ইসরায়েল
ফিলিস্তিনের পক্ষে যুক্তরাজ্যের নীতি কতটা টেকসই হবে
ক্রিস ডয়েল
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
অধিকৃত ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইসরায়েল তাদের প্রথম অবৈধ বসতি স্থাপনের ৫৯ বছর পর অবশেষে যুক্তরাজ্য ইসরায়েলি বসতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য নিষিদ্ধ করেছে। অবশ্য এই পদক্ষেপ আরও আগে নেওয়া উচিত ছিল। কারণ, বর্তমানে ৭ লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি বসতি স্থাপনকারী ১৪০টিরও বেশি আনুষ্ঠানিক বসতি এবং ৩৯০টিরও বেশি অবৈধ আউটপোস্ট ও খামারে বসবাস করছে।
এই নিষেধাজ্ঞা এমন একসময়ে এলো, যখন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের একটি ‘আমূল পুনর্গঠনের’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এই শব্দটি বেশ অর্থবহ–চলতি সপ্তাহে আমার সঙ্গে একটি বৈঠকে তিনি একাধিকবার এটি ব্যবহার করেছেন। ‘পুনর্গঠন’ শব্দটির মাধ্যমে পুরো সম্পর্কের গতিপথ নতুন করে নির্ধারণের একটি শক্তিশালী ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
তাহলে এটি কি এক চিরতরে বিচ্ছেদ, নাকি সাময়িক বিচ্ছেদ? এটি কি কেবল মুখের কথা, নাকি এর পেছনে দৃশ্যমান কোনো বাস্তব ভিত্তি আছে? পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমাকে জানিয়েছেন, তিনি এই
নীতিতে নেতৃত্ব দিতে এবং কেবল ইসরায়েলের বসতি স্থাপনই নয়, বরং ফিলিস্তিনিদের ওপর তাদের নজিরবিহীন আগ্রাসন রোধেও যতটুকু সম্ভব পদক্ষেপ নিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
সাম্প্রতিক দশকগুলোতে যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েল বেশ উষ্ণ সম্পর্ক, তীব্র বাণিজ্য এবং প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা উপভোগ করেছে। এতে কেবল তখনই ছেদ পড়েছে, যখন ব্রিটেন ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইসরায়েলের আচরণ নিয়ে তাদের উদ্বেগ–‘কখনও গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করে।
২০২৩ সালের মার্চকে যুক্তরাজ্য-ইসরায়েল সম্পর্কের স্বর্ণযুগ বলা যায়। তৎকালীন দুই সরকার ‘দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ২০৩০ রূপরেখা’ স্বাক্ষর করে, যেখানে প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা খাতসহ সবক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। পরবর্তী সময় ৭ অক্টোবরে হামাসের আক্রমণের পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক ইসরায়েলকে নিঃশর্ত সমর্থন দিয়ে এ সম্পর্ককে আরও জোরদার করেন। সুনাক বলেছিলেন, ‘আমি দ্বিধাহীনভাবে বলছি। আমরা ইসরায়েলের পাশে আছি; কেবল আজ নয়, কাল নয়, সব সময়ের জন্য।’
২০২৪ সালে লেবার পার্টি ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাজ্য-ইসরায়েল সম্পর্কের অবনতি হতে শুরু করে। বিশেষ করে অস্ত্রের ওপর আংশিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের কারণে। তবে লেবার প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ইসরায়েলকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে অনীহা প্রকাশ করেছিলেন। ব্রিটেনের ভেতরে তাঁকে মূলত ইসরায়েলের এক পরম বন্ধু হিসেবে দেখা হতো। নিজের দলের ভেতরে অভিযোগ উঠেছিল, তিনি গণহত্যা রোধে বলতে গেলে কিছুই করেননি, একদম শেষ মুহূর্তে এসে কেবল আংশিক কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন। স্টারমার কখনও গাজায় আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের জন্য প্রকাশ্যে ইসরায়েলকে অভিযুক্ত করেননি।
অথচ ইসরায়েলি নেতৃত্বের কাছে স্টারমার ও তাঁর সরকার ছিল জন্মগতভাবে ইসরায়েলবিরোধী, এমনকি হামাসের বন্ধু; যারা ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীটির সুরেই কথা বলে। ২০২৫ সালে যুক্তরাজ্য কর্তৃক ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি প্রদান এবং ইসরায়েলের দুই মন্ত্রী স্মোটরিচ ও ইতামার বেন-গাভিরের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির পর এই ধারণা আরও জোরালো হয়ে ওঠে। জুলাইয়ের শেষের দিকে অ্যান্ডি বার্নহাম দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ব্রিটিশ সরকারের সুর নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। স্টারমারের এড়িয়ে যাওয়া ও দ্বিধাগ্রস্ত বক্তব্য উধাও হয়ে গেছে। তার জায়গায় এসেছে স্পষ্ট ও কড়া বক্তব্য, যা ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের জন্য তাদের সরাসরি দায়ী করছে।
নিজেদের আক্রমণাত্মক বাগ্যুদ্ধ বাড়ানো ছাড়া ইসরায়েল আর কী-ই বা করতে পারে? তারা যুক্তরাজ্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে যুক্তরাষ্ট্রকে রাজি করানোর চেষ্টা করতে পারে, নিজেদের তৈরি কোনো নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারে। গাজায় ত্রাণপ্রবাহ তদারকির জন্য বোর্ড অব পিস কর্তৃক গঠিত ইন্টারন্যাশনাল গাজা সাপোর্ট সেন্টার থেকে যুক্তরাজ্যকে বাদ দিয়ে দিতে পারে। তবে ভয়ানক প্রতিশোধের প্রভাব যে ফিলিস্তিনিদের ওপর গিয়ে পড়বে, তার আশঙ্কা বেশি। ব্রিটিশ নিষেধাজ্ঞার জবাব দিতে তারা নতুন বসতি স্থাপনের ঘোষণা বা এ জাতীয় অন্য কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে।
এই অবস্থায় যুক্তরাজ্য-ইসরায়েল সম্পর্কের কি আর কোনো স্বাভাবিক হওয়ার পথ আছে? ইসরায়েলে নেতানিয়াহু এবং লন্ডনে যুক্তরাজ্যে সরকার ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় এর উত্তর স্পষ্টত ‘না’। তবে নেতানিয়াহু যদি ক্ষমতাচ্যুত হন এবং তাঁর স্থলাভিষিক্ত গ্যাডি আইজেনকোট হন, তবে হয়তো সম্পর্কের বরফ কিছুটা গলতে পারে। তবে আসল বিপদ হলো, নতুন কোনো ইসরায়েলি সরকার হয়তো কূটনৈতিক দিক থেকে একটু নরম বা কম অহংকারী হতে পারে, কিন্তু ফিলিস্তিনিদের বিষয়ে তাদের কৌশলগত নীতি একই থাকবে। মূল বিষয় নীতি, ব্যক্তি নয়।
ইসরায়েল যতক্ষণ না তাদের অবৈধ বসতি স্থাপনের কারখানা বন্ধ করছে, ততক্ষণ ব্রিটিশ সরকারকে এই নীতির ওপর অটল থাকতে হবে। ইসরায়েলের অস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি বা মিষ্টি কথায় ব্রিটিশদের ভুললে চলবে না। এই নীতির সফলতা মাপা সম্ভব কেবল বাস্তবে ইতিবাচক পরিবর্তনের মাধ্যমে।
ক্রিস ডয়েল: লন্ডনভিত্তিক সংস্থা কাউন্সিল ফর আরব-ব্রিটিশ আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের (সিএএবিইউ) পরিচালক; আলজাজিরা থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম।
- বিষয় :
- ইসরায়েল