচ্ছে।

চীন ও রাশিয়ার মতে, মার্কিন সামরিক জোট, নির্ভুল নিশানা নেটওয়ার্ক, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং বিদেশি সামরিক ঘাঁটিগুলোকে আলোচনার বাইরে রেখে কেবল মোতায়েনকৃত পারমাণবিক অস্ত্রের হিসাব করে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব। চীনের এই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা যেমন দেশটির সমুদ্রভিত্তিক প্রতিশোধমূলক পারমাণবিক হামলার সক্ষমতার নির্ভরযোগ্যতাকে জোরদার করেছে, তেমনি তাদের পারমাণবিক আধুনিকীকরণ যে কেবলই ‘আত্মরক্ষামূলক’– বেইজিংয়ের এই দাবির পক্ষেও সমর্থন দেয়। 
এই কাঠামোর আওতায় রাশিয়া এমন একজন অংশীদার পাচ্ছে, যারা ইউরোপের বাইরেও মার্কিন আধিপত্যের সমালোচনাকে তীব্র করে তুলছে। অন্যদিকে চীন নিজের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা পর্যাপ্ত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার আগে নিজেদের ওপর কোনো পারমাণবিক বাধ্যবাধকতা চাপাতে দিচ্ছে না। তাদের কৌশলগত অবস্থান এখন এক সুতোয় গাঁথা। উভয়েই মার্কিন আধিপত্যের প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার কাঠামো পুনর্নির্ধারণ করতে চায়।

দ্বিতীয় ধারাটি হলো মার্কিন নেতৃত্বাধীন প্রতিরোধ ব্যবস্থা। ওয়াশিংটন যখন তার পারমাণবিক ত্রিভুজের আধুনিকায়ন করছে, তখন তার সবচেয়ে জরুরি কাজ হয়ে পড়েছে মিত্র দেশগুলোকে আশ্বস্ত করা, যাতে তারা নিজস্ব পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে না হাঁটে। ন্যাটোর আওতাধীন পারমাণবিক অস্ত্র ভাগাভাগির চুক্তিটিই এখন পর্যন্ত যৌথ প্রতিরোধের সবচেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। এ ছাড়া তথ্য আদান-প্রদান, পারমাণবিক সংকটকালীন কার্যপ্রণালি এবং প্রচলিত ও পারমাণবিক সক্ষমতার সমন্বয় বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়া একটি ‘পারমাণবিক পরামর্শক দল’ গঠন করেছে।
এই ব্যবস্থা মূলত তৈরি করা হয়েছে মার্কিন মিত্রদের মধ্যে পারমাণবিক বিস্তার রোধ করার জন্য। একই সঙ্গে এটি চীন ও রাশিয়ার উদ্বেগকেও উস্কে দিচ্ছে। ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা, দূরপাল্লার প্রচলিত হামলা সক্ষমতা, কৌশলগত সেনা মোতায়েন, পারমাণবিক পরামর্শ এবং মিত্র দেশগুলোতে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন– এসব বিষয় মার্কিন মিত্রদের আশ্বস্ত করলেও বেইজিং ও মস্কোর কাছে এগুলো একীভূত সামরিক আগ্রাসনের রূপ।

হাও নান: হেলসিঙ্কি জিওইকোনমিকস সোসাইটির সুসান স্ট্রেঞ্জ অ্যাসোসিয়েট ফেলো এবং প্লাউশেয়ার্স ফান্ড ও হরাইজন ২০৪৫-এর নিউক্লিয়ার ফিউচারস ফেলো; সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম

আরও পড়ুন

×