পরিবেশ
হাওরের জীব-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হারিয়ে যাবে?
শাহেদ কায়েস
শাহেদ কায়েস
প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬ | ১০:৫২ | আপডেট: ২৭ জুলাই ২০২৬ | ১০:৫২
হাওরাঞ্চলকে শুধু কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্র কিংবা মৌসুমি দুর্ভোগের অঞ্চল হিসেবে দেখলে প্রকৃত পরিচয় অধরাই থেকে যায়। হাওর এক জীবন্ত সভ্যতা। মানুষ, জল, মাছ, পাখি, বৃক্ষ, মাটি ও ঋতু মিলেই এখানে গড়ে উঠেছে হাজার বছরের স্বতন্ত্র জীবনব্যবস্থা।
সভ্যতা বলতে আমরা সাধারণত নগর, স্থাপত্য কিংবা প্রযুক্তির বিকাশ বুঝি। কিন্তু অনেক প্রাচীন সভ্যতা প্রকৃতিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। হাওরও প্রাকৃতিক সভ্যতা। এখানে মানুষের জীবন প্রকৃতির ওপর আধিপত্য নয়; বরং প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের ইতিহাস। জল বাড়লে মানুষ নৌকায় ওঠে; জল নামলে মাঠে নামে। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে যায় জীবিকা, খাদ্যাভ্যাস, সংস্কৃতি, গান, উৎসব ও দৈনন্দিন জীবন। প্রকৃতির সঙ্গে এমন নিবিড় সম্পর্ক আধুনিক বিশ্বের খুব কম অঞ্চলেই টিকে আছে।
হাওরের মানুষকে বোঝার জন্য শুধু আয়ের হিসাব বা উৎপাদনের পরিসংখ্যান যথেষ্ট নয়। তাদের জীবন প্রকৃতির দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ওপর দাঁড়িয়ে। কোন মেঘ বৃষ্টি ডেকে আনে; কোন বাতাস ঝড়ের পূর্বাভাস দেয়; কোন জায়গায় কোন মাছ বেশি জন্মায়; কোন জলজ উদ্ভিদ জল ধরে রাখে; কোন গাছ পাখির নিরাপদ আশ্রয়– এসব জ্ঞান বই থেকে শেখা নয়; প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অর্জিত। এই লোকজ জ্ঞান শুধু ঐতিহ্য নয়; টেকসই জীবনযাপনের অমূল্য সম্পদ।
বিশ্বজুড়ে এখন ‘বায়োকালচারাল হেরিটেজ’ বা জীব-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা হচ্ছে। এর মূল ধারণা, কোনো অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য এবং সংস্কৃতি পরিপূরক। প্রকৃতি ধ্বংস হলে সংস্কৃতিও টিকে না। আবার সংস্কৃতি হারিয়ে গেলে প্রকৃতি সংরক্ষণের সামাজিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। হাওর এই ধারণার উজ্জ্বল উদাহরণগুলোর একটি। এখানে জলাভূমি শুধু মাছের আবাস নয়; মানুষের ভাষা, লোককথা, সংগীত, বিশ্বাস, খাদ্য সংস্কৃতি এবং সামাজিক সম্পর্কেরও ভিত্তি।
যেমন হাওরের দেশীয় মাছের প্রজাতি যদি ক্রমশ হারিয়ে যায়, এর সঙ্গে কী কী হারিয়ে যাবে? হারিয়ে যাবে মাছ ধরার শত বছরের অভিজ্ঞতা; বিলুপ্ত হবে লোকশব্দ, জেলেদের জীবনঘনিষ্ঠ গান, ঐতিহ্যবাহী খাদ্য সংস্কৃতি; ভেঙে পড়বে পেশাটি ঘিরে গড়ে ওঠা সামাজিক সম্পর্ক।
হাওরে যদি পরিযায়ী পাখি না আসে, তবে শুধু কিছু পাখি নয়; হারিয়ে যাবে ঋতু চিনে নেওয়ার প্রাকৃতিক ভাষা ও প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সহাবস্থানের জীবন্ত স্মৃতি। তাই জীববৈচিত্র্যের প্রতিটি ক্ষয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যেরও ক্ষয়।
হাওরের হিজল, করচ, বরুণ কিংবা পানিফল কেবল উদ্ভিদ নয়; বাস্তুতন্ত্রের একেকটি স্তম্ভ। তাদের ছায়ায় মাছ আশ্রয় নেয়; পাখি বাসা বাঁধে; অণুজীব বেঁচে থাকে। প্রকৃতির এই সূক্ষ্ম সম্পর্কের কারণেই হাওরের কোনো একটি উপাদানকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। মানুষ এখানে মালিক নয়, বরং প্রকৃতিরই অংশ।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনায় এই দৃষ্টিভঙ্গির ঘাটতি স্পষ্ট। আমরা হাওরের মূল্য নির্ধারণ করি উৎপাদিত ধান, আহরিত মাছ, আদায়কৃত রাজস্ব দিয়ে। কিন্তু সুস্থ জলাভূমি যে বন্যার পানি ধারণ করে; মাটির উর্বরতা বজায় রাখে; আবহাওয়াকে প্রভাবিত করে; কার্বন ধারণ করে এবং প্রাণসম্পদের নিরাপদ আবাস তৈরি করে, সেসব অদৃশ্য অবদান প্রায়ই হিসাবের বাইরে থেকে যায়। অর্থনীতির ভাষায় ‘ইকোসিস্টেম সার্ভিস’ বা প্রতিবেশগত সেবার প্রকৃত মূল্য নির্ণয় সম্ভব নয়।
আরেকটি উদ্বেগের বিষয়, হাওরের ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। একসময় প্রবীণরা আকাশের রং, বাতাসের গতি কিংবা পাখির আচরণ দেখে আবহাওয়ার পরিবর্তন অনুমান করতে পারতেন। মাছের স্বভাব, জলজ উদ্ভিদের বৈশিষ্ট্য কিংবা ঋতুভেদে পানির চরিত্র সম্পর্কে তাদের ছিল বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা। নতুন প্রজন্মের সঙ্গে সেই জ্ঞানের সংযোগ ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে। এই জ্ঞান হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু স্মৃতির ক্ষয় নয়; ভবিষ্যতের পরিবেশ ব্যবস্থাপনার ভিত্তি হারিয়ে ফেলা। এখানেই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি। হাওর নিয়ে গবেষণা শুধু প্রকৌশল বা কৃষিবিজ্ঞানে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। জীববিজ্ঞানী, নৃবিজ্ঞানী, লোকসংস্কৃতি গবেষক, ভাষাবিদ, পরিবেশবিদ এবং স্থানীয় জনগণকে নিয়ে সমন্বিত গবেষণা ও পরিকল্পনা করতে হবে।
হাওরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে স্থানীয় মাছ, পাখি, বৃক্ষ, জলজ উদ্ভিদ, লোকগান ও ইতিহাস সম্পর্কে শেখানো দরকার। প্রবীণ জেলে, কৃষক ও মাঝির অভিজ্ঞতা নথিভুক্ত করা উচিত। হাওরের মৌখিক ইতিহাস, স্থানীয় শব্দভাণ্ডার, বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতি এবং ঐতিহ্যবাহী জীবন পদ্ধতি নিয়ে জাতীয় আর্কাইভ গড়ে তোলা যেতে পারে। কারণ সংরক্ষণ শুধু আইন প্রয়োগের বিষয় নয়; স্মৃতি, জ্ঞান ও পরিচয় সংরক্ষণেরও বিষয়।
বিভিন্ন দেশ এখন বুঝতে শুরু করেছে– প্রকৃতিকে রক্ষা করতে হলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতিকেও রক্ষা করতে হবে। আদিবাসী ও স্থানীয় জ্ঞানকে গুরুত্ব না দিয়ে পরিবেশ সংরক্ষণ দীর্ঘ মেয়াদে সফল হয় না। হাওরাঞ্চলেও সেই শিক্ষা প্রযোজ্য। হাওরের অভিজ্ঞতা কোনো অনানুষ্ঠানিক গল্প নয়। এটি পরিবেশগত প্রজ্ঞা, যা ভবিষ্যতের নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যখন পৃথিবী জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় এবং খাদ্য নিরাপত্তা সংকটে একযোগে আক্রান্ত, তখন হাওর পথ দেখাতে পারে।
মনে রাখতে হবে, হাওর ধ্বংস হলে শুধু জলাভূমি হারায় না। হারিয়ে যায় একটি ভাষা, জীবনদর্শন, লোকসংস্কৃতি, পরিবেশগত জ্ঞানভাণ্ডার এবং মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সহাবস্থানের বিরল ইতিহাস। হাওর রক্ষা মানে শুধু জলাভূমিকে রক্ষা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রকৃতি, সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং আগামী প্রজন্মের নিরাপদ ভবিষ্যৎ।
শাহেদ কায়েস: কবি, প্রাবন্ধিক ও অধিকারকর্মী
- বিষয় :
- পরিবেশ