সমকালীন প্রসঙ্গ
সৃজনশীল অর্থনীতির স্লোগান ও সম্ভাবনা
হোসেন জিল্লুর রহমান
হোসেন জিল্লুর রহমান
প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬ | ০৮:২৩ | আপডেট: ২৪ জুলাই ২০২৬ | ১৩:১২
| প্রিন্ট সংস্করণ
জুন মাসে জাতীয় সংসদে পেশকৃত বাজেটে অর্থমন্ত্রী ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ বা সৃজনশীল অর্থনীতির বিষয়কে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন। সেই সূত্র ধরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা নতুন গতি পেয়েছে। এটি দেশের অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ এই অর্থে, আমাদের অর্থনীতিতে গার্মেন্ট শিল্প কিংবা সস্তা শ্রমের রেমিট্যান্সে যে নির্ভরশীলতা, সেখানে বিকল্প খাত দরকারি হয়ে উঠেছে। পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে শুধু প্রচলিত খাতের ওপর নির্ভর করে টেকসই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন। সে জন্য আমরা অনেক দিন ধরেই বিকল্প খাতের কথা বলে আসছি। ক্রিয়েটিভ ইকোনমি এ ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ভালো বিকল্প। সরকারও এটি অনুভব করছে। কিন্তু এটি সরকারের স্লোগান, নাকি সম্ভাবনা; কাজের মাধ্যমেই আমরা দেখতে চাইব।
বৈশ্বিক চাহিদা ও সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থনীতির বহুমুখীকরণ এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন উৎস খুঁজতে বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশকেও ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ বা সৃজনশীল অর্থনীতির দিকে ঝুঁকতে হবে। সম্প্রতি আমরাও পিপিআরসির আজকের এজেন্ডায় বিষয়টি নিয়ে আলাপ করেছি। এখানে দুটি শব্দ– ক্রিয়েটিভ ইকোনমি। মানুষের মেধা, সৃজনশীলতা, সংস্কৃতি, উদ্ভাবন ও কল্পনাশক্তিকে পণ্য বা সেবায় রূপান্তর করে আয়, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি করাই এই অর্থনীতির কাজ। অর্থাৎ ক্রিয়েটিভ জগতের কাজগুলোয় অর্থনীতিকে যুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ। আমরা জানি যে, সরকার সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে একাধিক সভা করেছে। অর্থমন্ত্রী বিষয়কে যেভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন, তা যেন শেষ পর্যন্ত কেবল সরকারি বা আমলাতান্ত্রিক বিষয় হয়ে না ওঠে।
বলা দরকার, শিল্প ও সংস্কৃতি, মিডিয়া ও বিনোদন, প্রযুক্তি ও ডিজাইন, প্রকাশনা, বিজ্ঞাপন ইত্যাদি ঘিরে যে ক্রিয়েটিভ ইকোনমি, তাকে বিশুদ্ধতার সংকীর্ণ ধারণার মধ্যে আটকে রাখা যথাযথ নয়। ক্রিয়েটিভ ইকোনমির বিষয়ে রাজনৈতিক অপব্যবহারেরও শঙ্কা আছে। এই অপব্যবহারের বিষয়টি ধারণাগত দিক থেকে পরিষ্কার থাকা দরকার। কারণ এটা বহুপক্ষীয় হতে পারে– রাষ্ট্রের দিক থেকে। রাজনৈতিকভাবে এমনকি ক্রিয়েটিভ সেক্টরের লোকজন দিয়েও হতে পারে। তবে যে বৈশ্বিক বাস্তবতায় আমরা বাস করি, সেখানে আদান-প্রদানের বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যেমন অন্যদের থেকে শিখি, তেমনি অন্যরাও আমাদের থেকে শেখে। এই আদান-প্রদানের বাস্তবতাকে ছোট করে দেখার কোনো সুযোগ নেই।
ক্রিয়েটিভ ইকোনমি বা সৃজনশীল অর্থনীতির ইনফ্রাস্ট্রাকচার বা অবকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ। মানসম্পন্ন অবকাঠামো খরচের বিষয় বটে, কিন্তু তা টেকসই হলে রাজস্ব আহরণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। যেমন, লন্ডন এটি সম্ভব করেছে টেকসই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে। এখানে বিশেষত সরকারি আলোচনায় ক্রিয়েটিভ ইকোনমির অবকাঠামো নিয়ে আলোচনা হলেও সেখানে ব্যবস্থাপনার বিষয়টি অনুপস্থিত থাকে। এ ক্ষেত্রে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের অনেক ধরনের মডেল আছে। সোনারগাঁও হোটেল কিংবা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল যে মডেলে চলছে, সেগুলো সুব্যবস্থাপনায় আছে। এই মডেলে আমাদের কাউকে দেশের বাইরে থেকেও আনতে হচ্ছে না। অন্যদিকে আমরা যদি জয়িতা ফাউন্ডেশন দেখি অথবা এমনকি শিল্পকলা একাডেমি, সেগুলো পুরোপুরি আমলাতান্ত্রিক মাইন্ডসেটের মধ্যে পরিচালিত হয়। এখানে আমার মনে হয়, সরকারকেও উপলব্ধি করার সময় এসেছে।
অর্থাৎ সরকারি পদধারী বা মন্ত্রণালয়ের অস্থায়ী কাউকে দায়িত্ব দেওয়া, এরপর তিনি অন্য কোথাও চলে যাচ্ছেন। এই কাঠামোতে ক্রিয়েটিভ ইকোনমির সুব্যবস্থাপনা সম্ভব নয়। শিল্পকলা একাডেমিতে দেখা যায় স্মরণসভা এবং এ ধরনের অনুষ্ঠানই বেশি করা হয়। এতে রাজস্ব আহরণ সম্ভব হবে না। এটা টেকসই ব্যবস্থাপনাও নয়। অথচ এটা আমাদের এখানেও সম্ভব। কারণ এখানে নির্দিষ্ট দর্শক আছে, ভোক্তা আছে। সে কারণেই ক্রিয়েটিভ ইকোনমির অবকাঠামোর জন্য সরকারের জোরাল উপলব্ধি দরকার।

ক্রিয়েটিভ ইকোনমিতে ব্র্যান্ডিং জরুরি বিষয়। ব্র্যান্ডিং করার ক্ষেত্রেও সরকারের নীতিগত কিছু বিষয় আছে। করনীতি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টির (আইপি) কপিরাইটও জরুরি বিষয়। কারণ সৃজনশীল লেখক কিংবা শিল্পীর রয়ালটির ব্যবস্থা কীভাবে হবে সেখানে আইপি গুরুত্বপূর্ণভাবে অ্যাড্রেস করতে হবে। লাইসেন্সিংও এখানে আসতে পারে। সরকার অন্যান্য ক্ষেত্রে লাইসেন্সিংকে ইমপ্রুভ করার চেষ্টা করছে। আমাদের অদ্ভুত সব লাইসেন্সিং রুল আছে, যেগুলোর কোনো ব্যখ্যা নেই। তার মানে ট্যাক্সেশন, কপিরাইট. লাইসেন্সিং– তিনটা বিষয়ে নীতিগুলো দেখতে হবে। কপিরাইট নিশ্চিত হলে শিল্পী সম্মানী যথাযথভাবে পাওয়ার পথ হবে।
ক্রিয়েটিভ ইকোনমিতে রাজস্ব আহরণ ও কর্মসংস্থানের বিষয়গুলোও আলোচনা করা দরকার। এখানে কেবল সৃজনশীল মানুষের কর্মসংস্থান নয়; পর্দার পেছনে যারা কাজ করে, সেসব কর্মী বাহিনীও গুরুত্বপূর্ণ। আবার সৃজনশীল যে গ্রুপ তৈরি হচ্ছে, তাদের ক্রিয়েটিভ ইকোনমিতে কর্মসংস্থানের বিষয়গুলো আমরা সরকারের সঙ্গে আলোচনা করতে পারি। বলাবাহুল্য, সৃজনশীল অর্থনীতিতে দক্ষতার বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া দরকার। পাশাপাশি স্কিল গ্যাপ তথা দক্ষতার ঘাটতিও দেখার বিষয়। তাদের সৃজনশীল ক্ষেত্রে কাজ করে দক্ষতার ঘাটতি এবং যারা পেছনে থেকে কাজ করে তাদেরও এই সংকট আছে। এ দুই ক্ষেত্রের লোকদের নিয়েই সমন্বিতভাবে জনবলবিষয়ক আলোচনা করা দরকার।
ক্রিয়েটিভ ইকোনমি খাতের সামগ্রিক সাংগঠনিক ব্যবস্থাপনার কী হবে? এখানে এই খাতের সংশ্লিষ্টদের স্বার্থ সুরক্ষায় একটা সাংগঠনিক কাঠামো থাকা দরকার। সরকারেরও কমিটি থাকতে পারে। সরকারি মহলে এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তবে এ নিয়ে সমন্বয় জরুরি। আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, বাংলাদেশের মতো জায়গায় যারাই উৎসাহী, সবাইকে মিলে এমন সমন্বয় হয় না। তবে এখানে একটা কৌশল গ্রহণ করতে হবে। এই কৌশল যে কেবল সরকার গ্রহণ করবে না, তা নয়। ক্রিয়েটিভ ইকোনমি খাত-সংশ্লিষ্টরা নিজেরাই কৌশল ঠিক করতে পারে বা সরকারকে পরামর্শ দিতে পারে। এখানকার লোকদের স্পেসিফিক সাজেশনগুলো সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তার মানে, ক্রিয়েটিভ ইকোনমি কেবল স্লোগানসর্বস্ব কথার কথা নয়। এটা সম্ভাবনা ও বাস্তবতা। এ ক্ষেত্রে জরুরি পদক্ষেপ বাস্তবায়নে রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি ক্রিয়েটিভ ইকোনমি খাত ও সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। তাদের এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় ক্রিয়েটিভ ইকোনমি বাংলাদেশে এগিয়ে যেতে পারে।
ড. হোসেন জিল্লুর রহমান: অর্থনীতিবিদ; এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান, পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি)
- বিষয় :
- হোসেন জিল্লুর রহমান