তৃতীয় মেরু
বাংলাদেশ-চীন করিডোরের ‘রাখাইন রিয়েলিটি’
শেখ রোকন
শেখ রোকন
প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২৬ | ০৭:১৫ | আপডেট: ২৬ জুলাই ২০২৬ | ১২:০৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পাঁচ দিনের (২২-২৬ জুন) চীন সফরের আগের সপ্তাহেই পাঁচ দিনের (১৫-১৯ জুন) চীন সফর শেষ করেছেন মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট উ মিন অং লাইং। ঢাকা ও রেঙ্গুনের দিক থেকে সফর দুটির পরম্পরা নিছক কাকতাল মনে হলেও বেইজিংয়ের দিক থেকে যে সেটা নয়– বোঝা যায় সফর-পরবর্তী যৌথ ঘোষণাগুলো দেখলে।
যেমন, ১৭ জুন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট। জিনপিং-লাইং বৈঠকের পর যৌথ ঘোষণার ৫ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়ছে– ‘উভয় পক্ষ চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোরের (সিএমইসি) বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে এবং চকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর ও মুসে-মান্দালে রেলপথের মতো করিডোরের প্রধান প্রকল্পগুলোতে সহযোগিতা ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে’ (চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট)।
এদিকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২৬ জুন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকের পর যৌথ ঘোষণার ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে– ‘উভয় পক্ষ চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে সরাসরি সংযোগসহ আঞ্চলিক সংযোগের নতুনতর উপায়গুলো খতিয়ে দেখতে সম্মত হয়েছে’ (চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট)।
দুই প্রধানমন্ত্রীর যৌথ ঘোষণায় ‘করিডোর’ কথাটি সরাসরি না থাকলেও একই দিন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকের পর উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, ‘আজকে কানেক্টিভিটি নিয়ে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিস্তারিত কথা হয়েছে। বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত একটি ইকোনমিক করিডোর তৈরির প্রস্তাব এসেছে’ (সমকাল, ২৬ জুন ২০২৬)।’
তার মানে, সাম্প্রতিক এই দুই সফরে চীনের দিক থেকে অভিন্ন এজেন্ডা তিন দেশীয় অর্থনৈতিক করিডোর। প্রসঙ্গত, চীনের ইউনান প্রদেশের কুনমিং শহর থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের চকফিউ বন্দর পর্যন্ত ১৭শ কিলোমিটার দীর্ঘ অর্থনৈতিক করিডোর বেইজিংয়ের পুরোনো এজেন্ডা। অর্থনৈতিক করিডোরটি কেবল মিয়ানমারের প্রধান প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্র যেমন মান্দালে, ইয়াঙ্গুন, চকফিউকে চীনের পরিবহন নেটওয়ার্কে যুক্ত করবে না; একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগরে সহজে নামার স্থলপথও তৈরি করবে।
চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর নির্মাণে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে দুই দেশের মধ্যে ১৫ দফা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। পরবর্তী সময়ে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মিয়ানমার সফরকালে ৩৩টি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়; যেগুলোর অভিন্ন অভিমুখ অর্থনৈতিক করিডোর। এর মধ্যে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারের সেনবাহিনী এক অভ্যুত্থানে অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে হটালে দেশজুড়ে তীব্র বিক্ষোভ এবং এক পর্যায়ে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। এর অন্যতম প্রধান এপিসেন্টার চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোরের গন্তব্য চকফিউ সমুদ্রবন্দরের রাখাইন রাজ্য। বেইজিং যদিও প্রথম থেকেই দুই পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ ও আলোচনা অব্যাহত রেখে এসেছে; গৃহযুদ্ধের ডামাডোলে অর্থনৈতিক করিডোরটির অগ্রগতি কার্যত থমকে গিয়েছিল। মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের সাম্প্রতিক বেইজিং সফরে সেই পুরোনো অর্থনৈতিক করিডোরের প্রসঙ্গই নতুন করে মনে করিয়ে দেওয়া হলো।
দ্বিপক্ষীয় করিডোরকে এবার ত্রিপক্ষীও করতে চাইছে বেইজিং। বাস্তবে অবশ্য ২০১০ সালের দিকে প্রকাশিত চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোরের মূল পরিকল্পনার সঙ্গে বাংলাদেশ ছাড়া ভারতও যুক্ত ছিল। তখন এর নাম ছিল বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার (বিসিআইএম) অর্থনৈতিক করিডোর। কিন্তু ভারত প্রথম থেকেই এটাকে সন্দেহের চোখে দেখেছে; বঙ্গোপসাগরে চীনা প্রভাব বলয় বৃদ্ধির অংশ হিসেবে। বাংলাদেশও অজ্ঞাত কিংবা অনুমিত কারণে ছিল দ্বিধাগ্রস্ত। তখন চীন ও মিয়ানমার এটিকে দ্বিপক্ষীয় প্রকল্প হিসেবে রূপ দেয়।
