ঢাকা শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে পুশ ইন ও পুশ ব্যাকের পরিণতি

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে পুশ ইন ও পুশ ব্যাকের পরিণতি
×

মো. আবু সালেহ

প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬ | ১৮:২৯

স্বাধীন ও সার্বভৌম দুটি রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমানা সাধারণত পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আন্তর্জাতিক আইন এবং দ্বিপক্ষীয় চুক্তির ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। তবে বাংলাদেশ-ভারত চার হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ সীমান্তজুড়ে দীর্ঘকাল ধরে এমন কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে, যা কেবল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রেই টানাপোড়েন তৈরি করছে না, বরং বৈশ্বিক মানবাধিকারের মানদণ্ডকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে। 

পুশ ব্যাক এমন একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ও আইনবহির্ভূত প্রক্রিয়া, যেখানে এক দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী তাদের ভূখণ্ডে প্রবেশ করা বা প্রবেশ করতে চাওয়া কোনো ব্যক্তিকে কোনো প্রকার আইনি প্রক্রিয়া, নাগরিকত্ব যাচাই বা আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার সুযোগ না দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে জোরপূর্বক পূর্ববর্তী দেশে ফেরত পাঠায়। অন্যদিকে, ‘পুশ ইন’ হলো আরও বেশি আক্রমণাত্মক এবং একতরফা একটি কৌশল। যখন কোনো রাষ্ট্র তার ভূখণ্ডে বসবাসকারী কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে কোনো প্রকার পূর্ব ঘোষণা বা দ্বিপক্ষীয় প্রটোকল ছাড়াই, যাদের তারা অবৈধ বা অবাঞ্ছিত মনে করে; রাতের অন্ধকারে বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করিয়ে প্রতিবেশী দেশের ভূখণ্ডে ঠেলে দেয়, তখন তাকে ‘পুশ ইন’ বলা হয়। পুশ ইনের ক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যায় যে, যাদের পুশ ইন করা হচ্ছে, তারা আদতে কোন দেশের নাগরিক তা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত নয়, অথবা তারা সুদীর্ঘকাল ধরে ওই রাষ্ট্রের ভেতরেই বসবাস করে আসছিল।

সাম্প্রতিক দশকগুলোতে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে, বিশেষ করে আসাম, পশ্চিমবঙ্গ এবং দিল্লির কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে এই ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ’ এবং ‘পুশ ইন–পুশ ব্যাক-এর বিষয়টি একটি ব্যাপক রাজনৈতিক হাতিয়ার বা ভোটের সমীকরণে পরিণত হয়েছে। ভারতের দক্ষিণপন্থি রাজনৈতিক দলগুলো ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী মেরূকরণের স্বার্থে এই ইস্যুটিকে ক্রমাগত জনসমক্ষে নিয়ে আসে। ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) এবং জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) প্রণয়নের পর এই প্রবণতা আরও তীব্র রূপ ধারণ করেছে। জনসভায় দেওয়া আগ্রাসী রাজনৈতিক বক্তব্য বা নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিফলন হিসেবে সীমান্তে বিএসএফ-এর ওপর পুশ ইন ও পুশ ব্যাকের অদৃশ্য রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়। ফলে, মানবতা বা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের চেয়ে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্বার্থই এখানে প্রাধান্য পায়।

সীমান্তে সংঘটিত পুশ ইন এবং পুশ ব্যাকের এই প্রক্রিয়াগুলো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। যেকোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের তার সীমান্ত সুরক্ষার অধিকার থাকলেও, সেই অধিকার কখনোই মানুষের মৌলিক বেঁচে থাকার অধিকার বা মানবিক মর্যাদাকে খর্ব করে কার্যকর হতে পারে না।

আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইন এবং মানবাধিকার সনদের অন্যতম প্রধান ও অলঙ্ঘনীয় ভিত্তি হলো ‘নন-রিফোলমেন্ট’ নীতি। এই আন্তর্জাতিক আইনি নীতি অনুযায়ী, ‘কোনো ব্যক্তিকে বা শরণার্থীকে কোনো অবস্থাতেই এমন কোনো দেশে বা ভূখণ্ডে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো বা বিতাড়িত করা যাবে না, যেখানে তার জীবন, স্বাধীনতা বা মানবাধিকার জাতিগত, ধর্মীয়, জাতীয় বা রাজনৈতিক কারণে ব্যাপক ঝুঁকিতে পড়তে পারে।’

