সাক্ষাৎকার : এলেক্স কাউন্টস
সামাজিক ব্যবসা পরিবর্তনকামী তরুণদের মনোযোগের কেন্দ্র হতে পারে
এলেক্স কাউন্টস
মাহফুজুর রহমান মানিক
প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
এলেক্স কাউন্টস জন্স হপকিন্স ইউনিভার্সিটির স্কুল অব অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের খণ্ডকালীন শিক্ষক। ক্ষুদ্রঋণ ও দারিদ্র্য বিমোচন নিয়ে কাজ করতে তিনি প্রথম ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশে আসেন। ১৯৯৭ সালে তিনি ‘গ্রামীণ ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং এর প্রেসিডেন্ট ও সিইও হিসেবে ১৮ বছর দায়িত্ব পালন করেন। কর্নেল ইউনিভার্সিটির গ্র্যাজুয়েট এলেক্স কাউন্টস গ্রামীণ ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার আগে ‘রেজাল্টস’-এর লেজিসলেটিভ ডিরেক্টর এবং ‘কেয়ার-বাংলাদেশ’-এর আঞ্চলিক প্রকল্প ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করেছেন। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি লিখেছেন ‘স্মল লোনস বিগ ড্রিমস’। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সমকালের জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক মাহফুজুর রহমান মানিক।
সমকাল: আপনার এবার বাংলাদেশে আসার উদ্দেশ্য কি সামাজিক ব্যবসা দিবস উদযাপন?
এলেক্স কাউন্টস: আমি সোশ্যাল বিজনেস ডে (সামাজিক ব্যবসা দিবস) উপলক্ষে এসেছি এবং আমার বইগুলো নিয়ে মানুষের সঙ্গে কথা বলতে চাই।
সমকাল: বাংলাদেশের সঙ্গে আপনার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। প্রথম সফরের স্মৃতি মনে পড়ে?
এলেক্স কাউন্টস: আমার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে। আমি ১৯৮৮ সালে প্রথম এখানে এসেছিলাম। একজন ফুলব্রাইট স্কলার হিসেবে এসেছিলাম। আমি আসলে বাংলাদেশ এবং গ্রামীণ ব্যাংক সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলাম। পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাই। দীর্ঘদিন গ্রামীণ ফাউন্ডেশনে কাজ করেছি। আমি বাংলাদেশের কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘স্মল লোনস বিগ ড্রিমস’ নামে একটি বইও লিখেছি।
সমকাল: বইটি সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু বলবেন?
এলেক্স কাউন্টস: আমি আসলে তিনটি জিনিস লিখতে চেয়েছিলাম। প্রথমত, প্রফেসর ইউনূসের জীবনের গল্প বলতে চেয়েছিলাম। তখনও পর্যন্ত কোথাও তাঁর কোনো প্রকৃত জীবনী গ্রন্থ ছিল না। আমার বইটি আংশিকভাবে তাঁর একটি জীবনী। দ্বিতীয়ত, আমি ১৯৯৩, ১৯৯৪ এবং ১৯৯৫ সালের কয়েক মাস মানিকগঞ্জের কাছের একটি গ্রামে কাটিয়েছি, যেখানে আমি গ্রামীণের কার্যক্রম মাঠপর্যায় থেকে দেখেছি। আমি পাঠকদের বোঝাতে চেয়েছিলাম যে যখন গ্রামীণ ব্যাংক বা ব্র্যাকের মতো কোনো প্রতিষ্ঠান ক্ষুদ্রঋণ (মাইক্রোক্রেডিট) নিয়ে আসে, তখন আসলে কী ঘটে। কী ধরনের পরিবর্তন আসে? পরিবর্তনগুলো হয়তো দ্রুত ঘটে না, কিন্তু পরিবর্তন আসে। তাই গ্রামীণ ব্যাংকের উপস্থিতি ছিল এমন একটি গ্রামে কী ঘটছে, তা সচক্ষে দেখার জন্য আমি মাসের পর মাস সময় কাটিয়েছি। আমি সেখানকার সব ঋণগ্রহীতার সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম। আমি বাংলা বেশ ভালোই বলতে পারি। আর তাই আমি গ্রামীণের প্রভাব বুঝতে পেরেছিলাম।
সমকাল: তৃতীয় বিষয়?
