জ্ঞানান্দোলন
কেন বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের পুনর্জাগরণ প্রয়োজন
রাজীব সরকার
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩১
| প্রিন্ট সংস্করণ
ঢাকায় মুসলিম সাহিত্য সমাজের উদ্যোগে ১৯২৬ সালে সংগঠিত বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন এ বছর শতবর্ষে পদার্পণ করেছে। এ আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ছিলেন কাজী মোতাহার হোসেন। ‘আনন্দ ও মুসলমান গৃহ’ প্রবন্ধে তিনি বলেছিলেন–‘মুসলমানের যে গৃহ নেই, তার একটা কারণ, আনন্দের উপকরণের অভাব। মুসলমান গান গাইবে না, ছবি আঁকবে না, এককথায় মনোরঞ্জনকর ললিতকলার কোনো সংশ্রবেই থাকবে না। মুসলমান পুরুষরা কেবল কাজ করবে, আর ঘর শাসন করবে; মেয়েরা কেবল রাঁধবে বাড়বে, আর বসে বসে স্বামীর পা টিপে দেবে; তা ছাড়া খেলাধুলা, হাসিতামাশা বা কোনো প্রকার আনন্দ তারা করবে না–সব সময় আদব-কায়দা নিয়ে দুরস্ত হয়ে থাকবে। মুসলমান বাপের সামনে হাসবে না, বড় ভাইয়ের সামনে খেলবে না, গুরুজনের অন্যায় কথারও প্রতিবাদ করবে না, এমনকি কচি ছেলেমেয়েরা পর্যন্ত মার খেলেও চেঁচিয়ে কাঁদবে না! এ রকম হাজার হাজার আইনকানুনের বেড়াজালে পড়ে মুসলমান ত্রাহি ত্রাহি ডাক ছাড়ছে।’
এ বাক্যগুলো অনায়াসে বর্তমান সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে পাঠ করা যায়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশ লাইন্সের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হামলা এবং একদল লোকের দাবির মুখে কিশোরগঞ্জ জেলা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিতব্য কনসার্ট বন্ধ করে দেওয়ার মতো ঘটনাসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হামলা বা হুমকির মাধ্যমে বন্ধ করে দেওয়ার বেশ কিছু বিষয় কয়েক মাস ধরে ঘটেছে। একুশ শতকের সিকিভাগ পার হওয়ার পরও ওইসব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের বিরোধীরা দাবি করছেন, গান ও সংস্কৃতি চর্চার সঙ্গে ইসলাম ধর্মের সম্পর্ক সাংঘর্ষিক।
আমরা জানি, শত বছর আগে উদার ও শিক্ষিত মুসলমানরা ওই আন্দোলনটিকে স্বাগত জানালেও রক্ষণশীল নবাব পরিবার এবং তাদের অনুসারীরা এ আন্দোলনের বিরোধিতা করেছেন। শুধু বিরোধিতা করেননি, আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় সংগঠকদের মানসিক নির্যাতন করেছেন, এমনকি জীবননাশের হুমকিও দিয়েছেন। বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন কখনও ধর্ম বিরোধিতা করেনি। অথচ এ আন্দোলনের উদ্যোক্তাদের ‘ধর্ম বিরোধিতা’র দায়ে অভিযুক্ত হতে হয়েছে। এ ধারা থেকে কি আমরা মুক্ত হতে পেরেছি? কোনো কোনো সমস্যা আগের চেয়ে বরং প্রকট হয়েছে। গত কয়েক বছরে ধর্মান্ধতা ও অসহিষ্ণুতা এমনভাবে বেড়েছে যে, সম্পদহানির পাশাপাশি বিপুল প্রাণহানিও ঘটেছে। নারীর অবরোধদশা ক্ষেত্রবিশেষে আরও বেড়েছে।
বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের চলার পথ যে বরাবরই বন্ধুর ছিল, তা এক কঠিন সত্য। ইউরোপের ইতিহাসে সেই মধ্যযুগে অজ্ঞতার অন্ধকারকে টিকিয়ে রেখেছিল ক্যাথলিক চার্চকেন্দ্রিক ধর্মতন্ত্রের ধারকরা। সেই অন্ধকার দূর করে রেনেসাঁস ঘটাতে চাইলেন যারা, তাদের অনেককে ক্ষমতাধর ধর্মতন্ত্রীদের আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে। যাঁর বিরুদ্ধে ধর্ম বিরোধিতার অভিযোগ উঠত, তাঁর প্রাণ হনন করা হতো। সে সময়কার প্রখ্যাত মুক্তবুদ্ধিসাধক জর্দানো ব্রুনোকে ধর্ম বিরোধিতার অভিযোগে আট বছর কারান্তরালে থাকতে হয় এবং পরে চার্চের আদেশে তাঁকে অগ্নিদগ্ধ করে মেরে ফেলা হয়। ‘পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘোরে’– তখনকার প্রচলিত বিশ্বাসবিরোধী এ কথা বলার দায়ে বিজ্ঞানী গ্যালিলিওকে কারাগারে মরতে হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে চার্লস ডারউইন যখন ‘প্রাণীর ক্রমবিবর্তনের’ যুগান্তকারী তত্ত্ব প্রকাশ করলেন, তখন ইউরোপের ধর্মান্ধ গোষ্ঠী ক্ষিপ্ত হলেও ডারউইন ও তাঁর সমর্থকদের কোনো ক্ষতি করতে পারেনি। ততদিনে ভিন্ন মত শোনার চর্চা সেখানে শুরু হয়েছে।
