জুলাই গণঅভ্যুত্থান
শহীদ শিশুদের নিয়ে বিষণ্ন প্রশ্নগুলি
মাহফুজুর রহমান মানিক
মাহফুজুর রহমান মানিক
প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩২ | আপডেট: ২৯ জুলাই ২০২৬ | ১০:০৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
বিবিসি বাংলায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত শিশু মুসার গল্প উঠে এসেছে; মাথায় কৃত্রিম খুলি নিয়ে বেঁচে আছে। অর্ধেক প্যারালাইজড শরীর এবং নাকে সার্বক্ষণিক খাবারের নল; ভয়ানক যন্ত্রণা নিয়ে নিয়ে কোনো রকমে বেঁচে আছে শিশুটি (২৪ জুলাই ২০২৬)।
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই আইসক্রিমের জন্য বায়না ধরেছিল ৬ বছরের মুসা। রাজধানীর রামপুরার মেরাদিয়ায় দাদি মায়া ইসলাম শিশুটিকে নিয়ে আইসক্রিম কিনতে বাসা থেকে নেমেছিলেন; উভয়েই গুলিবিদ্ধ হন। দাদি পরদিন মারা গেছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ, সিএমইএচ এবং সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা নিয়েও মুসা বেঁচে থাকার সংগ্রামে। ফলোআপ চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে যাওয়ার কথা থাকলেও অর্থের অভাবে যেতে পারেনি পরিবার। নতুন সরকার আসায় নতুন আবেদন করার কথা বিবিসিকে জানিয়েছেন মুসার বাবা।
মুসা বেঁচে গেলেও জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হয়েছে ১২৮ শিশু। তাদের নিয়ে লিখেছিলাম ‘ঝরে পড়া ফুলগুলোর জন্য শোক’ (সমকাল, ৩ আগস্ট ২০২৪)। এদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ ৪ বছরের আহাদ ১৯ জুলাই মা-বাবার সঙ্গে বাসাতেই ছিল। যাত্রাবাড়ীর রায়েরবাগ এলাকায় গোলাগুলির শব্দ শুনে সবার সঙ্গে বারান্দায় গিয়েছিল। হঠাৎ ছুটে আসা বুলেটে লুটিয়ে পড়ে শিশুটি। হাসপাতালে নিয়েও ফেরানো যায়নি। গুলি চোখ দিয়ে ঢুকে মাথায় আটকে যায়। কত কষ্টই না হয়েছিল শিশুটির!
গত ২১ জুলাই ডেইলি স্টার ‘দ্য চিলড্রেন উই লস্ট ইন জুলাই আপরাইজিং’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ১২৮ জনের মধ্যে অনুসন্ধান করে দেখিয়েছে, অধিকাংশই ঢাকার শিশু, যাদের বেশির ভাগই শিক্ষার্থী। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু শ্রমিকও শহীদ হয়েছে। পথশিশু শহীদের তথ্যও দিয়েছে একটি প্রতিষ্ঠান। তার মানে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সকল শ্রেণির শিশুই নিশানা হয়ে পড়েছিল।
ঘরে থাকলেও শিশুরা নিরাপদ ছিল না। যেমন– নারায়ণগঞ্জের ৬ বছরের শিশু রিয়া গোপ বাড়ির ছাদে খেলার সময় মাথায় গুলি লাগে। কয়েক দিন আইসিইউতে ছিল; ফেরানো যায়নি। এভাবে জাবির, হোসাইন, মোবারক, তাহমিদ, ইফাত, নাঈমা, আমিনুল– জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ প্রত্যেক শিশুর একেকটি বেদনাদায়ক গল্প আছে। দুই বছর পর এসেও বাবা-মায়ের চোখের পানি শুকায়নি।
যে শিশুরা অকালে ঝরে পড়ল, তাদের স্বজনদের দেওয়ার মতো জবাব কারও কাছে আছে? শিশুর নির্বিচার প্রাণহানি প্রমাণ করে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কতটা বেপরোয়া ছিল। রক্ষকরা কীভাবে হয়ে উঠেছিল ভয়ংকর ভক্ষক!
এত প্রাণের বিনিময়েও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কতটা পাল্টেছে? জুলাই অভ্যুত্থানের নির্বিচার ও গায়েবি মামলা থেকেও বোঝা গেছে, আসলে পাল্টায়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর রাজনীতিকীকরণের যেই সংস্কৃতি আওয়ামী লীগের দেড় দশকে দেখা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকার ও বিএনপি সরকারের সময় তারই পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। নিষ্পাপ এত শিশুর প্রাণহানিও আমাদের শিক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সূচনা শিক্ষার্থীদের সরকারি চাকরিতে বৈষম্য থেকে হলেও এর পেছনে রাজনীতিকদের অবিমৃষ্যকারিতার দায়ও কম নয়। দেড় দশক ধরে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং যেভাবে বিরোধী রাজনীতিকদের দমন করা হয়েছে, তারই অনিবার্য পরিণতি চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান। তবে তার দুই বছর পরও প্রশ্ন, রাজনীতিকরা সেখান থেকে কতটা শিক্ষা গ্রহণ করেছেন?
শিশুবান্ধব রাষ্ট্র গঠন করার জন্য প্রথমত প্রয়োজন জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ শিশুদের হত্যার বিচার নিশ্চিত করা। শিশুরা যেন এভাবে প্রাণহানির শিকার না হয়, সে জন্য রাষ্ট্রকে অনুকূল পরিবেশ দিতে হবে। যদিও সেই লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং আমাদের শিশুরা যেভাবে ধর্ষণ আর নৃশংসতার বলি হচ্ছে, তাও লজ্জিত করে। শিশুর সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতেও আমরা ব্যর্থ। না হলে চার মাসে হাম ও উপসর্গে আট শতাধিক শিশুর প্রাণহানি হয় কীভাবে!
সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিশু-কিশোরদের নতুন কুঁড়ি অনুষ্ঠানে নিশ্চয়তা দিয়েছেন– শিশুরা যে ক্ষেত্রে বিকশিত হতে চায়, সরকার সহযোগিতা দেবে। এটা কিন্তু বড় প্রতিশ্রুতি। শিশুর বিকাশে নিরাপদ পরিবেশ জরুরি। শিশুবান্ধব শিক্ষা ব্যবস্থা ও খেলার মাঠ প্রয়োজন। শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে যেখানে অভিভাবকরা শঙ্কিত থাকেন, সেখানে তার স্বাভাবিক বেড়ে ওঠাও বাধাগ্রস্ত হয়। সে জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকা দরকার। শিশুরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেন অনুকূল পরিবেশে থাকতে পারে, সে জন্য সেই ধরনের শিক্ষকও প্রয়োজন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া শিশুদের পরিবারের সঙ্গে থাকা এবং আহত শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা যেমন রাষ্ট্রের দায়িত্ব, তেমনি শিশুবান্ধব দেশ গঠনে সচেষ্ট থাকাও জরুরি। না হলে আগামীতেও আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এভাবে হারানোর শঙ্কা থাকবে।
মাহফুজুর রহমান মানিক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, সমকাল
[email protected]