এলেক্স কাউন্টস: তৃতীয় যে কাজটি আমি করতে চেয়েছিলাম তা হলো, গ্রামীণ ব্যাংক আমেরিকার প্রেক্ষাপটে কীভাবে কাজ করেছে, তা পাঠকদের জানানো। কারণ নব্বই দশকে যখন আমি বইটি লিখি, তখন শিকাগোতে গ্রামীণের মডেল অনুসরণ করে একটি প্রোগ্রাম শুরু হচ্ছিল। আমি সেখানকার ঋণগ্রহীতাদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছি, তাদের গল্প এবং ঋণ কীভাবে তাদের সাহায্য করেছে তা জেনেছি। সেই সময় থেকে গ্রামীণ মডেল ব্যবহার করে ক্ষুদ্রঋণ আমেরিকায় অনেক বেশি সফল হয়েছে। আমি সেটাই ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছি।
সমকাল: ক্ষুদ্রঋণ এবং সামাজিক ব্যবসার মধ্যে সম্পর্কটা একটু বুঝিয়ে বলবেন?
এলেক্স কাউন্টস: আমার মনে হয় মাইক্রোফাইন্যান্স, বিশেষ করে প্রফেসর ইউনূস যেভাবে এটি পরিচালনা করেছেন, তা হলো এক ধরনের আদি সামাজিক ব্যবসা। এটি মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত এবং সমস্যা সমাধান করার চেষ্টা করে। প্রফেসর ইউনূস মানুষকে সাহায্য করার জন্য একটি ব্যবসা হিসেবে ক্ষুদ্রঋণকে নিখুঁত করতে কয়েক দশক সময় ব্যয় করেছেন। এরপর আমার মনে হয় তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে মানুষকে সাহায্য করার জন্য অনেক ধরনের ব্যবসা তৈরি করা সম্ভব। আপনি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবসা তৈরি করতে পারেন। আপনি বিদেশে মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য কর্মসংস্থানমূলক ব্যবসা তৈরি করতে পারেন। আপনি শিক্ষাসংক্রান্ত সামাজিক ব্যবসা এবং আরও বিভিন্ন কিছু তৈরি করতে পারেন। সুতরাং ক্ষুদ্রঋণ হলো একটি উদাহরণ মাত্র, তবে এটি সামাজিক ব্যবসার মূল বা আদি উদাহরণ।
সমকাল: বাংলাদেশে সামাজিক ব্যবসার সূচনা হলেও বাংলাদেশের বাইরে সামাজিক ব্যবসার পরিস্থিতি কেমন দেখছেন?
এলেক্স কাউন্টস: হ্যাঁ, আমার মনে হয় কিছু সাফল্য এসেছে। তবে আপনাকে বুঝতে হবে যে সামাজিক ব্যবসা হলো ‘সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ’ (সামাজিক উদ্যোগ) এবং ‘ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টিং’ (প্রভাবশালী বিনিয়োগ) নামক একটি বৃহত্তর ধারণার অত্যন্ত কঠোর বা বিশেষ একটি রূপ। সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ এবং ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টিং-এ আপনি সামাজিক সমস্যা সমাধানের জন্য ব্যবসা করছেন ঠিকই, তবে এর নিয়মকানুন সামাজিক ব্যবসার চেয়ে কিছুটা শিথিল। উদাহরণস্বরূপ, একটি সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজে লভ্যাংশ বণ্টন করা যেতে পারে কিন্তু সামাজিক ব্যবসায় তা করা যায় না। যেমনটা মাইক্রোফাইন্যান্সের ক্ষেত্রে হয়েছিল–প্রফেসর ইউনূস এবং ব্র্যাকের ফজলে হাসান আবেদের মতো মানুষেরা অত্যন্ত শৃঙ্খলা, দৃঢ় উদ্দেশ্য এবং জবাবদিহির সঙ্গে ক্ষুদ্রঋণ পরিচালনা করেছিলেন। অথচ অন্য দেশের কিছু মানুষ যখন ক্ষুদ্রঋণ চালু করল, তখন তাদের মধ্যে সেই একই ধরনের জবাবদিহি ও শৃঙ্খলা ছিল না। এখানেও বিষয়টি একই রকম–সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ হলো সামাজিক ব্যবসার তুলনায় কিছুটা কম কঠোর, কম শৃঙ্খলিত এবং কম জবাবদিহিমূলক পদ্ধতি। তবে আমি মনে করি সামাজিক ব্যবসা এই সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ খাতকে প্রভাবিত করেছে, কিন্তু এটি সামাজিক ব্যবসার মতো অতটা সুনির্দিষ্ট বা ফোকাসড নয়।
সমকাল: বাংলাদেশের বাইরে কোন কোন দেশে সামাজিক ব্যবসার মডেল বাস্তবায়িত হচ্ছে?
