অন্যদৃষ্টি
দক্ষিণ এশিয়ায় জেন-জি আন্দোলন
রাজীব চক্রবর্তী
প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:০৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
পুঁজিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থায় পারিবারিক রাজনীতির প্রভাব দক্ষিণ এশিয়ার ছোট-বড় দেশগুলোতে বেশ পুরোনো। নামধারী গণতন্ত্রের খোলসে বড় বড় করপোরেট হাউস রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে ব্যবসার বাইরে গিয়ে রাষ্ট্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো কল্যাণমুখী কাজেও নাক গলায়। যখন রাষ্ট্রের পুঁজি গুটিকয়েকের মধ্যে কুক্ষিগত, তখনই একটি দেশের বেকারত্ব, জানমালের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক বৈষম্য প্রকট হয়।
রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার সুযোগে দুর্নীতির কেচ্ছা যখন কার্পেটের নিচে লুকানো যায় না, তখনই শহুরে কাজের খোঁজে এসে কোনোমতে টিকে থাকা সাধারণ শ্রেণির মানুষ হতাশায় ভোগে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের সিন্ডিকেটের কারণে আকাশছোঁয়া দামের সঙ্গে সংসার চালাতে যখন এই শ্রেণির সাধারণরা হিমশিম খায়, তখন তাদের সঙ্গে তাদের উঠতি বয়সী ছেলেমেয়েরা সেই ক্ষতকে উস্কে দেয়।
এই সমমনা উঠতি বয়সীদের পরিবারের সমস্যা যেহেতু একটা, তাই এদের জড় করতে প্রথাগত রাজনৈতিক দলের মতো বিরিয়ানির প্যাকেট দিয়ে ডাকতে হয় না। এমনিতেই নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের চোখ-কান খোলা শিক্ষিত বেকার তরুণ, তার ওপর সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতি মুহূর্তের নেতিবাচক খবর তাদের মর্মাহত করে।
কিন্তু হঠাৎ ব্যবসায়ী-কাম পার্টটাইম রাজনীতিক, মন্ত্রী, আমলারা এদের মনে করে পরজীবী। তাই সারাদিন সবকিছুতে শুধু রাজনীতি খোঁজে আর মনে করে, তারা দেশ চালাচ্ছে মানে তারাই সব বোঝে। নতুন ফরম্যাটের রাজনীতিতে দুর্নীতিবাজ আমলাচালিত রাষ্ট্রক্ষমতার মালিক এই রাজনীতিকদের এ যুগের তরুণদের মন বোঝার সময় কোথায়! তাদের ঘরের তরুণ ছেলেমেয়েরা তো সব বিদেশে। তাই এই জেনারেশন গ্যাপ রাজনীতিবিদদের বিশেষ করে সরকারদলীয়দের অনুধাবন করতে হবে। এই তরুণরা জাত-পাত-ধর্ম, উচ্চ-নিচ মানে না। ছেলেমেয়েদের রাস্তায় আন্দোলনে মার খেতে দেখে পাড়া-মহল্লার নির্ভেজাল মুরব্বি শ্রেণিও যোগ দিচ্ছে। কেউ কাউকে ডাকেনি। আর যেহেতু তরুণদের এই দাবি-দাওয়া সাধারণের সঙ্গে মিলে যায়, তাই এই তরুণদের ডাকে সহজেই সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। আর দ্রুত ছড়িয়েও পড়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে।
আরব বসন্ত সফল হয়েছিল। কিন্তু ইরানের ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন আন্দোলন করেও ফল আসেনি। বিদেশি মদদেও কাজ হয়নি। পাকিস্তানেও এস্টাবলিশমেন্টের বিরুদ্ধে আন্দোলনে করাচির রাস্তায় লাখ মানুষ হলেও সফলতা আসেনি। কারণ সেখানে প্রদেশভিত্তিক বৈষম্য যেমন বেলুচিস্তান, সিন্ধু, পাঞ্জাবিদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আছে, যা তাদের এক করতে পারছে না। ভারতেও জাত-পাতের বৈষম্য আছে। কিন্তু রাজ্যগুলোর মধ্যে অন্তর্কোন্দল কম। কলকাতা ও আসামের বেশির ভাগ প্রান্তিক মানুষ দক্ষিণ ভারতে কাজ করে। দিল্লি রাজধানী হওয়ায় সব বর্ণ, শ্রেণি, রাজ্যের মানুষ কাজের সন্ধানে এসে বসবাস করছে। আর সবার চাওয়াও এক– বৈষম্য, দুর্নীতি, স্বজনতোষণ ঠেকাও। সঙ্গে যোগ দিচ্ছে সাধারণ স্থানীয়রাও। ব্যস! সব দেশে একিই চিত্র। আর সরকারগুলো বেকায়দায়।
তবে এই প্রথাবিরুদ্ধ আন্দোলনে প্রথম সফলতা দেখিয়েছে বাংলাদেশের তরুণরা। সফল হওয়াতে এটা এখন মডেলে পরিণত হয়েছে। যদিও ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী পরিবারতান্ত্রিক সরকারের বিলোপ ঘটেছিল। কিন্তু বাংলাদেশের সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় থাকা তরুণদের কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকেই দীর্ঘ এক যুগের বেশি আওয়ামী শাসনের অবসান হয়। নেপালেও একই মডেলে পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তের পরিবর্তনে নেপালের তরুণ প্রজন্ম সামাজিক মাধ্যম বন্ধের প্রতিবাদে রাস্তায় নামে, যা দ্রুতই দুর্নীতিবিরোধী ও সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়। পশ্চিমবঙ্গে ও অভয়াকাণ্ডে মমতার সরকার কোনোমতে টিকে গেলেও শেষ রক্ষা হয়নি। কিন্তু দিল্লিতে ছাত্ররা সফল হয়েছে। এখন বিশ্লেষকদের ধারণা, দিল্লির ঘটনার প্রভাব সামনের রাজ্য নির্বাচনে কোন বার্তা দিতে পারে।
ড. রাজীব চক্রবর্তী: গবেষক ও লেখক
drrajibchakraborty.com
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি