বিচার
প্রস্তাবিত যৌন হয়রানি প্রতিরোধ আইন ও এর চ্যালেঞ্জ
বদরুল হাসান
বদরুল হাসান
প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৫ | আপডেট: ১৮ জুলাই ২০২৬ | ১১:০৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্র এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও সমতাভিত্তিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রথম সুনির্দিষ্ট আইন ‘কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’ প্রণীত হতে যাচ্ছে। এতদিন এই সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের প্রতিকার মূলত উচ্চ আদালতের নির্দেশনা এবং বিদ্যমান বিভিন্ন আইনের নানা বিধানের ওপর নির্ভর করে পরিচালিত হয়ে আসছিল।
আশা করা যায় আইনটি রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের মানসিকতা পরিপক্বতার প্রমাণ দেবে। তবে, একটি জনগুরুত্বপূর্ণ আইনের শক্তি, দুর্বলতা ও ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা তখনই অনুধাবন করা সম্ভব, যখন এর প্রতিটি ধারাকে বাস্তব জীবনের আর্থসামাজিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতার নিরিখে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হবে। জাতীয় সংসদে বিলটি চূড়ান্ত আকারে পাসের আগে অংশীজনের মধ্যে একটি সামগ্রিক পর্যালোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। আশা করা হচ্ছে সংসদ সদস্যগণও এটিকে শেষবারের মতো চুলচেরা বিশ্লেষণ করবেন।
সাধারণত আইন তৈরি হয় সংসদে। এই ক্ষেত্রে যাত্রার মূল ভিত্তিটি রচিত হয়েছিল দেশের সর্বোচ্চ আদালতে। ২০০৯ সালে একটি জনস্বার্থমূলক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ সব কর্মস্থল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘অভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটি’ গঠনের নির্দেশনা জারি করেন। একই সঙ্গে আদালত একটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশনাবলি বা গাইডলাইন প্রণয়ন করে, যা সংসদে আইন পাস না হওয়া পর্যন্ত আইনের মর্যাদায় কার্যকর থাকবে বলে নির্দেশ দেন।
পরে ২০১১ সালে হাইকোর্ট এই সুরক্ষার পরিধিকে আরও বিস্তৃত করে রাস্তাঘাট, গণপরিবহন, স্টেশন, বাজার এবং বিমানবন্দরের মতো উন্মুক্ত জনসমাগম এলাকা এর অন্তর্ভুক্ত করেন। আদালতের এই দুটি নির্দেশনা স্পষ্ট করেছিল যে, যৌন হয়রানি কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত অসদাচরণ নয়, এটি মূলত প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার অসমতা এবং সামাজিক সংস্কৃতির এক জটিল বহিঃপ্রকাশ। ফলে এর প্রতিরোধের দায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের।
বিগত দেড় দশকে দেখা গেছে, এই গাইডলাইনের বাস্তবায়ন ছিল সীমিত। দেশের বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান বা বিদ্যালয়গুলো কমিটি গঠন করলেও, সিংহভাগ সরকারি-বেসরকারি দপ্তর ও কারখানায় এর যথাযথ প্রয়োগ ছিল না। কোনো সংবিধিবদ্ধ তদারকি সংস্থা বা শাস্তিমূলক আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকায় প্রতিপালন ছিল অনেকটা ঐচ্ছিক। প্রস্তাবিত আইনে এর অপরিহার্যতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে আইন প্রতিপালনের বাধ্যবাধকতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
খসড়া আইনটির সবচেয়ে প্রশংসনীয় দিক হলো এর ধারা ২(জ)-এ প্রদত্ত ‘যৌন হয়রানি’র আধুনিক ও গতিশীল সংজ্ঞা। প্রচলিত দণ্ডবিধিতে অপরাধ প্রমাণের জন্য শারীরিক স্পর্শ বা প্রকাশ্য অঙ্গভঙ্গির ওপর অতি-নির্ভরশীলতা ছিল। এই খসড়ায় সেই বৃত্ত থেকে বের হয়ে আসা হয়েছে। নতুন সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো আচরণ যদি কোনো ব্যক্তির জন্য অনিরাপদ, হুমকিস্বরূপ, অস্বস্তিকর, বিব্রতকর বা অপমানজনক পরিবেশ তৈরি করে, তবে সরাসরি কোনো শারীরিক স্পর্শ না ঘটলেও তা যৌন হয়রানি বলে গণ্য হবে।
