ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

কম দামের চাল ডালে কম দামের জীবন

কম দামের চাল ডালে কম দামের জীবন
×

সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম

সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৪০ | আপডেট: ৩০ জুলাই ২০২৬ | ১১:৩৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

অভাবের সংসারে কিছু অর্থ বাঁচাতে নিম্ন আয়ের মানুষের ভরসা টিসিবির ভর্তুকির পণ্য। এ ব্যবস্থা কিছুটা স্বস্তি দেয় অবশ্যই। কিন্তু অব্যবস্থাপনা যেভাবে নাগরিকের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে, তা হৃদয়বিদারক। সেই অব্যবস্থাপনা কি দূর করতে চাওয়া হয়? হয় না। কেননা, একুট সাশ্রয়ে পণ্য সংগ্রহ করতে যাওয়া মানুষ শক্তিশালী শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত নন। রাষ্ট্রের কাছে যদি নাগরিকের জীবনের মূল্য সমান হতো, তাহলে হয়তো মঙ্গলবার মিরপুরে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) লাইনে দাঁড়িয়ে দেয়ালচাপা পড়ে তিনজনের প্রাণহানি ও কয়েকজনের গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতো। 

এ বছর ২৪ ফেব্রুয়ারি সংবাদ পোর্টালগুলোতে একটি ছবি ছড়িয়ে পড়েছিল। টিসিবির পণ্যবাহী ট্রাক চলে যাচ্ছে আর সড়কে উল্টে পড়েছেন এক নারী। দৃশ্যটি চলচ্চিত্রের মতো হলেও বাস্তবে ঘটেছিল রাজধানীর উত্তরায়। রোজা উপলক্ষে টিসিবির ট্রাক সেখানে অবস্থান করছিল। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিড় বেড়ে গেলে শুরু হয় হুড়োহুড়ি। এক পর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ট্রাকচালক স্থান পরিবর্তনের চেষ্টা করেন। এ সময় কয়েকজন ক্রেতা ট্রাকের পেছনে দৌড়ান এবং কেউ কেউ পেছনের অংশ ধরে ঝুলে পড়েন। সড়কে লুটিয়ে পড়া নারীও ছিলেন সেই ভিড়ে। আরেকটি ছবি ট্রাকের তলায় গিয়ে শিশুর চাল কুড়ানোর। ছোট দুটো হাত দিয়ে যেখানে বুকের সঙ্গে পুতুল অথবা মায়ের হাত ধরে থাকার কথা; সেই হাত দিয়ে টিসিবির ব্যাগ থেকে পড়ে যাওয়া চাল কুড়াতে ট্রাকের তলায় চলে গিয়েছিল শিশুটি। এসব ছবি আমাদের সামগ্রিক ব্যর্থতার ফুটপ্রিন্ট হয়ে থাকবে আন্তর্জালে। ভুক্তভোগী মানুষটির সামনে বারবার এই ছবি এসে বলবে– তুমি অক্ষম। কিন্তু সেই অক্ষমতা কি শুধু ব্যক্তি বা পরিবারের? 

টিসিবির লাইনে দাঁড়িয়ে মৃত্যু কি অতিরিক্ত ভিড়, বিতরণের অব্যবস্থাপনা, মৌলিক খাদ্য নিরাপত্তার ঘাটতি এবং নাগরিক মর্যাদা ও নিরাপত্তা উপেক্ষিত হওয়ার কারণ নয়? এসব দায় রাষ্ট্রের ওপরেই বর্তায়। আমরা দেখি ঘটনাগুলোকে বারবার বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা তকমা দিয়ে সীমিত সরবরাহ, দীর্ঘ লাইন, অনিশ্চয়তা এবং মানুষের অসহায়ত্বের প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া হয়। মিরপুরের ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পর এই নিবন্ধ লেখা পর্যন্ত মিরপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ কর্তৃপক্ষের কোনো বক্তব্য সংবাদমাধ্যমে চোখে পড়ল না। দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে ডিএনসিসি প্রশাসক বলেছেন, ২০১৪ সালে নির্মাণ করা এই দেয়ালে প্রয়োজনীয় নির্মাণসামগ্রী দেওয়া হয়নি। আরসিসি করা হয়নি; শুধু ইটের ওপর গাঁথুনি। এ কারণেই বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে।

মঙ্গলবার দুপুরে খোলাবাজারে টিসিবির সাশ্রয়ী মূল্যের পণ্য কিনতে মিরপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের পেছনের দেয়াল ঘেঁষে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন শত শত সাধারণ মানুষ। প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ কলেজের সীমানাপ্রাচীর ধসে পড়ে। মুহূর্তেই দেয়ালের নিচে চাপা পড়েন লাইনে থাকা বেশ কয়েকজন নারী-পুরুষ। তাদের মধ্যে যেমন স্বল্প আয়ের দুপুরে না খেয়ে লাইনে দাঁড়ানো পরিচ্ছন্নতাকর্মী নাছিমা বেগম ছিলেন, তেমনি ছিল বাবা-মাকে সাহায্য করতে আসা কিশোরী। কিশোরীর বাবা গাড়িচালক; এক ভিডিওতে জানান, তাঁর মেয়েটির পা ভেঙে বুকের ভেতর ঢুকে গেছে। এই বাবার চোখে পানি নেই; ঘটনার আকস্মিকতায় কণ্ঠ বাষ্পরুদ্ধ।

আক্ষেপ নিয়ে বলতে হয়, এ দেশের মানুষের জীবনের মূল্য এমনই। আজ দেয়ালধসে মানুষ মরে; আরেক দিন মেট্রোরেলের অংশ খসে পড়ে; হাসপাতালে ছয় শিশু একসঙ্গে প্রাণ হারায়; সিলিন্ডারের বিস্ফোরণ ঘটে; ফ্লাইওভারের গার্ডার পড়ে; ওপর থেকে বিমান এসে বিধ্বস্ত হয় স্কুলের ওপর। বছর ফুরিয়ে এলে আমরা নিহতদের স্মরণে মোমবাতি জ্বালাই। মানুষের মরে যাওয়া খুব সহজ এ দেশে। কোনো জবাবদিহি এবং পরিকল্পনা নেই। অথচ দেশের প্রযুক্তির ব্যবহার এগিয়েছে। টিসিবির পণ্য বিতরণে সময়ভিত্তিক টোকেন, ডিজিটাল নিবন্ধন, এসএমএসের মাধ্যমে সময় নির্ধারণ করা যায় না? ওয়ার্ডভিত্তিক পর্যাপ্ত বিক্রয় ব্যবস্থা গড়ে তোলা কি খুব কঠিন? কেন একজন মানুষকে ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে অপেক্ষা করতে হবে? এ কি রাষ্ট্রের দয়া ভিক্ষা তাদের জন্য, নাকি পিছিয়ে থাকা নাগরিককে এতটুকু সাশ্রয় দেওয়া রাষ্ট্র কাঠামোরই অংশ?

বিভিন্ন সময়ে টিসিবির পণ্যের ক্রেতাদের নিয়ে প্রতিবেদন করতে গিয়ে দেখেছি পর্যাপ্ত পণ্য না থাকার আতঙ্ক তৈরি হয়। আগে না পৌঁছালে পাওয়াই যাবে না– এই মনস্তাত্ত্বিক চাপ ভিড়কে আরও বিপজ্জনক করে তোলে। টিসিবির পণ্যের ভিড় স্পষ্ট করে, দেশে বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে এখনও কয়েক কেজি কম দামের পণ্য অপরিহার্য। কিন্তু রাষ্ট্রের সহায়তা নাগরিককে অপমানজনক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে পেতে হবে কেন? 

কয়েক কেজি চাল, ডাল বা তেলের জন্য যদি একজন মানুষকে জীবন বাজি রাখতে হয়, তবে সেই মৃত্যু কেবল একজন মানুষের নয়। তা আমাদের নীতি, পরিকল্পনা, মানবিকতারও পরাজয়। খারাপ শোনালেও বলা প্রয়োজন, আমাদের দেশে কম দামের চাল-ডালের সঙ্গে বারবার বহুভাবে বিক্রি হয়ে যায় নিম্ন আয়ের মানুষের নাগরিক মর্যাদা ও কম দামের জীবন।
 
সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম: সহকারী সম্পাদক, সমকাল

আরও পড়ুন

×