উনিশ শতকে কলকাতাকেন্দ্রিক রেনেসাঁর সূচনায় ঈশ্বর-বিশ্বাসী ও ধার্মিক হওয়ার পরও রাজা রামমোহন রায়কে একেশ্বরবাদের কথা বলার জন্য হিন্দু সমাজ থেকে ব্যাপক নিন্দার মুখে পড়তে হয়েছিল। সতীদাহের মতো চূড়ান্ত অমানবিক প্রথাকে উচ্ছেদ করতে গিয়ে তিনি ধর্মবিরোধীরূপে চিহ্নিত হন এবং সীমাহীন লাঞ্ছনার শিকার হন। প্রায় একই অভিজ্ঞতা হয়েছিল বিধবাবিবাহ প্রবর্তন ও বহুবিবাহ বন্ধে উদ্যোগী ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরসহ মুক্তচিন্তার ধারকবাহক প্রায় সব মনীষীরই।
তবে এত বিরোধিতা সত্ত্বেও ওই মনীষীদের থেমে যেতে হয়নি, যে দুর্ভাগ্য বরণ করতে হয়েছিল বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের সূচনাকারীদের। বলে রাখা দরকার, এ আন্দোলনের আগেও উপমহাদেশের মুসলমানদের মধ্যে অনেকে মুক্তচিন্তা ও যুক্তিবাদিতার চর্চা করেছেন। সেগুলো ছিল বিচ্ছিন্ন প্রয়াস, প্রায় লক্ষ্যহীন। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য সামনে রেখে সংঘবদ্ধভাবে কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা ও পশ্চাৎপদতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের দৃষ্টান্ত প্রথম স্থাপন করে মুসলিম সাহিত্য সমাজ। আন্দোলনটির সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে এর সংগঠকরা সচেতন ছিলেন না, এমন নয়। তাদের মধ্যে অন্যতম মোতাহের হোসেন চৌধুরী। এ বিষয়ে ‘রিনেসাঁস: গোড়ার কথা ও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন, ‘এর আরদ্ধ কাজ শেষ হতে পারেনি রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের আবির্ভাবে।’ আমরা জানি, এর দুদশক আগেই মুসলিম লীগ গঠিত হয়, যেখানে সাম্প্রদায়িক ধ্যান-ধারণার প্রাধান্য ছিল, যার সঙ্গে অসাম্প্রদায়িক, উদার ও যুক্তিবাদী ধ্যান-ধারণা পোষণকারী বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের সংঘাত ছিল অনিবার্য। রাজনীতি বিষয়ে অনাগ্রহী মুসলিম সাহিত্য সমাজের তাই থেমে যাওয়া ভিন্ন কোনো পথ ছিল না।
মুসলিম সাহিত্য সমাজ রাজনীতিতে না জড়াতে চাইলেও রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাদের কার্যক্রমকে প্রভাবিত করেছে। এটাই স্বাভাবিক। সমাজ কখনও রাজনীতি বিচ্ছিন্ন নয়। তবে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন এক চলমান প্রক্রিয়া। প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে ব্রিটিশ আমলে তা থেমে গেলেও পাকিস্তান আমলে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক সংগ্রামের আবহে তা অন্যরূপে হলেও নতুন প্রাণ পায়। এ কারণে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতাদের কাছে সেক্যুলারিজম অন্যতম মূলনীতি হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
এটাও সত্য যে, স্বাধীন বাংলাদেশে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন নানা ঘাত-প্রতিঘাতের সম্মুখীন হয়েছে; এখন যা এক গুরুতর পর্যায়ে রয়েছে। তবে অজ্ঞানতা, কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা ও পশ্চাৎপদ চিন্তাভাবনা যতদিন সমাজে থাকবে, ততদিন বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের প্রাসঙ্গিকতা থাকবে। এটি যে পরিপূরক রাজনীতি-বিবর্জিত হবে না, সেটিও বলা বাহুল্য। অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিপুষ্ট সংস্কৃতিচর্চা বেগবান করার কোনো বিকল্প নেই। হাঙ্গেরির দার্শনিক লুকাচ বলেছিলেন, সংস্কৃতিই লক্ষ্য, রাজনীতি সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর উপায় মাত্র। বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের পুনর্জাগরণের জন্য এ কথাটি মনে রাখা জরুরি।
রাজীব সরকার: প্রাবন্ধিক ও গবেষক
- বিষয় :
- আন্দোলন