ঢাকা শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

মনুষ্যসৃষ্ট জলবিপর্যয় ও অব্যবস্থাপনার দায়

মনুষ্যসৃষ্ট জলবিপর্যয় ও অব্যবস্থাপনার দায়
×

মামুনুর রশীদ

মামুনুর রশীদ

প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৪১ | আপডেট: ১৮ জুলাই ২০২৬ | ১১:০৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের সংবাদপত্র, মিডিয়া এবং ঘরে-বাইরে সর্বত্র আলোচনা, কী প্রবল বৃষ্টি! রাস্তাঘাট, বাড়িঘর সব ডুবে যাচ্ছে। পাহাড়ধসে মানুষ মরছে। এ রকম দুর্যোগ যে এবারই প্রথম হয়েছে তা নয়, আগেও বহুবার হয়েছে। মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে নৌকায় আশ্রয় নিয়েছে, খাদ্যের অভাব হয়েছে, শিশুখাদ্য দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছিল। কিন্তু তখনকার বৃষ্টি এবং প্লাবন আজকের মতো এত অস্বাস্থ্যকর ছিল না। নদী-নালা, খাল-বিলের ধারণক্ষমতা আজকের চেয়ে অনেকগুণ বেশি ছিল। দিন গিয়েছে আর সেগুলো মানুষ ভরাট করে দিয়েছে, দখল করেছে। ভরাট করার উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে নানা ধরনের বর্জ্য, বিশেষ করে পলিথিনসামগ্রী, যা অবিনাশী। আগুনে পুড়লেও সে অন্য একটি রূপ পরিগ্রহ করে। শুধু তাই নয়, এলাকাজুড়ে বায়ু দূষিত করে। এই দূষিত বায়ুর ফলে আমরা নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ি। 

এবার স্মরণকালের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে, সঙ্গে নিয়ে এসেছে জলাবদ্ধতা; অস্বাস্থ্যকর বর্জ্যে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। সরকার পলিথিনসামগ্রী বন্ধ করার জন্য নানা রকম উদ্যোগ নিয়েছে বটে। ফলাফলে দেখা গেছে এসব কারখানার সংখ্যা দিন দিন বেড়ে চলেছে। প্রাচীনকালে অনেক পর্যটক যেমন–ইবনে বতুতা বা হিউ এন সাং তাদের ভ্রমণ কাহিনিতে বর্ণনা করেছেন, ‘ভারতের পূর্ব দেশীয় ব্যবসায়ীরা ধুরন্ধর এবং মারাত্মকভাবে অসাধু।’ অথচ মোগল শাসক ইসলাম খাঁ রাজমহল থেকে ঢাকায় যখন সুবে বাংলার রাজধানী স্থানান্তর করেন, তখন সেনাপতি মির্জা নাথান তাঁর বাহারিস্তান গায়েবিতে বাংলাকে অচেনা চির বসন্তের দেশ বলে আখ্যা দিয়েছেন। ইতিহাসের বিচারে খুব বেশি দিনের কথা নয়, ১৬১০ সালে তিনি বাংলায় এসেছিলেন। বড় বড় নদী, জলাভূমি অতিক্রম করে ঢাকায় এসে পৌঁছান। বাংলা সম্পর্কে তাঁর বিস্ময়ের শেষ ছিল না। সেই আবহাওয়ার মধ্যেই একটা সমৃদ্ধ জনপদে পরিণত হয়েছিল পূর্ব বাংলা। নদীর উৎকৃষ্ট পানি এবং তার সঙ্গে কার্পাস তুলার সংমিশ্রণে তখনকার গণপ্রযুক্তির কারণে মসলিনের মতো বিস্ময়কর এবং উৎকৃষ্ট বস্ত্র তৈরি করা সম্ভব হয়েছিল। 

ব্রিটিশ আমলের শুরুর দিকেও এখানে প্রবল বৃষ্টিপাতে নদী-নালা উপচে পড়েছে, তবে বন্যার কোনো ইতিহাস পাওয়া যায় না। কিন্তু ব্রিটিশরা যখন নিজেদের প্রয়োজনে এলোপাতাড়ি পথঘাট নির্মাণ শুরু করে, বিশেষ করে রেললাইন, তারপর থেকেই পানির প্রাকৃতিক প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নদীর আচরণ পাল্টে যায় এবং বাংলা, বিহার, উড়িষ্যায় বন্যার প্রাদুর্ভাব লক্ষ্য করা যায়। মোগল আমলে পাঞ্জাবে কৃষির জন্য সেচব্যবস্থা ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত। ইংরেজ প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর এই ব্যবস্থাটাকে তারা ভেঙে দেয়। ফলে ভারতের পশ্চিম অংশেও নদীর স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়ে সেখানে বন্যা এবং দুর্ভিক্ষের সূচনা হতে থাকে। 