এলেক্স কাউন্টস: ভারত, কেনিয়া, উগান্ডাসহ বেশ কয়েকটি দেশে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আছে। সেখানে সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজের আরও অনেক উদাহরণ আছে, বাণিজ্যিক ব্যবসার মতো। যেসব দেশে প্রফেসর ইউনূস সফর করেছেন এবং মডেলটি শেয়ার করেছেন, সেখানে বেশ কিছু সফলতার গল্প রয়েছে। তবে সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ এবং ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টিং, যা সামাজিক ব্যবসা দ্বারা দারুণভাবে প্রভাবিত হয়েছে, তা অনেক বেশি প্রচলিত।
সমকাল: বিশ্বব্যাপী সামাজিক ব্যবসার মডেলকে বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সুযোগ এবং বাধা কী?
এলেক্স কাউন্টস: আমার মনে হয়, কিছু মানুষ সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ নিয়ে কিছুটা সন্দিহান বা বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠছে। কারণ তারা দেখছে যে কিছু মানুষ অন্যকে সাহায্য করার দাবি করলেও আসলে নিজেরা ধনী হচ্ছে। তারা সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ এবং মুনাফা বাড়ানো ব্যবসার মধ্যে খুব একটা পার্থক্য দেখতে পাচ্ছে না। তাই সুযোগটি হলো–কোনো কিছু সত্যিই সামাজিকভাবে পরিচালিত কিনা তা নিশ্চিত করার জন্য এটি যদি সামাজিক ব্যবসার রূপ নেয়, তবে মানুষ আশ্বস্ত হতে পারে যে এটি বিনিয়োগকারীদের ধনী করার জন্য নয়; বরং মানুষকে সাহায্য করার জন্য তৈরি। যাদের সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ নিয়ে মোহভঙ্গ হয়েছে, তারা সামাজিক ব্যবসার সন্ধান পেয়ে আশ্বস্ত হতে পারে। তবে এখানে বড় সমস্যাটি হলো, এটি অ-বণ্টনযোগ্য ও লভ্যাংশহীন কোম্পানি হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের কোনো রিটার্ন বা মুনাফা দেওয়া হয় না। এর ফলে বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করা কঠিন হবে।
সমকাল: সামাজিক ব্যবসা আন্দোলনের লক্ষ্য হলো ‘থ্রি জিরো’ বা তিন শূন্য–শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব এবং শূন্য নেট কার্বন নিঃসরণ। এগুলো নিশ্চিত করা কতটা চ্যালেঞ্জিং?
এলেক্স কাউন্টস: শূন্য বেকারত্ব নিশ্চিত করা খুব কঠিন। শূন্য বেকারত্ব ও শূন্য দারিদ্র্যের অর্থনীতিকে সত্যিই পুনর্গঠন করতে হবে। আপনি জানেন, জাতিসংঘ এর জন্য ২০৩০ সালকে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, তবে সাম্প্রতিক কিছু সংকটের কারণে এতে আরও পাঁচ বছর বেশি লাগতে পারে। তবে আমি মনে করি, প্রবণতাটি শূন্য দারিদ্র্যের দিকেই যাচ্ছে, এতে হয়তো একটু বেশি সময় লাগতে পারে। আর শূন্য নেট কার্বন নিঃসরণের ক্ষেত্রে আমার মনে হয় বিজ্ঞান আগামী ১০ বা ২০ বছরের মধ্যে আমাদের সেখানে নিয়ে যাবে। আমি জানি প্রফেসর ইউনূস এটিকে ত্বরান্বিত করতে চান এবং আমিও তা চাই, তবে সবচেয়ে কঠিন হবে শূন্য বেকারত্ব অর্জন করা।
সমকাল: বাংলাদেশে তরুণ উদ্যোক্তা হওয়ার পথে সামাজিক ব্যবসা কীভাবে সাহায্য করতে পারে?
এলেক্স কাউন্টস: বাংলাদেশের কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আমি খুবই আশাবাদী। আমি ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি পরিদর্শন করেছি এবং খুব মুগ্ধ হয়েছি। আমি নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি পরিদর্শন করেছি। আমি জানি এখন একটি গ্রামীণ ইউনিভার্সিটি হতে যাচ্ছে। ইউনিভার্সিটি অব ম্যারিল্যান্ডে, যেখানে আমি পাঁচ বছর পড়িয়েছি, তারা শিক্ষার্থীদের সংগঠন, সামাজিক ব্যবসা, ঐতিহ্যগত ব্যবসা বা অলাভজনক প্রতিষ্ঠান শুরু করতে উৎসাহিত করে। তারা যখনই কোনো বাজারে প্রভাব তৈরির সুযোগ দেখে, তখন কোনো কাল্পনিক বিজনেস প্ল্যান তৈরি না করে সরাসরি ব্যবসা পরিচালনা শুরু করে। তারা যদি প্রথমবার ব্যর্থ হয় তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা হলো তাদের বোঝানো কেন তারা ব্যর্থ হয়েছে, যাতে তারা আবার চেষ্টা করে সফল হতে পারে। সুতরাং বিশ্বে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর ওপর ভিত্তি করে এই সমস্যাভিত্তিক এবং বাস্তব অভিজ্ঞতামূলক শিক্ষাই হলো শিক্ষার ভবিষ্যৎ এবং এই পদ্ধতির শিক্ষাই বাংলাদেশে এক প্রজন্ম সমস্যা সমাধানকারী তৈরি করতে পারে।
সমকাল: আপনি প্রথম বাংলাদেশে এসেছিলেন ১৯৮৮ সালে আর এখন ২০২৬ সাল–প্রায় ৪০ বছর। এর মধ্যে এখানে কী কী পরিবর্তন আপনার চোখে পড়ছে?
এলেক্স কাউন্টস: প্রথমত, আমি যখন এসেছিলাম তখন এরশাদের একনায়কতন্ত্র ছিল। এখন ১৯৯০ সালের পর থেকে বেশির ভাগ সময় বাংলাদেশে গণতন্ত্র বজায় রয়েছে। সুতরাং এই ক্ষেত্রে পরিবর্তন এসেছে। যোগাযোগব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে। আমি যখন আসি তখন সেলফোন ছিল না। বাইরের বিশ্ব এবং শহরের সঙ্গে গ্রামীণ এলাকার যোগাযোগ করা খুব কঠিন ছিল। এখন তা বদলে গেছে। অবকাঠামো অনেক উন্নত হয়েছে। বাংলাদেশ একটি অনেক বেশি সফল দেশ হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ক্ষুদ্রঋণ, সামাজিক উদ্যোক্তা, শান্তিরক্ষা এবং শ্রম রপ্তানির মাধ্যমে অবদান রাখার মতো অনেক গৌরবময় অর্জন এখন বাংলাদেশের আছে। বিশেষ করে ফেব্রুয়ারির শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পর এটি এখন একটি কার্যকর গণতন্ত্র। আর শেষ যে বিষয়টি আমার মনে হয়, বাংলাদেশে জেনজি তার ক্ষমতা দেখিয়ে দিচ্ছে।
সমকাল: বাংলদেশের জেনজিদের কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
এলেক্স কাউন্টস: আমেরিকার আমার অনেক শিক্ষার্থী আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল যে বাংলাদেশের এত তরুণ কীভাবে সরকার পতন ঘটাল এবং দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনল? আমি শুধু বলেছিলাম, কারণ তারা সংকল্পবদ্ধ ছিল, বাংলাদেশিরা অনেক পরিশ্রম করতে পারে এবং সহজে হার মানে না। তাই বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে সত্যিই অনেক বদলে গেছে এবং বিশ্বের বুকে এর ভাবমূর্তি একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র থেকে একটি বহুলাংশে সফল রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।
সমকাল: আমরা যদি জলবায়ু পরিবর্তন, বেকারত্ব এবং অসমতার মতো সামাজিক ব্যবসার চ্যালেঞ্জগুলোর দিকে আসি, আগামী দশকে সামাজিক ব্যবসা কোথায় দাঁড়াবে?
