ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জনস্বাস্থ্য

কীটনাশকের ফাঁদে কৃষি

কীটনাশকের ফাঁদে কৃষি
×

মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬ | ০৮:২২ | আপডেট: ২৪ জুলাই ২০২৬ | ১১:৪৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

খাদ্য নিরাপত্তার নায়ক কৃষক পোকামাকড়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে বালাইনাশককে (কীটনাশক) সহযোদ্ধা বানিয়েছেন। অথচ অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে অতি নির্ভরশীল হওয়ায় সেই বালাইনাশক সহযোদ্ধা আজ প্রকাশ্য শত্রু। বালাইনাশক, কীটনাশককে কৃষক সহজ ভাষায় বলেন ‘বিষ’। সেই বিষ পৌঁছে গেছে মাটি, পানি, প্রকৃতি হয়ে আমাদের খাদ্যচক্রে ও স্বাস্থ্যে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক সরকারি গবেষণায় জানা গেল, দেশের ক্যান্সার রোগীর ৬০ শতাংশই কৃষক। অধিকাংশ কৃষকের ধারণা, ‘একটু বেশি স্প্রে করলে ক্ষতি কী?’ কিন্তু অর্থনীতির হিসাব সরল নয়। অতিরিক্ত বালাইনাশক মানে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি; একই পোকার বিরুদ্ধে বারবার স্প্রে; পোকার বালাইনাশকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধিতা সৃষ্টি; আরও নতুন নতুন বালাইনাশকের প্রবর্তন এবং কৃষকের লাভ কমে যাওয়া। বড় ক্ষতি জাতীয় অর্থনীতিতে। দেশে এখন ৪০ হাজার টন বিষের জন্য কৃষক ব্যয় করেন প্রায় ৭.৫ হাজার কোটি টাকা। কৃষকের চিকিৎসা ব্যয়, কর্মঘণ্টা নষ্ট, দূষিত পানি ও মাটির পুনরুদ্ধার, খাদ্য পরীক্ষার ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে কৃষিপণ্য প্রত্যাখ্যান– সব মিলিয়ে এই ‘সস্তা স্প্রে’ শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে ব্যয়বহুল সিদ্ধান্তে পরিণত হয়। রপ্তানির যুগে একটি চালান ফেরত আসা মানে শুধু অর্থের ক্ষতি নয়; দেশের সুনামেরও ক্ষতি, যা গড়ে তুলতে আরও মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যয় প্রয়োজন। 

বিষ শুধু ক্ষেতে নয়, থালাতেও
একসময় বলা হতো– কৃষক দেশের প্রাণ। আজ প্রশ্ন উঠছে– সেই প্রাণকে আমরা কতটা নিরাপদ রেখেছি। কৃষক স্প্রে করছেন; সন্তান পাশে দাঁড়িয়ে দেখছে। অর্ধব্যবহৃত বিষের বোতল খাবারের পাশে রাখা হচ্ছে। বোতলের গা বেয়ে আশপাশে বিষ থাকছে, যা কখনও খাদ্যচক্রে, কখনও পরিবেশে মিশছে। আবার ব্যবহৃত বোতল পরে তেল বহনের পাত্র হিসেবেও ব্যবহার হচ্ছে। প্লাস্টিকের ফয়েলে বিষ ব্যবহারের পর প্রকৃতিতে ফেলে দেওয়া তো নৈমিত্তিক ঘটনা। এ সবই বিষের সঙ্গে সহাবস্থানের এক নির্মম বাস্তবতা। এ জন্য ভোক্তার আচরণও দায়ী। বাজারে চকচকে সবজি দেখেই বলেন, এটাই ভালো। প্রকৃতির ভাষায় এর অর্থ হলো– ‘আরও একটু স্প্রে করুন’। আবার অমৌসুমে ফসলটি বেশি পছন্দ করি, যেটা তৈরি করতে নির্বিচারে বালাইনাশক লাগে। আমরা দেখতে সুন্দর খাবার চাই, কিন্তু সেটি নিরাপদ কিনা– সে প্রশ্ন করতে ভুলে যাই। আবার ফসল নিরাপদ হলে প্রক্রিয়া হয় অনিরাপদ। আমাদের খাবারের বেশি অংশই তেলে ভাজা, যা অ্যাক্রিলামাইড নামক বিষসমৃদ্ধ, যা নিউরাল ক্যান্সারের জন্য দায়ী। 

আইন শক্তিশালী বইতে, মাঠে দুর্বল
বাংলাদেশে বালাইনাশক আইন-২০১৮ এবং বালাইনাশক বিধিমালা-২০২১ রয়েছে। কিন্তু বইতে আইন শক্তিশালী হওয়া আর মাঠে কার্যকর হওয়া এক নয়। অনেক সময় বাজারে এমন বালাইনাশক পাওয়া যায়, যা কাগজ-কলমে নিয়ন্ত্রিত, বাস্তবে সহজলভ্য। জাতিসংঘ খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সরকারি তথ্যসূত্রে দেশে ২৫-৩০টি অতি বিপজ্জনক বালাইনাশক দেশি-বিদেশি কোম্পানি বিভিন্ন নামে বিক্রি করছে। এমামেকটিন তার প্রত্যক্ষ উদাহরণ। ডিলারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এমামেকটিন নাকি সর্বাধিক বিক্রি হয়, এমন তালিকায় বাংলাদেশ রয়েছে। আবার বালাইনাশক আইনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রণীত এলডি ফিফটি সীমা হেরফের করে আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী গ্লাইফোসেট বালাইনাশক সারাবিশ্বে নিষিদ্ধ। কিন্তু বাংলাদেশে তা সবুজ শ্রেণির বালাইনাশক হিসেবে বাজারজাত হচ্ছে। প্রশ্ন হলো– দায় কার? কৃষকের? বিক্রেতার? নাকি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার? দায় সবার। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা শুধু কৃষি মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়। এটি স্বাস্থ্য, পরিবেশ, বাণিজ্য, স্থানীয় সরকার এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সমন্বিত দায়িত্ব। নিরাপদ খাদ্য যদি রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার হয়, তবে বালাইনাশক ব্যবস্থাপনাও জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।

বালাইনাশক কখনও শুধু ক্ষতিকর পোকা মারে না। মৌমাছি, প্রজাপতি, কেঁচো, মাটির অণুজীব– সবাইকে আঘাত করে। আজ পোকা মারতে গিয়ে আমরা পরাগায়নকারী মৌমাছিকে হারাচ্ছি, মাটির উর্বরতা কমাচ্ছি, নদীর মাছের জীবন বিপন্ন করছি। প্রকৃতি প্রতিশোধ নেয় না; সে শুধু ভারসাম্য হারায়। সেই ভারসাম্যহীনতার মূল্য শেষ পর্যন্ত মানুষকেই দিতে হয়। তার প্রভাব ইতোমধ্যে পড়তে শুরু করেছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে নিবন্ধিত প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংখ্যা ৩৮ থেকে ৪৮ লাখ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জাতীয় প্রতিবন্ধী ব্যক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশের ২.৮% মানুষ কোনো না কোনো ধরনের প্রতিবন্ধিতায় আক্রান্ত। দরিদ্র পরিবারের মধ্যে প্রতিবন্ধিতার হার ধনী পরিবারের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। যার অন্যতম কারণ অপুষ্টি ও পুষ্টিকর খাদ্যের অপ্রতুলতা। এখনও অনেক কৃষকের বিশ্বাস– ‘দুই ঢাকনা ভালো হলে চার ঢাকনা আরও ভালো।’ কৃষক বালাইনাশক পানিতে মেশানোর সময় ঢাকনা দিয়ে মাপেন। চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া যেমন ওষুধ খাওয়া বিপজ্জনক, তেমনি অভিজ্ঞদের পরামর্শ ছাড়া বালাইনাশক ব্যবহারও সমান ঝুঁকিপূর্ণ। আবার ভোক্তাদেরও শিখতে হবে, অতিরিক্ত চকচকে সবজি কখনও কখনও বেশি প্রশ্নের জন্ম দেয়। তাই নিরাপদ খাদ্যের জন্য উৎপাদক ও ভোক্তা উভয়ের আচরণ পরিবর্তন অপরিহার্য। 

উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বালাইনাশক সরাসরি প্রত্যাহার, বিক্রেতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, বালাইনাশক আইনের ৩০ (গ) ধারা বাস্তবায়ন তথা বালাইনাশকের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিক্রয়কর্মী, কৃষক, কৃষিকর্মীর বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য পরীক্ষা প্রতি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিনামূল্যে নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি জেলায় অবশিষ্টাংশ পরীক্ষাগার, কৃষকদের বাধ্যতামূলক নিরাপদ বালাইনাশক ব্যবহার প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল প্রেসক্রিপশনভিত্তিক বালাইনাশক ব্যবস্থাপনা ও জৈব বালাই নিয়ন্ত্রণের সম্প্রসারণ করতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যালয় থেকে শুরু করে গণমাধ্যম পর্যন্ত নিরাপদ খাদ্য বিষয়ে জাতীয় সচেতনতা কর্মসূচি চালু করতে হবে। একটি পুরোনো প্রবাদ– যে কুয়ো থেকে পানি পান করা হয়, সেখানে বিষ ঢাললে প্রথমে নিজেরই বিপদ। আমরা সেই ভুলটিই করছি। জমিতে যে বিষ দিচ্ছি, তা আমাদের জন্যই ফিরে আসছে।

ড. মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন: বিজ্ঞানী ও গবেষক, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট [email protected]
 

আরও পড়ুন

×