পৃথিবী সব সময়ই তার নিজস্ব প্রাকৃতিক উপায়ে চলে থাকে। তাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য মেঘ জমে, বৃষ্টি হয় অথবা বরফ গলে গিয়ে বড় বড় নদী সৃষ্টি করে। আজ পর্যন্ত এসব প্রাকৃতিক বিষয় নিয়ন্ত্রণের কোনো পথ মানুষ তৈরি করতে পারেনি। প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট এসব নিয়ম নিয়ন্ত্রণ করার একটা চেষ্টা করে এসেছে। তাই উদ্ধত মানুষ নদীশাসন বলে একটি শব্দের আবিষ্কার করেছে। এই শাসন মানুষের জন্য সীমাহীন দুর্ভোগ সৃষ্টি করেছে। বহু আগে থেকেই গাঙ্গেয় অববাহিকার এ বদ্বীপকে চীনা বিশেষজ্ঞরা হাইড্রোলিক মোড অব প্রোডাকশন বলে অবহিত করেছেন। অর্থাৎ পানি এই অঞ্চলে কৃষি উৎপাদনের মূল চালিকাশক্তি। বারবার তারা বলার চেষ্টা করেছেন, ভূপৃষ্ঠীয় পানি হওয়া উচিত কৃষির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কী দুর্ভাগ্য, দেশভাগের পর ভারত ও পাকিস্তান এক ভয়ংকর শত্রুতায় অবতীর্ণ হয়। নদী তাদের কাছে হয়ে দাঁড়ায় প্রতিশোধ গ্রহণের হাতিয়ার। সবদিকে বাঁধ দিয়ে একে অপরের শত্রুতা সাধন করতে থাকে। গঙ্গার পানি বণ্টনের জন্য বিভিন্ন বাঁধ নির্মাণ করা হয় এবং ওইদিকে পাকিস্তানের নদী-নালাকেও দুই দেশ নানা ধরনের বাঁধ নির্মাণ করে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। আজকে বাংলাদেশের জন্য ফারাক্কা বাঁধ এবং তিস্তার গজলডোবায় যে বাঁধটি তৈরি করা হয়েছে তা দিয়ে উত্তরাঞ্চলে ভয়াবহ পানি সংকট সৃষ্টি হয়েছে। যে পরিমাণে বৃষ্টিপাত গত কয়েক দিনে হয়েছে, নদীগুলো যদি ভূমিদস্যুদের দ্বারা দখল হয়ে না যেত, তাহলে এই বৃষ্টির পানি একটা সম্পদ হিসেবে আমাদের জীবনযাত্রায় যুক্ত হতে পারত। 

আমাদের একেবারেই কাছাকাছি আসামের চেরাপুঞ্জিতে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়, অথচ সেখানে বৃষ্টি আশীর্বাদের মতো। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে অবলীলায় নদীতে এসে যুক্ত হচ্ছে। মাঝখানের পথগুলো অনেক বেশি শুদ্ধ হয়ে মানুষের জীবনযাপনের সঙ্গে একাকার হয়ে যাচ্ছে। সেখানকার গাছপালা, ফসল সজীব হয়ে উঠছে। 

বৃষ্টি আমাদের এখানেও গাছপালাকে সজীব করে তোলে। যদি উপযুক্ত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকত তাহলে ফসলের জমিকেও আরও উর্বর করে তুলতে পারত। কিন্তু অতিবৃষ্টি এখানে ফসলের জন্য অভিশাপ বয়ে আনে; জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়, যার ফলে ভয়াবহ ক্ষতি হয়। 

আমরা বিদেশিদের কথামতো স্বাভাবিক ভূপৃষ্ঠস্থ পানিকে পরিহার করে ভূগর্ভস্থ পানিকে ব্যবহার করে থাকি। যার জন্য বিপুল পরিমাণে সার এবং কীটনাশকের ব্যবহার করে থাকি। এই কীটনাশক এবং সার জমিকে রাসায়নিক পদার্থে ভরপুর করে তোলে। বৃষ্টি এই কীটনাশককে ভাসিয়ে নিয়ে যায় খাল-বিল এবং নদীতে। সেখানে যেসব মৎস্যসম্পদ রয়েছে সেগুলোকে আক্রমণ করে বসে। সেই প্রাণগুলো নিজেদের আর রক্ষা করতে পারে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয় কলকারখানার বর্জ্য। ঢাকা শহরের পার্শ্ববর্তী এলাকা যেমন ধামরাই ইসলামপুরের পাশাপাশি নদীগুলোর রং ভয়াবহ রকম কালো। এমনই  কালো নদী সারাদেশে আমরা দেখতে পাই।

অথচ ৫০-৬০ বছর আগেও আমরা বরফ গলা নদীর স্বচ্ছ পানি দেখতে পেতাম। নদীর পানি মানুষ অবলীলায় পান করত। বর্ষাকালে তেমনি বন্যার পানিতে হাতমুখ ধোয়া এবং রান্নাবান্না করাও একটা সহজ বিষয় ছিল। এসব বিষয় নিয়ে আর কোনো চিন্তার অবকাশ আছে বলে মনে হয় না। কারণ, যতদিন পর্যন্ত আমাদের রাজনীতি কৃষি এবং প্রযুক্তি নিয়ে গভীরভাবে না ভাববে এবং তা রাষ্ট্রীয়ভাবে গ্রহণ না করবে, ততদিন এই অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব। সেই এক অসম্ভবের পায়ে আমরা সমর্পিত।  
nমামুনুর রশীদ: নাট্যব্যক্তিত্ব

আরও পড়ুন

×