সমকালীন প্রসঙ্গ
ব্রিকস সম্মেলন: বহুপাক্ষিকতার পরীক্ষা ও বাংলাদেশের কূটনীতি
মঞ্জুরে খোদা
প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬ | ২০:১৫ | আপডেট: ০৪ আগস্ট ২০২৬ | ২০:১৫
আগামী সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন এমন এক মুহূর্তে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যখন এই জোট নিজেই এক দ্বন্দ্বের মধ্যে দাঁড়িয়ে– একদিকে সদস্য সংখ্যা ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব বাড়ছে, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ ঐকমত্য দুর্বল হচ্ছে। মে মাসে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক এবং তার পরের বৈঠকগুলো ইতোমধ্যে দেখিয়ে দিয়েছে যে ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত ব্রিকসের অভ্যন্তরে একটি ফাটল সৃষ্টি করেছে, যার ফলে যৌথ ঘোষণাপত্রের বদলে কেবল চেয়ারম্যানের বিবৃতিতেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে সদস্যদের। এই প্রেক্ষাপটে সেপ্টেম্বরের সম্মেলন কেবল একটি কূটনৈতিক অনুষ্ঠান নয়, বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একটি পরীক্ষা হবে। বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রের জন্য এটি কৌশলগত সুযোগ ও সতর্কতা– দুটোরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
কেন এই সম্মেলন গুরুত্বপূর্ণ
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তত্ত্বের দৃষ্টিতে ব্রিকসের ক্রমবিকাশ কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। কেনেথ ওয়াল্টজের কাঠামোগত বাস্তববাদ (Structural Realism) অনুযায়ী, একক আধিপত্যশীল শক্তির বিপরীতে দুর্বলতর রাষ্ট্রগুলো স্বাভাবিকভাবেই ভারসাম্য রচনার (balancing) চেষ্টা করে। জি৭-এর বিপরীতে চীন, রাশিয়া, ভারত, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকার ব্রিকস গঠন এবং ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, মিসর, ইথিওপিয়া ও ইন্দোনেশিয়াকে সেই জোটে টানা মূলত ভারসাম্য রচনারই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। ডলারের একক আধিপত্যের বিকল্প খোঁজা, বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ কাঠামোর সংস্কারের দাবি এবং নিজস্ব উন্নয়ন ব্যাংক (এনডিবি) শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা– এসবই একটি বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কাঠামোগত প্রকল্পের অংশ।
তবে এই সম্প্রসারণই ব্রিকসের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও বটে। যত বেশি রাষ্ট্র একটি জোটে যুক্ত হয়, তাদের স্বার্থের বৈচিত্র্যও তত বাড়ে– এটি কাঠামোগত বাস্তববাদেরই আরেকটি শিক্ষা। ইরান যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ব্রিকসের কাছ থেকে স্পষ্ট নিন্দা প্রত্যাশা করেছে, সেখানে উপসাগরীয় নিরাপত্তা ও জ্বালানি বাণিজ্যের স্বার্থে সংযুক্ত আরব আমিরাত সেই অবস্থান থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছে। হ্যান্স মর্গেন্থাউয়ের ভাষায় বলা যায়, রাষ্ট্রের আচরণ চিরস্থায়ী মিত্রতা বা শত্রুতা দ্বারা নয়, বরং জাতীয় স্বার্থ দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হয় এবং ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ বিভাজন ঠিক এই সত্যেরই প্রতিফলন।
এই কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও ইরান, ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সরাসরি পক্ষ না নিয়ে উন্নয়ন, প্রযুক্তি ও স্থিতিশীলতার মতো অভিন্ন এজেন্ডায় মনোযোগ কেন্দ্রীভূত রাখার চেষ্টা করে ভারত আয়োজক হিসেবে এক ধরনের কূটনৈতিক ভারসাম্য দেখিয়েছে। সেপ্টেম্বরের সম্মেলনে যদি চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সশরীরে উপস্থিত হন, তবে ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর এটি হবে ভারত-চীন সম্পর্ক পুনর্গঠনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ। কিসিঞ্জারীয় অর্থে বলা যায়, এশিয়ার দুই বৃহৎ শক্তির মধ্যে সাময়িক সমঝোতা তাদের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে মুছে দেবে না। সে ক্ষেত্রে আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনে এটি একটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হতে পারে।
বাণিজ্য, জ্বালানি ও আর্থিক ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস
রাজনৈতিক বিভাজন সত্ত্বেও ব্রিকসের অর্থনৈতিক এজেন্ডা কোনোভাবেই গৌণ নয়। স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য, বিকল্প পরিশোধ ব্যবস্থা ব্রিকস পে এবং নতুন উন্নয়ন ব্যাংকের কার্যকারিতা বৃদ্ধি– এ তিনটি উপাদান মিলে একটি এমন আর্থিক কাঠামো তৈরি করতে চাইছে, যা পশ্চিমা শক্তি নিয়ন্ত্রিত ব্রেটন উডস কাঠামোর ওপর নির্ভরতা কমাবে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে সংঘাতের প্রভাব দেখিয়ে দিয়েছে যে জ্বালানি নিরাপত্তা কেবল রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও ব্রিকস দেশগুলোর জন্য একটি অস্তিত্বগত প্রশ্ন– বিশেষত ভারত ও চীনের মতো বৃহৎ আমদানিকারক দেশের জন্য।
ভারতের সভাপতিত্বে নির্ধারিত অগ্রাধিকার– সহনশীলতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও স্থিতিশীলতা– জলবায়ু পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল অবকাঠামো ও সরবরাহ শৃঙ্খলের মতো ক্ষেত্রগুলোকেও এজেন্ডার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। এই সম্প্রসারিত এজেন্ডা গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর জন্য নতুন অংশীদারিত্বের দরজা খুলে দিতে পারে, যদি তারা সময়মতো নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিক সুযোগ
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই সম্মেলনের গুরুত্ব একাধিক স্তরে বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রথমত, প্রতীকী স্তরে– নরেন্দ্র মোদি জোটের সভাপতি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ব্রিকসের সাইডলাইনে আমন্ত্রণ জানানো একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার পতনের পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, সেই সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি বাস্তব সুযোগ এই আমন্ত্রণ। কূটনীতিতে প্রতীকী উপস্থিতিও কখনও কখনও বাস্তব সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের প্রথম ধাপ হয়ে দাঁড়ায়।
দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক স্বার্থের বিচারে বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই ব্রিকসের প্রধান সদস্যদের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বিনিয়োগকারী ও বাণিজ্যিক অংশীদারদের অন্যতম, রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক দীর্ঘদিনের, আর উপসাগরীয় নতুন সদস্যদের সঙ্গে শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্সের সম্পর্ক বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। এই বাস্তবতায় ব্রিকসের সম্প্রসারিত মঞ্চে বাংলাদেশের পর্যবেক্ষক বা সংলাপ-অংশীদার হিসেবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ খতিয়ে দেখা যুক্তিসংগত– এটি নতুন উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে প্রবেশাধিকার, বিকল্প বাণিজ্য চ্যানেল এবং জ্বালানি আমদানিতে দর-কষাকষির সক্ষমতা বাড়াতে পারে।
তৃতীয়ত, কাঠামোগত বাস্তববাদের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হলো হেজিং (hedging)– কোনো একক জোটের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে যুক্ত না হয়ে একাধিক শক্তিকেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা। ভারত নিজেই এই সম্মেলনে ইরান, ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিয়েছে, তা ছোট ও মধ্যম শক্তির জন্য একটি শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশও যদি ব্রিকসের অর্থনৈতিক সুযোগ গ্রহণ করে, তবে তা যেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে– বিশেষত তৈরি পোশাক রপ্তানি বাজারের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষতি না করে, সেই ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি।
চ্যালেঞ্জ ও সতর্কতা
ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ বিভাজন, বিশেষত ইরান-ইসরায়েল সংঘাত ও গাজা প্রশ্নে সদস্যদের ভিন্ন অবস্থান, দেখিয়ে দেয় যে এই জোট কোনো অভিন্ন পশ্চিমবিরোধী মতাদর্শে পরিচালিত নয়। বাংলাদেশের জন্য তাই ব্রিকসের সঙ্গে সম্পৃক্ততা যেন কোনো নির্দিষ্ট ভূরাজনৈতিক শিবিরে সম্পূর্ণ ঝুঁকে পড়া হিসেবে বিবেচিত না হয়, বরং তা হওয়া উচিত বাস্তববাদী অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণের একটি অংশ। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক রূপান্তরের এই সময়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ধারাবাহিকতা ও পূর্বাভাসযোগ্যতা বজায় রাখা– যাতে ঐতিহ্যবাহী পশ্চিমা অংশীদারদের কাছে বার্তা না যায় যে ঢাকা কোনো একপক্ষীয় অবস্থান নিচ্ছে।
নয়াদিল্লি ব্রিকস সম্মেলন একদিকে বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার কাঠামোগত রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, অন্যদিকে জোটের অভ্যন্তরীণ ভঙ্গুরতার প্রশ্নে বোঝাপড়ারও মঞ্চ। বাংলাদেশের জন্য এই সম্মেলনের প্রকৃত মূল্য নিহিত রয়েছে তার কৌশলগত কূটনৈতিক সুযোগে-ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে এবং তার বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক সম্ভাবনায়– বিকল্প অর্থায়ন, বাণিজ্য বৈচিত্র্যকরণ ও জ্বালানি নিরাপত্তায়। তবে এই সুযোগ গ্রহণের পথ হওয়া উচিত সতর্ক, পরিমিত ও ভারসাম্যপূর্ণ। জোটনিরপেক্ষতার পুরোনো নীতি নয়, বরং একুশ শতকের বাস্তবতায় কৌশলগত ভারসাম্য বা বহুমুখী সম্পৃক্ততাই বাংলাদেশের মতো মধ্যম শক্তির জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ– যেখানে অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা পাবে, অথচ কৌশলগত স্বাধীনতাও অক্ষুণ্ন থাকবে।
ড. মঞ্জুরে খোদা: লেখক-গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
- বিষয় :
- ব্রিকস সম্মেলন