ঢাকা শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬

ইয়ামাল কি একলব্য, মেসি কি দ্রোণাচার্য

ইয়ামাল কি একলব্য, মেসি কি দ্রোণাচার্য
×

এম এম খালেকুজ্জামান

প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬ | ১৮:১৯

মহাভারতের একলব্য ও দ্রোণাচার্যের কাহিনিতে ট্র্যাজেডি আছে, আছে কর্তৃত্ব। কিন্তু মহাভারত আমাদের আরেকটি কথাও বলে– সময়ের কাছে দ্রোণাচার্যও অনিশ্চিত, একলব্যও অনিশ্চিত। ইতিহাস কখনও একক বীরের সম্পত্তি নয়। বিশ্বকাপও তাই।

একুশের সিকি শতাব্দী পার করে তাই প্রশ্নটি শুধু রোমান্টিক নয়, গভীরভাবেই দার্শনিক–লামিনে ইয়ামাল কি একলব্য, আর লিওনেল মেসি কি দ্রোণাচার্য? নাকি উল্টোটা? কিংবা তারা কেউই নন? বিশ্বকাপের আরাধ্য সোনালি ট্রফিটি কি আদৌ কোনো পৌরাণিক উপমার কাছে আত্মসমর্পণ করে?

বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে লিওনেল মেসি এক দীর্ঘ আলোকবর্তিকা। প্রায় দুই দশক ধরে তিনি কেবল ফুটবলার নন; তিনি এক ভাষা, এক নন্দন, এক শিল্পরীতি। অসংখ্য নবীনের শৈশবের দেয়ালে শোভিত পোস্টারের নাম মেসি। আজকের প্রজন্মের বিস্ময়বালক লামিনে ইয়ামালের ক্ষেত্রেও সেই সত্যের ব্যতিক্রম নেই। ইয়ামালের ফুটবলীয় অভিধানে মেসি একটি অনিবার্য উচ্চারণ।

মহাভারতের একলব্য দ্রোণাচার্যের কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়েও তাঁকেই মানসগুরু মেনেছিলেন। দূর থেকে দেখে, অনুকরণ করে নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন। সেই অর্থে ইয়ামালও যেন আধুনিক ফুটবলের এক একলব্য। বার্সেলোনার ঘাসে, ইউরোপীয় ফুটবলের নন্দনতত্ত্বে দীক্ষিত এবং মেসির রেখে যাওয়া শিল্পভাষায় বেড়ে ওঠা তরুণ। ফুটবল তাঁকে শিখিয়েছে, একজন গুরু সব সময় সামনে বসে থাকেন না; অনেক সময় তিনি হয়ে ওঠেন একটি আদর্শ, একটি ছায়া, একটি স্বপ্ন– দূরে অবস্থান করেও। কিন্তু এখানেই তুলনার উপমাটি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।

কারণ দ্রোণাচার্যের সঙ্গে একলব্যের সম্পর্ক ছিল অসম ক্ষমতার সম্পর্ক। সেখানে প্রত্যাখ্যান ছিল, ছিল শ্রেণি ও বর্ণবৈষম্যের নির্মমতা। লিওনেল মেসি কখনও লামিনে ইয়ামালের অগ্রযাত্রার পথে অঙ্গুলি দাবি করেননি। বরং ফুটবলের সৌন্দর্য এখানেই যে, একজন কিংবদন্তি আরেকজন কিংবদন্তির জন্মের জন্য জায়গা করে দেন। মেসির উত্তরাধিকার কোনো সংকীর্ণ উত্তরাধিকার নয়; এটি এমন এক নদী, যা নতুন স্রোতকে স্বাগত জানায়।

তবুও বিশ্বকাপের প্রসঙ্গে এই উপমা আমাদের অন্য এক জায়গায় নিয়ে যায়। ফুটবলের সবচেয়ে নির্মম সত্য হলো– বিশ্বকাপ কাউকে কিছু পাওনা রাখে না।
জোহান ক্রুইফ বিশ্বকাপ জেতেননি। ফেরেঙ্ক পুসকাস জেতেননি। পাওলো মালদিনি জেতেননি। রোনালদো নাজারিওর দুটি বিশ্বকাপ আছে, কিন্তু রোনালদিনহোর একটি। আবার আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার একটি গোল তাঁকে অমর করেছে। বিশ্বকাপ সব সময় ন্যায়বিচারের আদালত নয়; এটি অনিশ্চয়তারও সবচেয়ে সুন্দর ক্ষেত্র। হয়তো এই অনিশ্চয়তাই ফুটবলের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্র।

