অন্যদৃষ্টি
সীতাকুণ্ডে কাঠামোগত হত্যা
এসকে মজিদ মুকুল
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২২
| প্রিন্ট সংস্করণ
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের গ্রিন শিপইয়ার্ডে–ফেরদৌস স্টিল কারখানায়–জাহাজ ভাঙার সময় বিষাক্ত গ্যাসে কয়েকজন শ্রমিক আহত হওয়ার পাশাপাশি প্রাণ হারান ১০ জন। গত ১৪ আগস্ট ওই দুর্ঘটনা ঘটার পরপর শ্রমজীবী-কর্মজীবী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ঘুরপাক খায় একটি প্রশ্ন–এটি দুর্ঘটনা না ‘কাঠামোগত হত্যা’?
জাহাজভাঙা শিল্পের কাজ পরিবেশগত দিক থেকে প্রচণ্ড ঝুঁকিপূর্ণ হলেও তা নিরাপদ করতে জারি করা সরকারি নির্দেশনাটি আলোর মুখ দেখেনি আজও। অন্যদিকে মালিকপক্ষ নিশ্চিত যে তীব্র বেকারত্বের দেশে জীবন বাঁচাতে তাদের শর্তে শ্রমিক-কর্মচারীরা কাজ করতে বাধ্য। এ পরিস্থিতিতে শুধু জাহাজভাঙা নয়, প্রায় সব শিল্পে ধারাবাহিকভাবে আইনকানুন ও বিধিবিধান উপেক্ষিত হয়ে আসছে। অগ্নিকাণ্ডসহ নানা দুর্ঘটনায় শত-সহস্র শ্রমিক নিহত হয়েছেন ও হচ্ছেন। সীতাকুণ্ডের আলোচ্য ঘটনার পর সরকার গঠিত দুটি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনেও রাষ্ট্রীয় বিধিবিধানসহ অত্যাবশ্যকীয় শর্তগুলো লঙ্ঘিত হওয়ার কথা স্বীকার করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের শর্ত পূরণের কথা বলে শিপাইয়ার্ডগুলোকে পাইকারি হারে ‘গ্রিন ইয়ার্ড’-এর লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে; ফেরদৌস স্টিলও এমন এক কারখানা। আরও দুর্ভাগ্যজনক হলো, সেখানে বিষাক্ত গ্যাসে যখন শ্রমিকেরা একে একে অজ্ঞান হয়ে পড়ছিলেন, তখন অন্য শ্রমিকেরা দৌড়ে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেও জাহাজের সামনে থাকা নিরাপত্তা কর্মীদের মারমুখী বাধায় বের হতে পারেননি। সূত্রমতে, ঘটনার ঘণ্টাখানেক পর স্থানীয় মানুষ খবর পেয়ে শ্রমিকদের উদ্ধারে এগিয়ে এলেও ইয়ার্ডে ঢুকতে বাধার সম্মুখীন হলে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সব মিলিয়ে ভুক্তভোগীদের সময়মতো হাসপাতালে নিতে না পারায় আহত-নিহতের সংখ্যা বেড়েছে। সবকিছু মিলিয়ে ১০ জন শ্রমিকের মৃত্যুকে কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড বলাই শ্রেয়।
দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখাসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের কল্যাণ ও নিরাপত্তা বিধানে প্রধানমন্ত্রী অঙ্গীকারবদ্ধ। ওই শিপইয়ার্ডের শ্রমিকদের প্রতি তাই তাঁর দায় আছে। সব নাগরিকের জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থানের পাশাপাশি নিরাপদ কর্মস্থল নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। এটি কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য নয় যে রাষ্ট্রের আইন ও নাগরিক হিসেবে শ্রমিকের নিরাপত্তা ধারাবাহিকভাবে লঙ্ঘিত হতে থাকবে এবং সরকার সেখানে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করবে।
যে কোনো কারখানার মতো জাহাজ ভাঙা শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও বিধিবিধানের মান্যতা প্রযোজ্য। ভাঙার জন্য জাহাজ কেনার ক্ষেত্রে জাহাজটির ‘নিরাপদ সনদ’ও দেয় ছয়টি সংস্থা এবং তদারকিতে সংশ্লিষ্ট রয়েছে আরও সংস্থা। এতগুলো সংস্থার সংশ্লিষ্টতা থাকা সত্ত্বেও চট্টগ্রামের শিপইয়ার্ডগুলোতে এত প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা কেন? মনে রাখতে হবে ফেরদৌস শিপইয়ার্ডের ঘটনা প্রথম নয়; প্রতিবছর একাধিক দুর্ঘটনা সেখানে ঘটে চলেছে। বেসরকারি সংস্থা শিপব্রেকিং প্ল্যাটফর্মের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে দুর্ঘটনায় মোট ২৪৯ জন শ্রমিক নিহত হন। দশকের পর দশক ধরে সংঘটিত এসব দুর্ঘটনায় আরও কত আহত শ্রমিককে যে পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়েছে তার কোনো হিসাব নেই।
প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকৃষ্ট হলে সীতাকুণ্ডের জাহাজ কেনার সনদ, জাহাজভাঙাসহ সব ক্ষেত্রে অনিয়ম শুধু উন্মোচিত হবে না, প্রতিকার ও প্রতিরোধমূলক কিছু ব্যবস্থাও আশা করা যেতে পারে। এমন ধারাবাহিক কাঠামোগত হত্যা বন্ধ করে শিপব্রেকিং শিল্পে সুশাসন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিলে তার ইতিবাচক প্রভাব অন্য ক্ষেত্রেও পড়বে।
এসকে মজিদ মুকুল: বীর মুক্তিযোদ্ধা ও কলামিস্ট
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি