অন্যদৃষ্টি
বিলাসিতার বিভ্রম
মো. সুমন জিহাদী
প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৩৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
উন্নয়নকে আমরা কীভাবে দেখছি, তার ওপরেই নির্ভর করছে কেমন হবে আমাদের যাপিত জীবন। প্রচলিত উন্নয়ন তত্ত্বগুলো কোনোটাকেই আমরা অচল বা বাতিল বলতে পারি না। মাথাপিছু আয়, জিডিপির প্রবৃদ্ধি বা জীবনধারণের মাননির্ভর সূচকগুলো বিভিন্ন সময় ও পরিস্থিতি বিবেচনায় কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। সময়ের প্রয়োজনেই আবার টেকসই উন্নয়ন গত এক দশক ধরে জীবনধারণের উপকরণ, দুর্যোগ, জলবায়ু পরিবর্তনসহ উন্নয়নের স্থায়িত্বকে গুরুত্ব দিয়েছে। এতে নীতিনির্ধারকরা এবং সব অংশীজন নিজ নিজ জায়গায় উন্নয়নমূলক কাজের নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়নে হয়ে উঠছেন অন্তর্ভুক্তিমূলক, পরিবেশ ও দুর্যোগ সচেতন। তবুও উন্নয়নের সুফল সবাই পাচ্ছেন না। যারা পাচ্ছেন তারাও সত্যিকারের উন্নয়নের সুফল বলতে যা বোঝায় তা পাচ্ছেন না। তারা হয়তো পাচ্ছেন বিলাসবহুল একটি জীবনাচরণ।
বিলাস ও উন্নয়নের মধ্যে স্পষ্ট তফাৎ আছে। বিলাস কখনও সমাজের সবার জীবনে আসে না। কিন্তু সমাজের সবার জীবনে উন্নয়ন আসে এবং তার নজির আছে। উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে বিলাস এবং উন্নয়নের পার্থক্যটা আগে বুঝতে হবে। উঁচু দালান, দামি গাড়ি এগুলো বিলাস; উন্নয়নের পরিমাপক নয়। বিলাসবহুল গাড়ি জলাবদ্ধ ঢাকা শহরের রাস্তায় আটকে থাকতে দেখা গেছে এই কয়েক দিন আগেই। ঝাঁ চকচকে ভবনগুলোর সামনে হাঁটুপানি; কেউ ঘর থেকে বের হতে পারল না
দু-একদিন। সরকারি-বেসরকারি দপ্তর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দুই-তিন দিন নিমজ্জিত থাকল ভারী বৃষ্টির পানিতে। রিকশাচালক পায়ে ঠেলা রিকশায় কোনো রকম পরীক্ষা কেন্দ্রে নিয়ে গেল শিক্ষার্থীদের। ঢাকার মতো ব্যস্ত শহরের মানুষের প্রায় দিশেহারা অবস্থা। একটি সুন্দর, সুষম ও দুর্যোগ-সচেতন নগর পরিকল্পনা এখন অত্যন্ত জরুরি। যে পরিকল্পনা বিলাস নয়; উন্নয়নকে গুরুত্ব দেবে। সেখানে বড় বড় ভবন, স্থাপত্য নয়; গ্রিন স্পেসকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। ওয়াটার ইভ্যাকুয়েশন সিস্টেম নিশ্চিত করা হবে এবং আকস্মিক দুর্যোগে শহরের মানুষকে নিরাপদ আশ্রয় দেবে।
পরিকল্পনাটি হতে হবে ‘সিস্টেম অব সিস্টেমস’ ধারণার বাস্তব ছবি। কারণ একটি সিস্টেমের সঙ্গে আরেকটি সিস্টেম সম্পর্কযুক্ত। বড় বড় আন্ডারগ্রাউন্ড ড্রেনেজ সিস্টেম যদি পলিথিন, প্লাস্টিক বা অন্যান্য আবর্জনা দিয়ে ভরে যায় তাহলে সেই স্যুয়ারেজ সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম দ্বারা। আবার বড় বড় সড়ক তৈরি করা হলো কিন্তু ফুটপাত সম্পূর্ণ বেদখল ও মানুষ সেখানে হাঁটতে পারে না। তাহলে সড়ক ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে নগর ও বাজারের অপব্যবস্থাপনার কারণে। নদী রক্ষা না করে বড় বড় ড্রেন করা হলে কী কাজে আসবে সেই ড্রেন?
বিদ্যুতায়নের ক্ষেত্রেও নবায়নযোগ্য, পরিবেশবান্ধব উপায় না খুঁজে বেশি বেশি জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো কি সঠিক সিদ্ধান্ত হবে? একটি খাতে কিছু নতুন অবকাঠামোগত কাজ করে তাকে উন্নয়ন বলার সুযোগ নেই। সেটি হলো দায়সারা; ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি সঠিক দায়িত্ব পালন নয়। কাজের সম্পূর্ণ সুফল যেন মানুষ পায়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। তার ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট করে তবেই উন্নয়নের স্বীকৃতি দিতে হবে। এসব সিস্টেম নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় থাকতে হবে স্বাস্থ্যসেবা পদ্ধতি। যে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনো স্বাস্থ্য ঝুঁকি রয়েছে কিনা; দুর্ঘটনা ঝুঁকি অনুযায়ী শ্রমিক ও প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে কিনা– সেসব বিষয়কেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কোনো উন্নয়নই ‘উন্নয়ন’ নয়, যদি সেটি আমাদের ভোগান্তি না কমায়। কোনো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকেই উন্নয়ন বলতে পারি না, যদি তা সামগ্রিকভাবে মানসিক স্বস্তি না দেয়। একইভাবে কোনো অবকাঠামোগত নির্মাণকাজই প্রশংসনীয় নয়, যদি সেটি পরিবেশ ঝুঁকি কমাতে না পারে।
মো. সুমন জিহাদী: পিএইচডি গবেষক, এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, থাইল্যান্ড; পরামর্শক, এশিয়ান ডিজাস্টার প্রিপেয়ার্ডনেস সেন্টার, ব্যাংকক, থাইল্যান্ড
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি