আবারও পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু
আইনের শাসনের গুরুতর লঙ্ঘন
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
পুলিশ হেফাজতে পুনরায় একজনের মৃত্যু ঘটিল। এইবারের ঘটনাস্থল বরিশালের বাকেরগঞ্জ, আর ভুক্তভোগী একজন নারী। শুক্রবার প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদন অনুসারে, মঙ্গলবার দিবাগত রাত সাড়ে ৩টার দিকে স্বীয় বাড়ি হইতে গৃহবধূ নাদিয়াকে আটক করিয়াছিল পুলিশ। পরের দিন বুধবার বিকেলে তাঁহার মৃত্যু হয়। তাঁহার স্বামীর অভিযোগ, নাদিয়াকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাইয়া হত্যা করা হইয়াছে, যদিও পুলিশ যথারীতি নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করিয়াছে। ইতোপূর্বে গত জুন মাসে ফরিদপুরে পুলিশ হেফাজতে এক তরুণের মৃত্যু ঘটিয়াছিল। তখনও নিহতের স্বজনদের তোলা নির্যাতনের অভিযোগ পুলিশ উড়াইয়া দিয়াছিল। লক্ষণীয়, সেই ঘটনায়ও ফরিদপুর জেলা গোয়েন্দা পুলিশ ‘গাঁজাসহ’ উক্ত তরুণকে গ্রেপ্তার করিবার কথা বলিয়াছিল; আলোচ্য ঘটনায়ও পুলিশ মাদকবিরোধী অভিযানে নাদিয়াকে গ্রেপ্তার করা হইয়াছিল বলিয়া জানাইয়াছে। উপরন্তু, বরিশালের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বাকেরগঞ্জ সার্কেল) মাসুম বিল্লাহ সমকালকে বলিয়াছেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হইতেছে, আটকের সময় নাদিয়ার সঙ্গে থাকা ইয়াবা বড়ি গিলার কারণে তাঁহার মৃত্যু হইতে পারে। অথচ নাদিয়াকে আটকের বিষয়ে বাকেরগঞ্জ থানার ওসি আদিল হোসেন স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, নাদিয়ার নিকট হইতে মোবাইল ফোন ও ‘মাদক বিক্রির’ ১৯ সহস্রাধিক টাকা উদ্ধার করা হইয়াছে। অর্থাৎ আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে ইয়াবা উদ্ধারের কথা নাই।
পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা এই দেশে নূতন নহে, দশকের পর দশক ধরিয়া এহেন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চলিতেছে। অতীতেও প্রায় প্রতিটি ঘটনায় সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থা গ্রেপ্তারকৃতের উপর নির্যাতন না চালাইবার দাবি করিয়াছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সরকারের পক্ষ হইতে তদন্তের মাধ্যমে এই সকল ঘটনার সুরাহা করিবার আশ্বাস থাকিলেও বরাবরই তাহা নিছক ফাঁকা বুলিতে পরিণত হইয়াছে। তদুপরি পুলিশের বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগের তদন্তের দায়িত্ব পুলিশকে দিবার কারণে সম্পূর্ণ বিষয়টি একপ্রকার প্রহসনে পরিণত হইয়াছিল। তবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর এহেন মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর ঘটনা বন্ধ হইবে বলিয়া সকলে আশা করিয়াছিল, যদিও অন্তর্বর্তী সরকার সেই আশার গুড়ে বালি ফেলে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের এক প্রতিবেদন বলিতেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি হইতে ডিসেম্বর অবধি অন্তত ২৩ জন পুলিশ ও বিভিন্ন বাহিনীর হেফাজতে প্রাণ হারাইয়াছেন। এমনকি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করিয়া জনগণের ভোটে নির্বাচিত বর্তমান সরকারও একই পথে হাঁটিতেছে বলিয়া মনে হইতেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র গত জানুয়ারি হইতে আগস্ট পর্যন্ত পুলিশ ও যৌথ বাহিনীর হেফাজতে অন্তত সাতজন মৃত্যুবরণ করিয়াছেন বলিয়া জানাইয়াছে।
আমরা জানি, মানবাধিকারকর্মীদের অব্যাহত চাপের মুখে, ২০২৩ সালে নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩ প্রণীত হইয়াছিল। এই আইন অনুসারে, পুলিশ হেফাজতে আটককৃতের উপর যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা দণ্ডযোগ্য অপরাধ। কিন্তু গত কয়েক মাসে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার হেফাজতে সংঘটিত মৃত্যুসমূহের একটিতেও গ্রহণযোগ্য কোনো তদন্ত হয় নাই, উক্ত আইনানুসারে বিচার হওয়া তো দূরের কথা। আশা করা হইয়াছিল, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠনকল্পে প্রণীত নূতন আইনে এহেন মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার তদন্ত কমিশনকে দেওয়া হইবে। সেই সুযোগ না রাখিয়া সংশ্লিষ্ট আইনটি সরকার পাস করিয়াছে। এমনকি গুমসংক্রান্ত আইনেও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের তদন্ত পুলিশকে দেওয়া হইয়াছে। এই ধরনের ছাড় পাইলে যে কোনো রক্ষকেরই ভক্ষক বনিয়া যাওয়ার কথা; বাস্তবে তাহাই ঘটিতেছে।
তবে আলোচ্য ঘটনাসহ হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনাসমূহের বিশ্বাসযোগ্য ও স্বচ্ছ তদন্ত জননিরাপত্তার স্বার্থে জরুরি বলিয়া আমরা মনে করি। নচেৎ জনমনে যে বিরূপ ধারণা সৃষ্টি হইবে, তাহার পরিণাম সরকার তো বটেই, সমাজেরও জন্য গুরুতর হইবার আশঙ্কা উড়াইয়া দেওয়া যায় না।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়