২০২২ সালে মেসি বিশ্বকাপ জিতেছেন। এতে ফুটবল তাঁর কাছে ঋণ শোধ করেছে। কিন্তু সত্যি বলতে কী, ফুটবল কারও কাছে ঋণী নয়। যদি তিনি সেই ফাইনালে হেরে যেতেন, তাহলেও তিনি লিওনেল মেসিই থাকতেন। যেমন ২০১৪ সালের পরও তিনি ছিলেন সর্বকালের অন্যতম সেরা।

একইভাবে লামিনে ইয়ামাল যদি ভবিষ্যতে বিশ্বকাপ জিতে যান, তবে তা হবে তাঁর প্রজন্মের এক মহাকাব্যিক ব্যক্তিত্ব। আর যদি কখনও বিশ্বকাপ না-ও জেতেন, তাহলে কি তাঁর শিল্পের মূল্য কমে যাবে? মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর কোনো ভাস্কর্যের মূল্য কি নোবেল পুরস্কার না পাওয়ায় কমে যায়? শিল্পের পরিমাপ সব সময় পুরস্কারে হয় না। ফুটবলও শেষ পর্যন্ত শিল্পেরই এক রূপ।

না চাইলেও আসলে বিশ্বকাপকে একটি চূড়ান্ত নৈতিক বিচারক বানিয়ে ফেলেছি আমরা। যেন ট্রফিটি নির্ণায়ক, বলে দেয়– কে মহৎ আর কে নয়। অথচ বিশ্বকাপের ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, এটি প্রতিভা, প্রস্তুতি, ভাগ্য, সময়, ইনজুরি, একটি ভুল পাস কিংবা একটি টাইব্রেকারের সম্মিলিত নাট্যমঞ্চ।

অনেকে বলেন, ইয়ামালই হবেন নতুন মেসি, তারা হয়তো ভবিষ্যতের প্রতি অতি উদার। আবার যারা মনে করেন, মেসির উচ্চতায় পৌঁছানো অসম্ভব, তারাও হয়তো সময়ের সৃজনশীলতাকে মূল্যায়ন করছেন না। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি হলো, পরবর্তী প্রজন্মকে পূর্ববর্তী প্রজন্মের ছায়ায় আটকে রাখা।

মহাভারতের একলব্য শেষ পর্যন্ত নিজের অঙ্গুলি উৎসর্গ করেছিলেন। কিন্তু আধুনিক ফুটবলের একলব্যদের কোনো অঙ্গুলি কেটে দিতে হয় না। তাদের প্রয়োজন নিজেদের স্বকীয়তার চর্চা করা। কারণ প্রকৃত উত্তরাধিকার নিহিত অনুকরণে নয়, অতিক্রমে। 

তাই ইয়ামাল একলব্য কিনা, মেসি দ্রোণাচার্য কিনা– এটি প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, বিশ্বকাপের অনিশ্চয়তা আমাদের কী শেখায়?

শেখায়– সোনালি সেই ট্রফি গন্তব্য হতে পারে, পরিচয় নয়। বিশ্বকাপ একজন খেলোয়াড়ের জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল অলংকার হতে পারে, কিন্তু তাঁর শিল্পের একমাত্র পরিমাপক নয়। মেসি বিশ্বকাপ জিতেও মহান; ইয়ামাল বিশ্বকাপ না জিতেও মহান হতে পারেন। আবার উল্টো ঘটনাও সত্য হতে পারে।

কারণ ফুটবল শেষ পর্যন্ত মহাভারত নয়, যেখানে পূর্বলিখিত নিয়তি অপেক্ষা করে থাকে। ফুটবল এমন এক মহাকাব্য, যার শেষ পৃষ্ঠাটি এখনও লেখা হয়নি। সেখানে দ্রোণাচার্যও একদিন বিস্মিত হন, আর একলব্যও নিজের ভাষায় ইতিহাস লিখে ফেলেন।

বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফিটি সেই অমোঘ সত্যেরই আরেক নাম– অনিশ্চয়তা।

এম এম খালেকুজ্জামান 
আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট 
[email protected]

আরও পড়ুন

×