ওদিকে, ভারত চতুর্পক্ষীয় করিডোরের বদলে মিয়ানামরের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় করিডোর নির্মাণে অগ্রসর হয়। শিলিগুড়ি করিডোর ব্যবহার কিংবা বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ট্রানজিট নিয়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে যাওয়ার পথের পাশাপাশি সমুদ্রপথে গিয়ে রাখাইনের কালাদান নদীর মোহনা দিয়ে ঢুকে নদীপথ ও সড়কপথের ‘মাল্টিমোডাল’ বা মিশ্র পরিবহন পথ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে আসছে।
এশীয় দুই বৃহৎ শক্তির এই প্রতিযোগিতায় মিয়ানমার পায়ের ওপর পা তুলে দুই পক্ষের প্রকল্পই চালিয়ে যেতে থাকে।
এর মধ্যে বাংলাদেশ-মিয়ানামার সীমান্তে নাফ নদ দিয়ে অনেক জলও বয়ে যায়। ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে লাখ লাখ নিপীড়িত ও বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে থাকে। আর মিয়ানমারের সঙ্গে চীন ও ভারতের অর্থনৈতিক করিডোর প্রকল্পে বাংলাদেশ ‘না ঘরকা না ঘাটকা’ হয়ে পড়ে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরে চীনের পক্ষ থেকে করিডোরে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাবটি সম্ভবত বাংলাদেশের সেই দশা কাটাতে পারে। যদিও এ ব্যাপারে ঢাকা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি।
‘সম্ভবত’ বলছি এই কারণে যে, অর্থনৈতিক করিডোরটি নিয়ে চীন, মিয়ানমার এবং বাংলাদেশ ঐকমত্যে পৌঁছলেও খোদ ‘রাখাইন রিয়েলিটি’ এর বাস্তবায়ন কঠিন করে তুলেছে। রাখাইন রাজ্যের ১৭টি টাউনশিপের মধ্যে ১৪টিই এখন বিদ্রোহী আরাকান আর্মির দখলে। রাজধানী সিত্তয়ে ও চকফিউ বন্দরসহ তিনটি টাউনশিপ যদিও এখনও মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের দখলে; রাজ্যটির বাকি অংশে আরাকান আর্মি প্রতিষ্ঠিত সরকারের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া কোনো ধরনের করিডোরই বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

স্পষ্টতই চীন ও ভারত যেমন মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকার, তেমনই আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। যেমন চীন যাওয়ার আগে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট ভারত সফর করেন। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর যৌথ ঘোষণার ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়– ‘উভয় পক্ষ কালাদান মাল্টিমোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রকল্প এবং ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড ত্রিপক্ষীয় মহাসড়ক সম্পন্ন করার লক্ষ্যে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার গুরুত্ব তুলে ধরেছে’ (ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট)।
রাখাইনে মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত সীমিত হলেও বেইজিং ও নয়াদিল্লি যেভাবে মিন অং লাইংয়ের সঙ্গে নিজ নিজ করিডোর নিয়ে তাগিদ দিয়েছে, তাতে স্পষ্ট যে, আরাকান আর্মিরও সায় রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশ কী করছে?
এটা ঠিক, আরাকান আর্মি অতীতে কখনোই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নির্ভরযোগ্য মিত্র হিসেবে প্রমাণিত হয়নি। বারবার বেকায়দায় থাকার সময় শান্তি ও সহাবস্থানের ভালো ভালো কথা বললেও কায়দা ফিরে পেয়েই স্বমূর্তিতে আবির্ভূত হয়েছে। কিন্তু গত দেড় বছরের অর্থনৈতিক অবরোধে আরাকান আর্মির অবস্থান এখন নাজুক। আর বাংলাদেশ ছাড়া অবকাঠামোগত দিক থেকে তাদের আন্তর্জাতিক যোগাযোগের বিকল্প পথও নেই। সেই সূত্রে আরাকান আর্মির পক্ষ থেকে সাম্প্রতিক সময়ে চীন ও ভারতের মতো বাংলাদেশের সঙ্গেও অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগের আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।
রাখাইনভিত্তিক মিডিয়া ‘ডিএমজি’ সম্পাদক অং মারম উ সম্প্রতি একটি নিবন্ধ লিখেছেন মিয়ানমারের প্রবাসী সংবাদমাধ্যম ইরাবতীতে। আরকান আর্মির ঘনিষ্ঠ এই সম্পাদক বলেছেন– ‘বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে আরাকান আর্মিকে স্বীকৃতি দেবে কিনা, তা কূটনীতির বিষয়। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সম্পৃক্ততা ছাড়া দেশটি কার্যকরভাবে সীমান্ত পরিচালনা করতে পারবে কিনা, তা বাস্তব প্রয়োজনীয়তার প্রশ্ন।’
একই কথা বলা চলে চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর নিয়েও। ১৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুর বোঝা মাথায় নিয়ে থাকা বাংলাদেশের জন্য মিয়ানামার-চীন করিডোরে যোগাদানের সুযোগ কেবল ‘পূর্বমুখী কূটনীতি’ জোরদার এবং অব্যবহৃত অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নয়; অর্থনৈতিক সম্পর্কের হাত ধরে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনেরও বিরল সম্ভাবনাগুলোর একটি।
শেখ রোকন: লেখক ও নদী-গবেষক
[email protected]
- বিষয় :
- শেখ রোকন