অর্থনীতি
উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে পদে পদে কর ছাড়
আবু তাহের খান
প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬ | ১৯:৩৯
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, দেশে কর-জিডিপির অনুপাত বর্তমানের ৬ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২০৩৫ সাল নাগাদ ১৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে। তাঁর এ অবাস্তব ঘোষণায় দৃষ্টিভঙ্গিটি বোঝা যাচ্ছে– যেভাবেই হোক কর আহরণের পরিমাণ বাড়াতে হবে। অন্যদিকে সদ্য অনুমোদিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের যে বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জন করতে হলেও করের পরিমাণ বৃদ্ধির বিকল্প নেই। অথচ ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার যে উচ্চাভিলাষী বাজেট বাস্তবায়নের জন্য এই বাড়তি করের তাগিদ, তার একটি বড় অংশ রয়েছে বিলাসী পরিচালন ব্যয়, যার একটি বড় অংশ সহজেই পরিহার করা যেত। কিন্তু পরিহার করা তো দূরের কথা, বছর বছর তা বেড়েই চলেছে এবং নাগরিকের সামর্থ্য থাকুক বা না থাকুক ওই ব্যয়ের জোগান তাদের দিয়ে যেতে হচ্ছে। মোটকথা, যেভাবেই হোক সরকারকে এখন রাজস্ব আহরণের পরিমাণ বাড়াতে হবে এবং সেই লক্ষ্যে করের ‘কারেন্ট জাল’ এমনভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে, যাতে ফাঁকফোকর গলিয়ে একটি পয়সাও বেরিয়ে যেতে না পারে।
এই যখন রাজস্ব তথা কর আহরণের ব্যাপারে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি, তখন এই সরকারই আবার নানা গোষ্ঠী ও শ্রেণিকে অবাধে এবং একের পর এক কর ছাড় ও মওকুফ সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে– যা হতাশাজনক। ধারণা করা যায়, সরকারের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ও বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এটি একটি বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এ অবস্থায় কর ছাড়ের ধরন নিয়ে এখানে খানিকটা আলোকপাত করা যেতে পারে। এক. মোবাইল ফোনের সিমের ওপর এর আগে ৩০০ টাকা হারে যে কর ছিল, সদ্যগৃহীত বাজেটে তার পুরোটাই প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে এবং এর ফলে সরকার প্রায় এক হাজার ২০০ কোটি টাকার রাজস্ব হারাবে। অথচ এই কর মওকুফের কারণে গ্রাহকের এক পয়সারও কোনো উপকার হবে না; পুরো অর্থই চলে যাবে ফোন অপারেটর কোম্পানিগুলোর পকেটে।
তিন. বাজেটে লিপস্টিক, ত্বকের ক্রিম, ময়েশ্চার লোশন, ফেসওয়াশ ইত্যাদি প্রসাধনীর ওপর থেকে শুল্ক-কর হ্রাস করা হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রের আর্থিক নীতি তো হওয়া উচিত ছিল এ জাতীয় বিলাসী পণ্য আমদানি নিরুৎসাহিত করার লক্ষ্যে এসবের ওপর শুল্ক-কর আরও বাড়িয়ে দেওয়া। কিন্তু সেটি না করে উল্টো শুল্ক-কর কমিয়ে দেওয়া হলো। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে এর কি কোনো ব্যাখ্যা আছে? চার. বিভিন্ন দাতব্য ও সমাজকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের জন্য কর অব্যাহতি সুবিধা দেশে আগে থেকেই চালু আছে। তার সঙ্গে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে আরও ১১ প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু আগেরগুলোসহ এ প্রতিষ্ঠানগুলোর সবকটিই অবাণিজ্যিক ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে কিনা, সে বিষয়ে ব্যাপক প্রশ্ন রয়েছে। তদুপরি এ জাতীয় কর অব্যাহতির জন্য বিশেষ বিশেষ জেলার বিশেষ বিশেষ প্রতিষ্ঠানকে বাছাই করার বিষয়টিও প্রশ্নের উদ্রেক করে বৈকি, যার সঙ্গে ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক পক্ষপাত যুক্ত থাকতে পারে বলে অনেকেই মনে করেন।
পাঁচ. স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকারের ওপর থেকে ৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) কমানো হয়েছে। এটি যে শুধু রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বিত্তবান পরিবারের সদস্যদের গহনাবিলাসের পক্ষে দাঁড়ানো তা নয়, একই সঙ্গে কালো টাকাকে জায়েজ করার ফন্দি হিসেবে বেশি করে গহনা কিনে রাখার কৌশলকে সমর্থনদান ও উৎসাহিত করারও শামিল। এই আলোচনাসূত্রে একটি উদাহরণ টেনে বলি, বিভিন্ন নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য এবং আয়কর রিটার্ন দাখিল করার সময় প্রদত্ত ঘোষণাপত্রে ওই যে এত এত ‘ব্যবহার্য’ ও ‘যৌতুক হিসেবে প্রাপ্ত’ স্বর্ণালংকারের বিবরণ দেওয়া হয়, স্বর্ণালংকারের ওপর থেকে ৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত সেই অস্বচ্ছ প্রবণতাকেই আরও শক্তিশালী করে তুলবে না কি?