এলেক্স কাউন্টস: আমার মনে হয়, সামাজিক ব্যবসা সেইসব তরুণের ফোকাল পয়েন্ট বা মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে পারে, যারা আমার প্রজন্মের ধারণাটিকে প্রত্যাখ্যান করে। আমার প্রজন্মের ধারণা ছিল–আপনি এমন কোম্পানিতে কাজ করবেন, যা কেবল মুনাফা অর্জনের চেষ্টা করে এবং সেটাই আপনার কাজ আর তারপর আপনার উপার্জনের কিছু টাকা আপনি বিশ্বকে উন্নত করার চেষ্টায় নিয়োজিত সংস্থাগুলোকে দান করে দেবেন। অর্থাৎ আপনি মূলত এমন একটি সিস্টেমে কাজ করতে রাজি হলেন–যা প্রায় অমানবিক আর তারপর আপনার আয়ের সামান্য অংশ দিয়ে মানবিক কিছু করার চেষ্টা করলেন। আমার মনে হয় নতুন প্রজন্ম সত্যিই এমন একটি পথ চায়; যেখানে তারা ভালো আয় করবে, অর্থনীতিতে অবদান রাখবে কিন্তু একই সঙ্গে মানবতা, পরিবেশ ও আমাদের গ্রহের কল্যাণে অবদান রাখবে। এটি তাদের কাজের বাইরে কোনো অংশ হবে না, বরং কাজের মূল অংশ হবে। সামাজিক ব্যবসা সেই সুযোগটি দেয়।
সমকাল: যেমন?
এলেক্স কাউন্টস: সামাজিক ব্যবসা আপনাকে একটি ব্যবসায় কাজ করার পাশাপাশি সামাজিক সমস্যার সমাধান করার সুযোগ দেয়। মানুষ এই সমন্বয় চায়, তারা জীবিকা নির্বাহ এবং বিশ্বের জন্য কিছু করার মধ্যে কোনো দূরত্ব চায় না। আর সামাজিক ব্যবসার আরেকটি সুযোগ হলো, এটি উপলব্ধি করা যে শূন্য অসমতা, শূন্য বেকারত্ব, শূন্য দারিদ্র্য এবং শূন্য কার্বন নিঃসরণ আসলে একটি সমন্বিত আন্দোলন। আমরা পরিবেশের বিপরীতে মানুষের কল্যাণকে দাঁড় করাতে পারি না, যা আগে মানুষ করত। এসব সমস্যার বিরুদ্ধে একসঙ্গে লড়াই করতে হবে। সামাজিক ব্যবসায় এই তিনটি ধারণার (থ্রি জিরো) ব্যবহারের মাধ্যমে এটি একটি সমন্বিত ও সামগ্রিক পদ্ধতিকে উৎসাহিত করে, যা আমার মনে হয় এই নতুন প্রজন্ম খুঁজছে। সামাজিক ব্যবসা তাদের কাজ করার এবং জীবনকে সবচেয়ে সন্তোষজনকভাবে পরিচালনা করার একটি কাঠামো প্রদান করে।
সমকাল: আপনি তো জানেন বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা একটি দেশ। জলবায়ু অর্থায়ন এবং অন্যান্য বিষয়ে বিশ্বের বাংলাদেশের জন্য কী করা উচিত? বিশ্বের কীভাবে বাংলাদেশের পাশে আসা উচিত?
এলেক্স কাউন্টস: আমাদের বাংলাদেশ বা এই ধরনের দেশগুলোকে এক ধরনের ক্ষতিপূরণ বা সহায়তা দেওয়া উচিত, কারণ আমরা এমন একটি সমস্যা তৈরি করেছি, যা আপনাদের ওপর প্রভাব ফেলছে। আমাদের মধ্যে যারা এই জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্যা তৈরি করেছে, তাদের সেইসব মানুষের কাছে জবাবদিহি করতে হবে, যারা এর সবচেয়ে বড় পরিণতি ভোগ করছে। তাই জলবায়ু তহবিল জরুরি। আমেরিকা, ইউরোপ এবং চীন–আমরা যা করেছি তার জন্য আমাদের জবাবদিহি করতে হবে।
সমকাল: বাংলাদেশ বা এই ধরনের উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সামাজিক ব্যবসার পরিধি বাড়াতে আন্তর্জাতিক সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী এবং বেসরকারি খাত কীভাবে একসঙ্গে কাজ করতে পারে?
এলেক্স কাউন্টস: আমার মনে হয় তারা সবচেয়ে ভালো যে কাজটি করতে পারে তা হলো, একগুচ্ছ সামাজিক ব্যবসা তহবিল বা একটি অর্থায়ন ব্যবস্থা তৈরি করা। যাতে তরুণ বা যারা ক্যারিয়ারের মাঝামাঝি সময়ে এসে পেশা পরিবর্তন করছেন, তাদের শুরু করা সামাজিক ব্যবসায় প্রাথমিক মূলধন সরবরাহ করতে পারে। কারণ আপনি তো জানেন, যে কোনো ব্যবসার জন্য ওই প্রথম স্টার্টআপ ক্যাপিটাল বা শুরুর পুঁজি জোগাড় করা সবচেয়ে কঠিন। তাই কোম্পানি, সরকার এবং বেসরকারি খাত যদি স্টার্টআপ সামাজিক ব্যবসায় অর্থায়নের জন্য টাকা বরাদ্দ রাখে, তবে এটি পুরো এক প্রজন্মকে এই মডেল চেষ্টা করতে উৎসাহিত করবে এবং তা একটি বিশাল গতিবেগ তৈরি করবে।
সমকাল: বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আপনার কোনো উপলব্ধি শেয়ার করতে চান?
এলেক্স কাউন্টস: আমি যখন আমার বই ‘স্মল লোনস বিগ ড্রিমস’-এর কাজ করছিলাম, তখন আমি দেখেছিলাম যে বাংলাদেশের গ্রামীণ নারীদের সমস্যাগুলোর সঙ্গে আমেরিকার অন্যতম বড় শহর শিকাগোর দরিদ্র এলাকার নারীদের সমস্যার আশ্চর্যজনক মিল ছিল। এবং আমি এটি দেখেও অবাক হয়েছিলাম যে ক্ষুদ্রঋণ গ্রামীণ বাংলাদেশ এবং শিকাগো উভয় জায়গাতেই একই রকম প্রভাব ফেলেছিল। সুতরাং ক্ষুদ্রঋণের এই সামঞ্জস্য এবং সর্বজনীনতা আমার কাছে বিস্ময়কর ছিল। আমেরিকা এবং বাংলাদেশকে প্রায়ই খুব ভিন্ন দুটি দেশ বলা হয়, কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে আমরা যতটা ভাবি তারা তার চেয়েও বেশি সদৃশ এবং উভয় দেশেই ক্ষুদ্রঋণের সাফল্য এ ধারণাকে সমর্থন করে।
সমকাল: সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।
এলেক্স কাউন্টস: আপনাকেও ধন্যবাদ। সমকালের জন্য শুভকামনা।
- বিষয় :
- মাহফুজুর রহমান মানিক
- সাক্ষাৎকার