আইনটির খসড়ায় ‘সার্ভাইভার-কেন্দ্রিক পদ্ধতি’র অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ভুক্তভোগী বা সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির অধিকারকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হচ্ছে। এই পদ্ধতির মূল প্রতিপাদ্য হলো, আইনি লড়াই বা তদন্তের পুরো প্রক্রিয়ায় সার্ভাইভারের নিরাপত্তা, মর্যাদা, গোপনীয়তা এবং অধিকারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান করা। এর মাধ্যমে অভিযোগ প্রক্রিয়া চলাকালীন সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা কঠোরভাবে রক্ষা করা এবং জেন্ডার বা পরিচয় নির্বিশেষে প্রত্যেককে পূর্ণ সম্মান ও সংবেদনশীলতা প্রদর্শনের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
প্রস্তাবিত আইনের দ্বিতীয় অধ্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিকে একটি নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রশাসনিক শাস্তির মুখোমুখি করা হয়েছে। আইন প্রবর্তনের ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে ‘অভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটি’ গঠন করতে হবে। এই কমিটি তদন্ত শেষে অপরাধের মাত্রাভেদে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সতর্কীকরণ, তিরস্কার, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বেতন বৃদ্ধি বা পদোন্নতি স্থগিতকরণ, অভিযুক্তের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করে ভুক্তভোগীকে প্রদান, বাধ্যতামূলক অবসর, চাকরিচ্যুতি কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কারের মতো সুনির্দিষ্ট শাস্তির সুপারিশ করতে পারবে।
আইনে কমিটি সুপারিশ করার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। যদি কোনো প্রতিষ্ঠানপ্রধান বা কর্তৃপক্ষ এই সুপারিশ বাস্তবায়ন না করেন বা গড়িমসি করেন, তবে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং প্রতিষ্ঠানপ্রধানের জন্য আদালত কর্তৃক অর্থদণ্ড অথবা দুই মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এই একটি ধারাই সাধারণ মালিক বা সংস্থাকে আইনটি মানতে বাধ্য করার জন্য যথেষ্ট।
কাগজে-কলমে এই খসড়া আইনটি অত্যন্ত নিখুঁত ও দূরদর্শী মনে হলেও, বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে কিছু বড় ধরনের পদ্ধতিগত ও কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে, যা সংসদ পাস করার আগেই সংশোধন করতে পারে। খসড়া আইনে ২০ জনের কম কর্মী নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানকে অনানুষ্ঠানিক বা অসংগঠিত খাত হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এসব ছোট প্রতিষ্ঠান বা অসংগঠিত খাতে নিজস্ব অভ্যন্তরীণ কমিটি গঠন সম্ভব নয়, তাদের জন্য জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অধীনে ‘স্থানীয় অভিযোগ কমিটি’ গঠনের চমৎকার ধারণাটি মাঠ প্রশাসনের বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে।
আইনটি যাতে কাগজের দলিলে পরিণত না হয়, সেজন্য জাতীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে একটি শক্তিশালী ‘মনিটরিং কমিটি’ গঠনের বিধান এবং আইন অমান্যকারী প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল বা জরিমানার ক্ষমতা দেওয়া অত্যন্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ।
আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে একটি নির্ভরযোগ্য তদারকি, মূল্যায়ন ও রিপোর্টিং কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। এই কাঠামো মূলত কমিটিগুলোর নিয়মিত সক্রিয়তা, সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আইনি দায়িত্ব প্রতিপালন মূল্যায়ন করবে। এটি দীর্ঘমেয়াদে বাস্তবায়নের গুণগত মানোন্নয়নে প্রয়োজনীয় তথ্য ও নির্ভরযোগ্য উপাত্তের জোগান দেবে। একই সঙ্গে, যথাযথ কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও দক্ষ সাড়াদান নিশ্চিত করবে। অতএব, জাতীয় সংসদে বিলটি চূড়ান্তকরণের এই সমসাময়িক ধাপে অংশীজনের উত্থাপিত পর্যবেক্ষণগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বদরুল হাসান: উন্নয়ন ও মানবিক নীতিবিশেষজ্ঞ
[email protected]
- বিষয় :
- মতামত
- যৌন হয়রানি
- আইন