সমকালীন প্রসঙ্গ
তারুণ্যের মেলবন্ধন এবং পরিবর্তনের গতিপথ
হোসেন জিল্লুর রহমান
হোসেন জিল্লুর রহমান
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩৩ | আপডেট: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১১:২৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
তরুণদের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা সব সময়ের জন্য জরুরি। তাদের আকাঙ্ক্ষার শক্তি আমাদের পাথেয়। এ বিষয়টি সম্প্রতি বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন সেন্টার বা পিপিআরসির গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন ‘আজকের এজেন্ডা’র আলোচনায় উঠে এসেছে। অভ্যুত্থান-উত্তর বাংলাদেশে তারুণ্যের বহুমুখী সম্ভাবনার বিকাশ নিয়ে সে আলোচনায় বিভিন্ন খাতে নেতৃত্বদানকারী ছয়জন তরুণ-তরুণী আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন। আমরা বলেছি, আমাদের বহু জায়গায় কাজ করতে হবে। রাজনৈতিক পরিসরে, মাঠপর্যায়ে এবং কমিউনিটিতেও আমাদের কাজ করা দরকার। আমাদের রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক জায়গা এমনকি জনআলোচনায়ও কাজ করতে হবে। কারণ প্রতিটি ক্ষেত্রের আলাদা গুরুত্ব আছে।
তারুণ্য আমাদের অন্যতম সম্পদ। তরুণ শক্তির সঙ্গে অন্যান্য শক্তিরও মেলবন্ধন জরুরি। আমাদের চাহিদা এবং পরিবর্তনের জায়গা অনেক বড়। অনেক ক্ষেত্রে আমাদের সিস্টেম চেঞ্জ বা ব্যবস্থার পরিবর্তন দরকার। আমাদের ভবিষ্যতের পথ নির্ধারণে ঢাকা বা এলিট পরিসরের বাইরে বিকেন্দ্রীকরণটাও গুরুত্বপূর্ণ। সেটি প্রযুক্তির ব্যবহার বা রাজনৈতিক নেতৃত্ব তৈরির বিষয়–যাই হোক না কেন। আমাদের বিভিন্ন ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এই বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়টা জরুরি। বিকেন্দ্রীকরণের অর্থ হচ্ছে, প্রতিটি জায়গার মানুষ পরিবর্তনের কারিগর–তরুণদের এ বিষয়টিকে বাস্তব করে তুলতে হবে।
ঝালকাঠির অথবা রংপুরের কৃষক পরিবর্তনের কারিগর হতে পারেন। কিংবা পার্বত্য চট্টগ্রামের নারী বা অন্য জায়গায় উদ্যোক্তা, সবাই কিন্তু পরিবর্তনের কারিগর। পরিবর্তনের কারিগর বলতে আমাদের সংকীর্ণ যেসব চিন্তা আছে, সেখান থেকে বের হতে হবে। রাষ্ট্রীয় চিন্তা অথবা নেতৃত্বের চিন্তায়ও এই পরিবর্তনের কারিগরদের সবাইকে নিয়ে ভাবতে হবে।
পরিবর্তনের সঙ্গে সিস্টেম চেঞ্জ অথবা সংস্কারও আসতে পারে। সংস্কারের ইংরেজি হচ্ছে রিফর্ম। অনেক সময় আমাদের সব চিন্তা আটকে যায় রিফর্ম ক্যাপিটাল-এর মধ্যে। সাংবিধানিক সংস্কারে। রাষ্ট্রকাঠামোর এই বড় সংস্কার অথবা আইন বিভাগের সংস্কার নিশ্চয়ই বড় ধরনের সংস্কার। কিন্তু আমাদের বাংলাদেশের পরিবর্তন যদি করতে হয় তাহলে এই বড় পরিবর্তনের পাশাপাশি ছোট বিষয়গুলোকে ফোকাসে বা মনোযোগের কেন্দ্রে আনতে হবে। ঔপনিবেশিক শক্তি চলে গেছে, একশ বছর হয়ে যাবে। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রশক্তির কিছু প্রবণতা বা সংস্কৃতি কিংবা ক্ষমতার ধরন এখনও প্রবলভাবে বিদ্যমান। সেগুলো পরিবর্তন করতে হলে ছোট বিষয়গুলোর ওপরও ফোকাস করতে হবে। যেমন, শিক্ষাঙ্গন ঠিক করতে গেলে একমাত্রিক শিক্ষা কমিশনই নয়, অন্য বিষয়গুলোও দেখতে হবে। আমরা কীভাবে উপাচার্য নিয়োগ দিচ্ছি, শিক্ষার মানটা নিশ্চিত করার জন্য পরিবেশটা কেমন ইত্যাদি। ছোট বিষয়গুলোতে পরিবর্তন এলে বড় পরিবর্তনেরও সম্ভাবনা তৈরি হয়।
আমাদের যে স্বাস্থ্য খাত, সেখানে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকে কীভাবে পুরো খাতের স্তম্ভ করা যায়, সেখানে কাজ করা দরকার। এই যে ছোট একটা বিপরীতমুখী উদ্যোগ নেওয়া হলো, ওষুধের তালিকা বাতিল করা হলো, এটি কিন্তু একটা ছোট পরিবর্তনের উদাহরণ। অথচ এখানে আমরা পিছিয়ে পড়লাম।

তারপরও আমাদের তরুণরা পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষায় জাগ্রত আছে। তাদের এই আকাঙ্ক্ষা ও বিভিন্ন কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া এবং আস্থার জায়গাগুলো আরও জোরদার করতে হবে। আমাদের তরুণরা যদি এখানে সুযোগের অভাবে বিদেশে যায়, সেটিকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখার কোনো অবকাশ নেই। তারা তো এখানে কাজ করতে চায়। অনেক তরুণ বিদেশ গিয়েও আবার ফিরে এসে দেশে ভূমিকা রাখতে চায়। মূল কথা হচ্ছে, আমরা কি সেই পরিবেশ তৈরি করতে পারছি কিনা। আমাদের বিশ্ব থেকেও শিখতে হবে, সেটিও তো খুব গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমাদের এই পরিবেশ তৈরির সামগ্রিক কাজে সবার সম্পৃক্ত হওয়া দরকার।
পরিবর্তন অনেক ধরনের এবং বিভিন্ন মাত্রায় হয়। প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন, শিক্ষাগত পরিবর্তন ইত্যাদির কথা আমরা বলেছি। তার চেয়ে জরুরি বিষয় হলো, শেষ বিচারে আমরা নিজেরা পরিবর্তিত হচ্ছি কিনা। আমাদের নিজেদের উন্নতি হচ্ছে কিনা। সড়ক নিরাপদ করতে আমরা রোড সেফটি নিয়ে আইন করলাম, কিন্তু সড়কে শৃঙ্খলায় আমি ব্যক্তিগতভাবে মনোযোগী হলাম না। তাহলে শেষ বিচারে পরিবর্তনটা আসবে না। আবার আমরা জেন্ডার জাস্টিস নিয়ে অনেক সেমিনার করলাম; কিন্তু নারীর প্রতি প্রাত্যহিক জীবনে আমার দৃষ্টিভঙ্গি ঠিক নেই। নারীর পথচলায় সম্মান ও শ্রদ্ধার জায়গাগুলো আমি যদি দেখতে না পারি, তাহলে কিন্তু পরিবর্তন হলো না। যেসব সমাজের সার্বিক পরিবর্তন হয়েছে সেখানে সবাই ব্যক্তিগতভাবে তা মেনেছে। ব্যক্তিগত পরিবর্তন থেকে সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা হয়।
যে বিষয়টি আমি ইতোপূর্বেও বলেছি, তারুণ্যের উত্থান বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে এই সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তারুণ্যের উত্থানের তাৎপর্যও কেবল চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানকেন্দ্রিক পর্যালোচনায় সীমাবদ্ধ রাখাটা সঠিক নয়। তারুণ্যের দীর্ঘমেয়াদি ও গভীর সম্ভাবনা আলাদা আলোচনার দাবি রাখে। এটিও অস্বীকার করা যাবে না যে, অভ্যুত্থানের পর তারুণ্যের শক্তির মধ্যে নানা ধরনের বিভাজন ও অনৈক্য বেড়েছে। নারীর অবস্থান অস্বীকার এবং কোণঠাসা করার প্রবণতা সুস্পষ্ট। তরুণদের কিছু অংশ পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে আরও কার্যকর ও সক্ষমভাবে জোরদার করার পরিবর্তে ক্ষমতাকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে নিয়েছে। তারপরও তাদের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাটা আছে। আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য পথও আমাদের দেখাতে হবে। গণঅভ্যুত্থানের পর সার্বিকভাবে এক ধরনের মর্যাদাবোধ পুনর্নির্মাণের যে বিষয় ছিল, যাকে আমরা বলি হিলিং, তা হয়নি। অর্থাৎ সবাইকে নিয়ে আসা, সবার মনের ক্ষোভগুলোকে এক ধরনের সহমর্মিতার ভিত্তিতে প্রশমন করা, সেটি হয়নি।
তারপরও আজকে আমাদের তারুণ্যের শক্তির বিকাশ হয়েছে এবং বিভিন্ন খাতে তারা কাজ করছে। বিভিন্নভাবে তরুণরা ক্রিয়াশীল আছে এবং বাস্তবমুখী নানা সমস্যার গভীরতা অনুধাবন করে সে সমস্যারও সমাধান করছে। চব্বিশের জুলাইয়ে অভ্যুত্থানের যে আকাঙ্ক্ষা উচ্চারিত হয়েছিল, সেই আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী একটি মানবিক, একটি ন্যায়ের জায়গায় দেশকে নিয়ে যাওয়া দরকার। বৈষম্যহীন সমাজে মেধার লালনের পাশাপাশি দেশকে সম্মিলিতভাবে আমরা যদি একটা পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারি, সেখানে বাস করে আমরা আনন্দ পাব। সেখানে তরুণ শক্তির সঙ্গে সমাজের অন্যান্য শক্তির সেই মেলবন্ধনগুলো আমরা খোঁজার চেষ্টা করব।
ড. হোসেন জিল্লুর রহমান: অর্থনীতিবিদ; এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান, পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি)
- বিষয় :
- হোসেন জিল্লুর রহমান