ভারত যদিও ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশনে স্বাক্ষর করেনি, তবুও প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনের অংশ হিসেবে ‘নন-রিফোলমেন্ট’ নীতি মেনে চলতে ভারতের মতো একটি বৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নৈতিক ও আইনিভাবে বাধ্য। যখন বিএসএফ কোনো ব্যক্তিকে পুশ ইন বা পুশ ব্যাক করে, তখন তাকে তার নাগরিকত্ব প্রমাণের কোনো আইনি সুযোগ দেওয়া হয় না। এর ফলে, জাতিগত বা ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে মানুষকে জোরপূর্বক এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়, যা জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা (ইউডিএইচআর)-এর অনুচ্ছেদ ৯ (স্বেচ্ছাচারী আটক বা নির্বাসন থেকে মুক্তি) এবং অনুচ্ছেদ ১৫ (নাগরিকত্বের অধিকার) এর পরিপন্থি। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া মানুষকে গবাদি পশুর মতো সীমান্তে পুশ করা আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থার মুখে এক চপেটাঘাত।

রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক আইনের এই কাঠামোর আড়ালে যে মানবিক বিপর্যয় লুকিয়ে থাকে, তার এক জ্বলন্ত ও নির্মম উদাহরণ তৈরি হয়েছে সম্প্রতি বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের নোম্যান্সল্যান্ডে। ১০ জুন ২০২৬ তারিখ বুধবার ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার কামালপুর সীমান্ত দিয়ে এক বৃদ্ধকে বাংলাদেশে ‘পুশ ইন’-এর চেষ্টা করে এবং সীমান্তের নোম্যান্সল্যান্ডে তাঁকে আটকে থাকতে হয়। পরিচয়হীন, সহায়সম্বলহীন এই বৃদ্ধকে ভারতের দিক থেকে জোরপূর্বক তাড়িয়ে দেওয়া হলেও বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি) দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত না হয়ে তাঁকে তাৎক্ষণিকভাবে ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়নি। অবশ্য পরে পরিচয় মিলে ওই ব্যক্তির, বাংলাদেশের নাগরিক, নাম তাঁর ষষ্ঠী চন্দ্র বর্মণ, বয়স ৬৮ বছর। তাঁর পরিচয় শনাক্ত হওয়ায় চব্বিশ ঘণ্টা পর বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টায় কামালপুর সীমান্তের নো-ম্যান্স ল্যান্ড থেকে তাঁকে উদ্ধার করে বকশীগঞ্জ থানায় নিয়ে হেফাজতে রাখে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। 

দুই দেশের সীমান্তে মাঝখানের এক টুকরো অনাবাদি জমিতে সেই বৃদ্ধকে একরাত ধরে অমানবিক, অপমানজনক এবং অবমাননাকর জীবন অতিবাহিত করতে হয়। প্রতিকূল আবহাওয়া, ক্ষুধা, তৃষ্ণা এবং যেকোনো মুহূর্তে গুলিবিদ্ধ হওয়ার আতঙ্কে কাটানো সেই এক রাত কেবল একজন ব্যক্তির কষ্ট ছিল না; বরং তা ছিল সমগ্র মানবতাবোধের অবমাননা। রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্মমতা কীভাবে একজন বৃদ্ধ মানুষকে রাতের অন্ধকারে কাঁটাতারের পাশে ফেলে রাখতে পারে, তা বিশ্বের বৃহত্তম দাবিদার গণতন্ত্রের প্রকৃত চরিত্রকে উন্মোচন করে। নোম্যান্সল্যান্ডের সেই অন্ধকার রাতে আটকে থাকা বৃদ্ধের অবয়বটি আজ বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের বিপন্ন মানবিকতার এক জীবন্ত ও নির্মম প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

সীমান্তের এই অমানবিক বাস্তবতার সঙ্গে দুই দেশের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক বার্তার মধ্যে এক গভীর ও তীব্র বৈপরীত্য লক্ষ করা যায়। বাংলাদেশে ভারতের নবনিযুক্ত হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর আগমনের সময় এক বক্তব্যে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার অভিন্ন স্বার্থ রক্ষা, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং দুই দেশের একসঙ্গে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ় আশাবাদ ও প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। কূটনৈতিক শিষ্টাচারের দিক থেকে এই বক্তব্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং ইতিবাচক মনে হলেও, সীমান্তের নির্মম বাস্তবতার সঙ্গে তা প্রচণ্ডভাবে সাংঘর্ষিক।

একদিকে ভারতের সর্বোচ্চ কূটনৈতিক পর্যায় থেকে ‘অভিন্ন স্বার্থ’, ‘বন্ধুত্ব’ এবং ‘সহযোগিতা’র বাণী প্রচার হচ্ছে, অন্যদিকে একই সময়ে সীমান্তে ভারতের রাষ্ট্রীয় বাহিনী পুশ ইন ও পুশ ব্যাকের মতো বৈরী ও আগ্রাসী নীতি বাস্তবায়ন করছে। এই দুইয়ের মধ্যকার বৈপরীত্য দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে গভীর আস্থার সংকট তৈরি করে। কূটনৈতিক টেবিলে সৌহার্দ্যের আলো ছড়ানোর পাশাপাশি যদি সীমান্তে অমানবিক আচরণ জারি থাকে, তবে তা কেবলই একপক্ষীয় এক আধিপত্যবাদী নীতির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে গণ্য হয়। একটি টেকসই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক কখনোই একদিকে মিষ্টি কথা এবং অন্যদিকে বলপ্রয়োগের নীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠতে পারে না। 

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে কেবল পুশ ইন বা পুশ ব্যাকই নয়, বরং বিএসএফ কর্তৃক নির্বিচারে গুলি চালিয়ে মানুষ হত্যার সংস্কৃতিও সমানভাবে বিদ্যমান। চোরাচালান বা অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে বিচারহীনভাবে গুলি করে মানুষ মারা পৃথিবীর অন্য কোনো বন্ধুভাবাপন্ন দেশের সীমান্তে দেখা যায় না। 

এই অমানবিক সংস্কৃতি এবং পুশ ইন-পুশ ব্যাকের সংকট থেকে উত্তরণের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট, টেকসই এবং মানবিক রূপরেখা প্রণয়ন করা জরুরি। সীমান্তে বিএসএফের মারণাস্ত্র বা লাইভ অ্যামুনিশন ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। অনুপ্রবেশকারী বা অপরাধীকে দেখামাত্র গুলি না করে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী আটক করে আইনের মুখোমুখি করতে হবে। পুশ ইন বা পুশ ব্যাকের মতো চোরাগোপ্তা পদ্ধতি বন্ধ করে, যদি কোনো অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগ থাকে, তবে তা দুই দেশের কূটনৈতিক চ্যানেল এবং যৌথ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নাগরিকত্ব যাচাইপূর্বক সমাধান করতে হবে। ভারতকে তার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি থেকে সীমান্ত ইস্যুকে মুক্ত করতে হবে। ‘নন-রিফোলমেন্ট’ নীতি এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সীমান্তে বিএসএফ-এর আচরণকে মানবিক করতে হবে। পুশ ইনের শিকার ব্যক্তিদের অধিকার রক্ষায় দুই দেশের মানবাধিকার কমিশন এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন পর্যবেক্ষণ দল গঠন করা যেতে পারে, যা সীমান্তের মানবাধিকার লঙ্ঘনগুলোর ওপর নজরদারি রাখবে।

সীমান্তে পুশ ইন ও পুশ ব্যাকের রাজনীতি মূলত মানবিক মূল্যবোধের ওপর ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের এক ভয়াবহ আগ্রাসন। কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণ বা ভোটের রাজনীতি কখনোই নিরীহ মানুষের মৌলিক অধিকার ও জীবনকে বিপন্ন করার অজুহাত হতে পারে না। নোম্যান্সল্যান্ডে আটকেপড়া বৃদ্ধের কান্না কিংবা সীমান্তে ঝরেপড়া প্রাণ, কোনোটিই একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে না। ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর ঘোষিত ‘অভিন্ন স্বার্থের’ বাণী তখনই সার্থক হবে, যখন সীমান্তে এই অমানবিক প্রক্রিয়ার স্থায়ী অবসান ঘটবে। কাঁটাতারের বেড়া যেন মানুষের হৃদ্যতা ও মানবিকতাকে বিভক্ত করতে না পারে; বরং একটি রক্তপাতহীন, মানবিক এবং শান্তিপূর্ণ সীমান্ত ব্যবস্থাপনাই হোক বাংলাদেশ ও ভারতের ভবিষ্যৎ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মূল ভিত্তি।

মো. আবু সালেহ: গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক
[email protected]

আরও পড়ুন

×