ছয়. সদ্যবিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গত ৯ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি (এআরটি) স্বাক্ষর হয়ে গেল, তার আওতায়ও বাংলাদেশকে এখন থেকে প্রতিবছর নিয়মিতভাবে বিপুল অঙ্কের কর ছাড় দিয়ে যেতে হবে।
উল্লিখিত উদাহরণগুলো ছাড়াও কর ছাড়ের এরূপ আরও উল্লেখযোগ্য ঘটনা রয়েছে, যেসব ছাড়ের কারণে রাষ্ট্র শুধু রাজস্ব হারাবে না; এসব ছাড়ের পেছনে অস্বচ্ছতা আছে কিনা, সে প্রশ্নও উঠবে। এ ধরনের ঘটনার বিবরণ একসঙ্গে করতে গেলে কর আহরণ নিয়ে স্বচ্ছতাহানির তালিকাই শুধু দীর্ঘ হবে। একদিকে কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধির নিরন্তর তাগিদ এবং তারই ধারাবাহিকতায় অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টার এ সংক্রান্ত অবাস্তব উচ্চাভিলাষী অঙ্গীকার, সেসবের সঙ্গে সরকারের উল্লিখিত কর ছাড় ঘোষণাগুলো কি সংগতিপূর্ণ? এনবিআরের কর আহরণের যে বিশাল লক্ষ্যমাত্রা, তার বিপরীতে তাদেরই উদ্যোগে চারদিকে কর ছাড়ের এই যে বিপুল আয়োজন, সেসব কি স্ববিরোধী আচরণ হয়ে গেল না? সম্পদ-সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় সাড়ে ৯ লাখ কোটি টাকার যে বাজেট গত ৩০ জুন জাতীয় সংসদে অনুমোদিত হলো, সেটির যথাযথ বাস্তবায়নের জন্য চাহিদা অনুযায়ী অর্থ জোগান অব্যাহত রাখার পথে এসব কর ছাড়ের সিদ্ধান্ত কি বাধা হয়ে দাঁড়াবে না? তাহলে এসব অসংগতিপূর্ণ, স্ববিরোধী ও জনস্বার্থ পরিপন্থি সিদ্ধান্ত কারা কীভাবে বাজেটের ভেতর ঢুকিয়ে দিল? জাতীয় সংসদের সব সদস্য মিলে সর্বান্তঃকরণে বাজেট পাস করলেও আসলেই কি সবাই এসব কর ছাড়ের সঙ্গে একমত? নাকি নিজেদের চিন্তার মধ্যে স্পষ্টতার ঘাটতি রেখে কিছু না বুঝেই ‘হ্যাঁ’-এর জোয়ারে হ্যাঁ বলে এটিকে পাস করিয়ে দেওয়া হলো?
উপরোক্ত পরিস্থিতিতে সরকারের বরং উচিত ছিল বিত্তবানের ওপর থেকে কর না কমিয়ে প্রত্যক্ষ করের মাধ্যমে তা আরও বাড়ানো। কিন্তু বাজেটে যেসব খাতে কর ছাড় দেওয়া হয়েছে, তার সবই গেছে বিত্তবানের পক্ষে। আর অধিকতর হতাশার বিষয়, বিত্তবানদের যে বিপুল পরিমাণ কর ছাড় দেওয়া হলো, তার বড় অংশই এখন পুনর্ভরণ করা হবে স্বল্পবিত্তের সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি পরোক্ষ কর আরোপের মাধ্যমে– ইতোমধ্যে যা যথেষ্টই বেড়ে আছে। জনগণ যে এ বিষয়গুলো একেবারেই বোঝে না, তা নয়। কিন্তু প্রতিবাদের সামর্থ্য ও সুযোগবিহীন নিরীহ জনগণের পক্ষে এসব তাকিয়ে তাকিয়ে দেখা এবং এসবের কষ্টদায়ক ফল ভোগ করা ছাড়া এ মুহূর্তে তাদের আর কিই-বা করার আছে?
আবু তাহের খান: আর্থসামাজিক বিশ্লেষক